নিজেদের প্রতিরক্ষা সক্ষমতা আরও শক্তিশালী করতে নতুন প্রযুক্তির হাইপারসনিক অস্ত্র উন্নয়নে বড় অগ্রগতি অর্জন করেছে দক্ষিণ কোরিয়া। দেশটির প্রেসিডেন্টের কার্যালয় জানিয়েছে, বৃহস্পতিবার (৮ অক্টোবর) পরীক্ষামূলক উৎক্ষেপণে ক্ষেপণাস্ত্রটি সফলভাবে বুস্টার থেকে বিচ্ছিন্ন হয়, নির্ধারিত গতিপথ অনুসরণ করে এবং লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানে।
দক্ষিণ কোরিয়ার দাবি, এই পরীক্ষা দেশটির নিজস্ব প্রযুক্তিতে উন্নত হাইপারসনিক অস্ত্র তৈরির ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক। অস্ত্রটি সম্পূর্ণভাবে উন্নয়ন ও কার্যকরভাবে মোতায়েন করা গেলে কোরীয় উপদ্বীপের গুরুত্বপূর্ণ লক্ষ্যবস্তুতে দ্রুত ও নির্ভুল আঘাত হানার সক্ষমতা বাড়বে। খবর ইয়োনহাপ নিউজ এজেন্সি, অ্যাসোসিয়েটেড প্রেস ও আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের।
দক্ষিণ কোরিয়ার প্রেসিডেন্টের কার্যালয়ের তথ্য অনুযায়ী, পরীক্ষাটিতে হাইপারসনিক গ্লাইড ভেহিকলের (এইচজিভি) গুরুত্বপূর্ণ প্রযুক্তিগত সক্ষমতা যাচাই করা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে উচ্চগতিতে চলার সময় গতিপথ নিয়ন্ত্রণ, প্রচণ্ড তাপ সহ্য করার উপযোগী উপাদান এবং কম উচ্চতায় অনিয়মিতভাবে দিক পরিবর্তনের সক্ষমতা।
এইচজিভি ব্যবস্থায় একটি বুস্টার রকেট অস্ত্রটিকে উচ্চ বায়ুমণ্ডলে নিয়ে যায়। এরপর সেটি বুস্টার থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে অত্যন্ত উচ্চগতিতে গ্লাইড করে লক্ষ্যবস্তুর দিকে অগ্রসর হয়।
দক্ষিণ কোরিয়ার কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, পরীক্ষার সময় অস্ত্রটি অনুভূমিক ও উল্লম্ব—উভয় দিকেই গতিপথ পরিবর্তন করে নির্ধারিত লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানে। তবে ক্ষেপণাস্ত্রটির সুনির্দিষ্ট সর্বোচ্চ গতি, পাল্লা এবং পূর্ণাঙ্গ কার্যক্ষমতা সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য প্রকাশ করা হয়নি।
হাইপারসনিক অস্ত্র বলতে সাধারণত এমন অস্ত্রকে বোঝানো হয়, যা শব্দের গতির অন্তত পাঁচ গুণ গতিতে চলতে সক্ষম। এ ধরনের অস্ত্রের অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো উচ্চগতি এবং উড্ডয়নের সময় গতিপথ পরিবর্তনের ক্ষমতা।
প্রচলিত ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রের তুলনায় কিছু হাইপারসনিক গ্লাইড ব্যবস্থা অপেক্ষাকৃত কম উচ্চতায় উড়ে এবং চলার পথে কৌশলগতভাবে দিক পরিবর্তন করতে পারে। ফলে প্রচলিত ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষাব্যবস্থার জন্য এগুলোর গতিপথ আগেভাগে নির্ধারণ ও প্রতিহত করা আরও কঠিন হতে পারে।
তবে সব হাইপারসনিক অস্ত্র একই প্রযুক্তিতে তৈরি নয়। দক্ষিণ কোরিয়ার পরীক্ষিত ব্যবস্থাটি হাইপারসনিক গ্লাইড ভেহিকল; এর প্রযুক্তিগত বৈশিষ্ট্য ও প্রকৃত সামরিক কার্যকারিতা সম্পর্কে আরও তথ্য প্রয়োজন।
দক্ষিণ কোরিয়ার প্রেসিডেন্ট লি জে-মিয়ং সরাসরি পরীক্ষামূলক উৎক্ষেপণ পর্যবেক্ষণ করেন। তাঁর সঙ্গে প্রতিরক্ষামন্ত্রী ক্যাং শিন-চুলসহ ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।
পরীক্ষার পর প্রেসিডেন্ট লি দেশের প্রতিরক্ষা প্রযুক্তি উন্নয়নে যুক্ত গবেষক ও সংশ্লিষ্ট দলকে অভিনন্দন জানান। তিনি জাতীয় নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে নিজস্ব সক্ষমতা বাড়ানোর ওপর গুরুত্বারোপ করেন।
প্রেসিডেন্টের কার্যালয় জানিয়েছে, হাইপারসনিক প্রযুক্তির আরও উন্নয়ন এবং ভবিষ্যতে অস্ত্রটির কার্যকর মোতায়েনের প্রস্তুতি এগিয়ে নেওয়া হবে। তবে পরীক্ষায় সফল হওয়া আর পূর্ণাঙ্গ সামরিক ব্যবহারের জন্য প্রস্তুত হওয়া এক বিষয় নয়। অস্ত্রটির পরবর্তী উন্নয়ন, যাচাই ও মোতায়েনের সময়সীমা সম্পর্কে বিস্তারিত জানানো হয়নি।
দক্ষিণ কোরিয়ার এই পরীক্ষা এমন এক সময়ে অনুষ্ঠিত হলো, যখন দুই কোরিয়ার মধ্যে সামরিক উত্তেজনা বেড়েছে। এর আগে ৩ অক্টোবর উত্তর কোরিয়াও হাইপারসনিক সক্ষমতাসম্পন্ন ক্ষেপণাস্ত্র পরীক্ষার দাবি করে।
উত্তর কোরিয়ার নেতা কিম জং উনের উপস্থিতিতে পরিচালিত ওই পরীক্ষায় ক্ষেপণাস্ত্রটি এক হাজার কিলোমিটারের বেশি পথ পাড়ি দিয়েছে বলে পিয়ংইয়ং দাবি করে। দক্ষিণ কোরিয়ার সামরিক বাহিনী অবশ্য এর উড্ডয়ন দূরত্ব প্রায় ৭০০ কিলোমিটার বলে জানিয়েছিল।
সাম্প্রতিক সময়ে সীমান্ত এলাকায় স্থলমাইন বিস্ফোরণে দক্ষিণ কোরিয়ার কয়েকজন সেনা আহত হওয়ার ঘটনাও দুই দেশের সম্পর্ককে আরও উত্তেজনাপূর্ণ করেছে। সিউল ওই মাইন উত্তর কোরিয়ার সেনাদের পুঁতে রাখার কারণে বিস্ফোরিত হয়েছে বলে জানিয়েছে; পিয়ংইয়ং এ অভিযোগ অস্বীকার করেছে।
এমন পরিস্থিতিতে দক্ষিণ কোরিয়ার নতুন অস্ত্রের পরীক্ষা দেশটির প্রচলিত সামরিক প্রতিরোধক্ষমতা বাড়ানোর উদ্যোগের অংশ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
বিশ্লেষকদের মতে, হাইপারসনিক অস্ত্রের উন্নয়ন পূর্ব এশিয়ায় সামরিক প্রতিযোগিতাকে আরও তীব্র করতে পারে। দক্ষিণ কোরিয়া ও উত্তর কোরিয়া উভয়ই নিজেদের ক্ষেপণাস্ত্র প্রযুক্তি উন্নত করার চেষ্টা করছে। এর পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্র, চীন ও রাশিয়ার মতো শক্তিধর দেশও উন্নত হাইপারসনিক অস্ত্র নিয়ে কাজ করছে।
দক্ষিণ কোরিয়ার জন্য এ প্রযুক্তি গুরুত্বপূর্ণ হলেও পরীক্ষার সফলতা একাই অস্ত্রটির পূর্ণাঙ্গ কার্যকারিতা বা প্রতিপক্ষের প্রতিরক্ষাব্যবস্থা ভেদ করার নিশ্চয়তা দেয় না। নির্ভরযোগ্যতা, নির্ভুলতা, উৎপাদন সক্ষমতা এবং বাস্তব পরিস্থিতিতে কার্যকারিতা যাচাইয়ের জন্য আরও পরীক্ষা প্রয়োজন হতে পারে।
সব মিলিয়ে, নিজস্ব প্রযুক্তিতে হাইপারসনিক গ্লাইড ভেহিকলের প্রথম সফল পরীক্ষামূলক উৎক্ষেপণ দক্ষিণ কোরিয়ার প্রতিরক্ষা গবেষণায় উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি। তবে অস্ত্রটি কখন পূর্ণাঙ্গ সামরিক ব্যবহারের উপযোগী হবে, তা এখনো স্পষ্ট নয়।
আরও পড়ুন:







