তুরস্কের ইস্তাম্বুলে সাততলা একটি আবাসিক ভবনের আংশিক ধসে তিন শিশুসহ অন্তত পাঁচজন নিহত হয়েছেন। বৃহস্পতিবার (৮ অক্টোবর) ভোরে শহরটির এশীয় অংশের মালতেপে জেলার জেভিজলি এলাকায় এ দুর্ঘটনা ঘটে। শুক্রবার (৯ অক্টোবর) সকালে ধ্বংসস্তূপ থেকে সর্বশেষ মরদেহ উদ্ধারের পর অনুসন্ধান ও উদ্ধার অভিযান সমাপ্ত ঘোষণা করেছে কর্তৃপক্ষ।
ইস্তাম্বুলের গভর্নরের কার্যালয়ের তথ্য অনুযায়ী, নিহতদের মধ্যে পাঁচ ও ১০ বছর বয়সী দুই মেয়ে শিশু এবং ১২ বছর বয়সী এক ছেলে রয়েছে। বাকি দুজনও ভবনধসের ঘটনায় প্রাণ হারিয়েছেন। এ ঘটনায় ধ্বংসস্তূপ থেকে নয়জনকে জীবিত উদ্ধার করা হয়েছে।
কর্তৃপক্ষ জানায়, বৃহস্পতিবার স্থানীয় সময় ভোর প্রায় ৫টা ৪০ মিনিটে ভবনটির নিচের তিনটি তলা ধসে পড়ে। এতে ওপরের চারটি তলা ধ্বংসস্তূপের ওপর ঝুলন্ত অবস্থায় থেকে যায়।
ভবনধসের খবর পাওয়ার পরপরই ঘটনাস্থলে পৌঁছায় দমকল বাহিনী, পুলিশ, চিকিৎসক ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা বিভাগের উদ্ধারকর্মীরা। ধ্বংসস্তূপের নিচে কেউ আটকে আছেন কি না, তা শনাক্ত করতে উদ্ধারকাজে বিশেষ প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত কুকুরও ব্যবহার করা হয়।
ভবনটির ওপরের অংশ আরও ধসে পড়ার আশঙ্কা থাকায় সতর্কতার সঙ্গে উদ্ধার অভিযান পরিচালনা করা হয়। উদ্ধারকর্মীরা ধাপে ধাপে ধ্বংসাবশেষ সরিয়ে নিখোঁজ ব্যক্তিদের সন্ধান চালান।
শুক্রবার সকাল ৬টা ১৫ মিনিটে সর্বশেষ নিখোঁজ ব্যক্তির মরদেহ উদ্ধার করা হয়। এরপর কর্তৃপক্ষ অনুসন্ধান ও উদ্ধার অভিযান শেষ হওয়ার ঘোষণা দেয়।
ইস্তাম্বুলের উপমেয়র নুরি আসলান জানান, ভবনটি ১৯৮৭ সালে নির্মিত হয়েছিল। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, ভবনটির বেসমেন্ট, নিচতলা এবং প্রথম দুই তলা সে সময়কার নির্মাণবিধি অনুসারে তৈরি হয়েছিল। পরবর্তী সময়ে ভবনটির ওপরের তলাগুলো যুক্ত করা হয়।
স্থানীয় সংবাদমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী, ভবনটির ওপরের দুটি তলা অনুমোদন ছাড়াই নির্মাণ করা হয়েছিল বলে অভিযোগ রয়েছে। তবে ভবনধসের সঙ্গে এসব নির্মাণকাজের সরাসরি সম্পর্ক রয়েছে কি না, তা তদন্তের মাধ্যমে নির্ধারণ করা হবে।
ভবনটির নিচতলায় একটি বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান ও টেক্সটাইল ওয়ার্কশপ ছিল। ওপরের তলাগুলোতে আবাসিক ফ্ল্যাট ছিল বলে কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে।
দুর্ঘটনার পর নিরাপত্তার স্বার্থে আশপাশের তিনটি ভবন খালি করে দেওয়া হয়। মোট ৫৫ জন বাসিন্দাকে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে।
উদ্ধার অভিযান চলাকালে ক্ষতিগ্রস্ত ভবনের আশপাশে নিরাপত্তাবেষ্টনী তৈরি করা হয় এবং কয়েকটি সড়কে যান চলাচল নিয়ন্ত্রণ করা হয়। ধ্বংসস্তূপ অপসারণের পাশাপাশি আশপাশের ভবনগুলোর নিরাপত্তাও পরীক্ষা করছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।
ভবনধসের কারণ অনুসন্ধানে ইস্তাম্বুলের সংশ্লিষ্ট প্রসিকিউটর কার্যালয় তদন্ত শুরু করেছে। এ ঘটনায় ভবনটির স্থপতি এবং নির্মাণকাজের দায়িত্বে থাকা এক ব্যক্তিকে আটক করা হয়েছে বলে স্থানীয় সংবাদমাধ্যম জানিয়েছে।
তদন্তকারীরা ভবনটির নকশা, নির্মাণ অনুমোদন, পরবর্তী সময়ে তলা সংযোজন এবং নির্মাণমানসংক্রান্ত নথিপত্র পরীক্ষা করছেন। ভবনটি ধসে পড়ার পেছনে কাঠামোগত দুর্বলতা, নির্মাণগত ত্রুটি কিংবা অন্য কোনো কারণ রয়েছে কি না, তা এখনো নিশ্চিত হওয়া যায়নি।
ইস্তাম্বুলসহ তুরস্কের বিভিন্ন শহরে পুরোনো ও ঝুঁকিপূর্ণ ভবন নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই উদ্বেগ রয়েছে। বিশেষ করে ভূমিকম্পপ্রবণ দেশটিতে ভবনের কাঠামোগত নিরাপত্তা, নির্মাণমান এবং অনুমোদনবিহীন সম্প্রসারণ গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হিসেবে বিবেচিত হয়।
সাম্প্রতিক এই দুর্ঘটনা নগর এলাকার পুরোনো ভবনগুলোর নিরাপত্তা যাচাই এবং নির্মাণবিধি যথাযথভাবে বাস্তবায়নের প্রয়োজনীয়তা আবারও সামনে এনেছে।
তবে ইস্তাম্বুলের এই ভবনধসের প্রকৃত কারণ এখনো তদন্তাধীন। তদন্তের ফল প্রকাশের পরই দুর্ঘটনার পেছনে নির্মাণগত ত্রুটি বা অন্য কোনো অবহেলা ছিল কি না, সে বিষয়ে নিশ্চিত হওয়া যাবে।
আরও পড়ুন:







