তিন বছর ধরে যুদ্ধ, হামলা ও ধ্বংসযজ্ঞের ভার বয়ে চলেছে ফিলিস্তিনের গাজা। ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর ইসরাইলে হামাস ও অন্যান্য ফিলিস্তিনি সশস্ত্র গোষ্ঠীর হামলার পর শুরু হওয়া সংঘাতের পর থেকে উপত্যকাটি পরিণত হয়েছে ব্যাপক ধ্বংস ও মানবিক সংকটের এক ভূখণ্ডে। তিন বছর পরও বহু ফিলিস্তিনি ধ্বংসস্তূপ, তাঁবু ও অনিরাপদ আশ্রয়ে জীবন কাটাচ্ছেন।
জাতিসংঘের হিসাবে, সংঘাতের প্রথম দুই বছরে গাজায় ৭১ হাজারের বেশি ফিলিস্তিনি নিহত এবং ১ লাখ ৭১ হাজারের বেশি আহত হন। পরবর্তী সময়েও প্রাণহানি অব্যাহত রয়েছে। ২০২৬ সালের সেপ্টেম্বরের শেষ নাগাদ যুদ্ধবিরতি ঘোষণার পরও গাজায় ১ হাজার ৪৩১ জন নিহত ও ৫ হাজার ২৬ জন আহত হওয়ার তথ্য জানিয়েছে জাতিসংঘের মানবিক সহায়তা সমন্বয় দপ্তর (OCHA), গাজার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্য উদ্ধৃত করে।
গাজায় ধ্বংসের মাত্রা এতটাই ব্যাপক যে বহু পরিবার এখন আর নিজেদের বাড়ির অস্তিত্বই খুঁজে পাচ্ছে না। ইউরোপীয় ইউনিয়ন, জাতিসংঘ ও বিশ্বব্যাংকের যৌথ ক্ষয়ক্ষতি মূল্যায়নে বলা হয়েছে, দুই বছরের সংঘাতে গাজার অবকাঠামোর সরাসরি ক্ষতি হয়েছে প্রায় ৩৫ দশমিক ২ বিলিয়ন ডলার। অর্থনৈতিক ক্ষতি আরও ২২ দশমিক ৭ বিলিয়ন ডলার। পুনর্গঠন ও পুনরুদ্ধারে প্রয়োজন হবে আনুমানিক ৭১ দশমিক ৪ বিলিয়ন ডলার।
আবাসন খাত সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। যৌথ মূল্যায়ন অনুযায়ী, ৩ লাখ ৭১ হাজারের বেশি আবাসিক ইউনিট ধ্বংস বা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। স্বাস্থ্য খাতেও পরিস্থিতি ভয়াবহ—গাজার অর্ধেকের বেশি হাসপাতাল কার্যত অচল হয়ে পড়েছে এবং প্রায় সব স্কুলই ক্ষতিগ্রস্ত বা ধ্বংস হয়েছে।
যুদ্ধের কারণে গাজার প্রায় ১৯ লাখ মানুষ অভ্যন্তরীণভাবে বাস্তুচ্যুত হয়েছেন। অনেক পরিবারকে একাধিকবার স্থান পরিবর্তন করতে হয়েছে। জাতিসংঘের মূল্যায়ন অনুযায়ী, ১২ লাখের বেশি মানুষ—গাজার মোট জনসংখ্যার প্রায় ৬০ শতাংশ—তাদের ঘরবাড়ি হারিয়েছেন।
বর্তমানে বহু মানুষ তাঁবু, অস্থায়ী আশ্রয়কেন্দ্র কিংবা ক্ষতিগ্রস্ত ভবনে বসবাস করছেন। বর্ষা ও শীতের মৌসুম সামনে আসায় এসব আশ্রয়স্থলের নিরাপত্তা নিয়েও উদ্বেগ রয়েছে। জাতিসংঘ জানিয়েছে, ৪০০টির বেশি বাস্তুচ্যুত মানুষের আশ্রয়স্থল বন্যার ঝুঁকিতে রয়েছে এবং এসব স্থানে প্রায় ২ লাখ ৩৫ হাজার মানুষ বসবাস করছেন।
গাজার মানবিক সংকট শুধু খাদ্য ও আশ্রয়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। পানি, স্যানিটেশন, বিদ্যুৎ, চিকিৎসা সরঞ্জাম ও জ্বালানির সংকটও তীব্র। জাতিসংঘের সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দক্ষিণ গাজার দুটি সমুদ্রের পানি পরিশোধনাগারের উৎপাদন খুচরা যন্ত্রাংশ ও প্রয়োজনীয় সরঞ্জামের অভাবে কমে গেছে। এর ফলে দেইর আল-বালাহ ও খান ইউনিসের প্রায় ৫ লাখ মানুষের পানীয় জলের সরবরাহ নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
বর্তমানে গাজার ৭৪ শতাংশ মানুষ পানীয় জলের জন্য ট্রাকের মাধ্যমে সরবরাহ করা পানির ওপর নির্ভরশীল বলে জানিয়েছে জাতিসংঘের পানি ও স্যানিটেশন বিষয়ক ক্লাস্টার। একই সঙ্গে অতিরিক্ত ভিড়, অপর্যাপ্ত স্যানিটেশন এবং বিশুদ্ধ পানির সংকটের কারণে সংক্রামক রোগ ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কাও রয়েছে।
বহু ভবন ধ্বংস হয়ে যাওয়ায় গাজায় বিপুল পরিমাণ ধ্বংসস্তূপ জমে আছে। ধ্বংসপ্রাপ্ত ভবনের নিচে এখনও নিখোঁজ ব্যক্তিদের মরদেহ থাকার আশঙ্কা রয়েছে। সেপ্টেম্বরের এক বিবৃতিতে জাতিসংঘের মানবাধিকারবিষয়ক হাইকমিশনার ভলকার তুর্ক বলেন, বহু পরিবারের সদস্যদের মরদেহ হামলায় ধ্বংস হওয়া স্থাপনা থেকে প্রায় তিন বছর পর উদ্ধার করা হচ্ছে। তিনি এ ধরনের হামলার ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক মানবিক আইন লঙ্ঘনের গুরুতর আশঙ্কার কথাও উল্লেখ করেন।
তিন বছর পরও গাজার মানুষের জীবন পুরোপুরি থেমে যায়নি। ধ্বংস হওয়া ঘরবাড়ির পাশে তাঁবু গেড়ে বসবাস, অস্থায়ী বাজার, পানি সংগ্রহ, সীমিত চিকিৎসা এবং শিশুদের জন্য অস্থায়ী শিক্ষার ব্যবস্থা—এসবের মধ্য দিয়েই জীবন চালিয়ে যাচ্ছেন ফিলিস্তিনিরা।
কিন্তু মানবিক সহায়তার অর্থায়ন কমে যাওয়ায় পরিস্থিতি আরও কঠিন হয়ে উঠছে। জাতিসংঘের সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, অক্টোবর থেকে অর্থের সংকটে দৈনিক রান্না করা খাবার ও পরিবারভিত্তিক খাদ্য সহায়তার পরিমাণ উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
গাজার পুনর্গঠন শুধু নতুন ভবন নির্মাণের বিষয় নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে হাসপাতাল, স্কুল, পানি ও বিদ্যুৎ ব্যবস্থা, সড়ক, আবাসন, কৃষি ও স্থানীয় অর্থনীতি পুনরুদ্ধার। জাতিসংঘ, ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও বিশ্বব্যাংকের যৌথ মূল্যায়ন বলছে, আগামী এক দশকে গাজার পুনর্গঠন ও পুনরুদ্ধারে প্রায় ৭১ দশমিক ৪ বিলিয়ন ডলার প্রয়োজন হতে পারে।
জাতিসংঘ মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস ৭ অক্টোবরের তৃতীয় বার্ষিকী উপলক্ষে বলেছেন, গাজার ফিলিস্তিনিরাও ভয়াবহ মানবিক পরিস্থিতির মধ্যে রয়েছেন এবং এই দুর্ভোগের অবসান জরুরি। তিনি যুদ্ধবিরতি স্থায়ী করা, বড় পরিসরে মানবিক সহায়তা পৌঁছানো এবং আন্তর্জাতিক আইন মেনে চলার আহ্বান জানিয়েছেন।
আরও পড়ুন:







