ইউরোপে পৌঁছানো অভিবাসী ও শরণার্থী শিশুদের বড় একটি অংশ এখন অভিভাবক বা আইনগত অভিভাবক ছাড়াই বিপজ্জনক পথে যাত্রা করছে। জাতিসংঘের তিন সংস্থা—আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থা (IOM), জাতিসংঘের শরণার্থী সংস্থা (UNHCR) ও ইউনিসেফের (UNICEF) নতুন যৌথ প্রতিবেদনে উঠে এসেছে, ২০২৫ সালে ইউরোপে পৌঁছানো শিশুদের প্রায় দুই-তৃতীয়াংশই ছিল ‘আনঅ্যাকম্পানিড’ বা অভিভাবকহীন।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৫ সালে ভূমধ্যসাগর, আটলান্টিক ও পশ্চিম বলকানসহ প্রধান অভিবাসনপথ ধরে ইউরোপের বিভিন্ন দেশে মোট ৩১ হাজার ১০০ শিশু পৌঁছায়। এর মধ্যে ২০ হাজার ৮০০ শিশু, অর্থাৎ প্রায় ৬৭ শতাংশ, কোনো বাবা-মা বা আইনগত অভিভাবক ছাড়াই ইউরোপে প্রবেশ করে। ২০২৪ সালে এই হার ছিল ৫১ শতাংশ। অর্থাৎ শিশুদের মোট আগমন কমলেও একা যাত্রা করা শিশুদের অনুপাত উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে।
জাতিসংঘের তথ্য বলছে, ২০২৪ সালের তুলনায় ২০২৫ সালে স্থল ও সমুদ্রপথে ইউরোপে শিশু আগমন ২৫ শতাংশ কমেছে। ২০২৪ সালে এমন পথে প্রায় ৪১ হাজার ৭০০ শিশু ইউরোপে পৌঁছেছিল; ২০২৫ সালে সেই সংখ্যা নেমে আসে ৩১ হাজার ১০০-তে।
তবে এই নিম্নমুখী প্রবণতার মধ্যেই উদ্বেগের জায়গা হলো—অভিভাবকহীন শিশুদের অনুপাত বেড়েছে। অর্থাৎ ইউরোপে আসা শিশুদের সংখ্যা কমলেও তাদের মধ্যে যারা পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন অবস্থায় বিপজ্জনক যাত্রা করছে, তাদের অংশ ক্রমেই বড় হচ্ছে।
জাতিসংঘের সংস্থাগুলো বলছে, নিরাপদ ও বৈধ অভিবাসনের সুযোগ সীমিত থাকায় অনেক শিশু ও কিশোরকে দালাল বা মানবপাচারকারীদের ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে। এতে যাত্রাপথে সহিংসতা, শোষণ, পাচার ও নির্যাতনের ঝুঁকি বাড়ছে।
আইওএম-এর তথ্য অনুযায়ী, ভূমধ্যসাগর, পশ্চিম আফ্রিকার আটলান্টিক রুট ও পশ্চিম বলকান অভিবাসনপথে ১৫ থেকে ২৪ বছর বয়সী ৪ হাজার ৬০০-এর বেশি তরুণের সাক্ষাৎকার নেওয়া হয়েছে। তাদের প্রায় অর্ধেকই যাত্রাপথে শারীরিক সহিংসতার অভিজ্ঞতার কথা জানিয়েছে। লিবিয়াকে এসব সহিংসতার অন্যতম প্রধান স্থান হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
আইওএম-এর মহাপরিচালক অ্যামি পোপ সতর্ক করে বলেছেন, নিরাপদ যাত্রার সুযোগ কমে গেলে শিশুরা পাচারকারীদের ওপর আরও বেশি নির্ভরশীল হয়ে পড়ে এবং সহিংসতা ও শোষণের ঝুঁকিতে পড়ে। তাঁর বক্তব্যের সারকথা—কোনো শিশুর একা এ ধরনের ঝুঁকির মুখোমুখি হওয়া উচিত নয়।
ইউরোপমুখী এই শিশুদের উৎস দেশও অঞ্চলভেদে ভিন্ন। ২০২৫ সালে ইতালিতে ১৪ হাজারের বেশি শিশু পৌঁছায়। তাদের মধ্যে পূর্ব আফ্রিকা ও বাংলাদেশ থেকে আসা শিশুর সংখ্যা উল্লেখযোগ্য ছিল।
অন্যদিকে গ্রিসে আসা শিশুদের মধ্যে আফগানিস্তান ও সিরিয়ার নাগরিকদের উপস্থিতি বেশি দেখা গেছে। স্পেনে পৌঁছানো শিশুদের বড় অংশ এসেছে আলজেরিয়া, মরক্কো ও পশ্চিম আফ্রিকার বিভিন্ন দেশ থেকে।
জাতিসংঘের এই পরিসংখ্যান বাংলাদেশের জন্যও বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। কারণ ইউরোপমুখী অনিয়মিত অভিবাসনের ক্ষেত্রে বাংলাদেশিদের উপস্থিতি রয়েছে এবং শিশু বা কিশোরদের ক্ষেত্রে নিরাপদ অভিবাসন, মানবপাচার প্রতিরোধ ও পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন হওয়ার ঝুঁকি বিশেষ গুরুত্ব বহন করে।
২০২৫ সালে ইউরোপে পৌঁছানো শিশুদের মধ্যে ৭৮ শতাংশ ছিল ছেলে এবং ২২ শতাংশ মেয়ে। অর্থাৎ অভিভাবকহীন অবস্থায় ইউরোপমুখী যাত্রায় ছেলেদের অংশগ্রহণ অনেক বেশি।
ইতালি ও স্পেন ছিল অভিভাবকহীন শিশুদের প্রবেশের ক্ষেত্রে বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। এই দুই দেশে পৌঁছানো শিশুদের প্রায় ৮৬ শতাংশই অভিভাবকহীন বা পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন হিসেবে নিবন্ধিত হয়েছে।
ইউরোপীয় ইউনিয়নের পরিসংখ্যানেও অভিভাবকহীন অপ্রাপ্তবয়স্কদের আবেদন অব্যাহত থাকার চিত্র দেখা যাচ্ছে। ২০২৬ সালের জুনে ইইউ দেশগুলোতে ১ হাজার ১০৫ জন অভিভাবকহীন অপ্রাপ্তবয়স্ক প্রথমবারের মতো আশ্রয়ের আবেদন করে। তাদের মধ্যে সোমালিয়া, মিসর, আফগানিস্তান, সুদান ও ইরিত্রিয়ার নাগরিকদের সংখ্যা উল্লেখযোগ্য ছিল।
২০২৬ সালের মে মাসেও ৯৪৫ জন অভিভাবকহীন অপ্রাপ্তবয়স্ক প্রথমবার আশ্রয়ের আবেদন করেছিল।
জাতিসংঘের সংস্থাগুলোর মতে, নিরাপদ ও বৈধ অভিবাসনের পথ সংকুচিত হলে শিশু ও তরুণদের আরও বিপজ্জনক রুট বেছে নেওয়ার সম্ভাবনা বাড়ে। এর ফলে তারা মানবপাচারকারী ও দালালচক্রের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়তে পারে।
একই সঙ্গে সমুদ্রপথে দুর্ঘটনা, আটক, নিখোঁজ হওয়া, শারীরিক নির্যাতন এবং যৌন ও শ্রম শোষণের মতো ঝুঁকিও তৈরি হয়। পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন শিশুদের ক্ষেত্রে এসব ঝুঁকি মোকাবিলায় তাৎক্ষণিক সুরক্ষা, আবাসন, আইনি সহায়তা এবং মানসিক সহায়তা প্রয়োজন।
জাতিসংঘের সংস্থাগুলো বলছে, শিশুদের বিষয়ে যেকোনো সিদ্ধান্তে তাদের সর্বোত্তম স্বার্থকে অগ্রাধিকার দিতে হবে। সীমান্তে পৌঁছানোর পর শুধু অভিবাসন নিয়ন্ত্রণ নয়, শিশু সুরক্ষাকেও সমান গুরুত্ব দিতে হবে।
ইউরোপীয় ইউনিয়নের নতুন অভিবাসন ও আশ্রয় কাঠামো ২০২৬ সালের জুন থেকে পুরোপুরি কার্যকর হয়েছে। নতুন ব্যবস্থায় সীমান্তে আগত অভিবাসীদের শনাক্তকরণ ও আশ্রয়প্রক্রিয়ায় পরিবর্তন এসেছে। তবে শিশু অধিকার সংগঠনগুলো দীর্ঘদিন ধরে সতর্ক করে আসছে, নতুন নীতির বাস্তবায়নে শিশুদের সুরক্ষা নিশ্চিত করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
আরও পড়ুন:







