বন্যায় সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত এলাকাগুলোর মধ্যে রয়েছে সান্তিয়াগোর পূর্বাঞ্চলীয় উপশহর লাস কন্দেস। বৃহস্পতিবার (৮ অক্টোবর) ভারী বৃষ্টির পর পাহাড়ি ঢাল ও জলধারা থেকে নেমে আসা পানি, কাদা ও পাথরের প্রবল স্রোত আবাসিক এলাকায় প্রবেশ করে। মুহূর্তের মধ্যে সড়কগুলো পানিতে ডুবে যায় এবং পার্ক করা গাড়ি স্রোতে ভেসে যেতে দেখা যায়।
বন্যার পানিতে বিভিন্ন বাড়িঘর ও চিকিৎসাকেন্দ্র প্লাবিত হয়েছে। কিছু এলাকায় রাস্তা চলাচলের অনুপযোগী হয়ে পড়ে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে ফায়ার সার্ভিস, উদ্ধারকর্মী ও জরুরি সেবার সদস্যরা উদ্ধার তৎপরতা চালান।
কর্তৃপক্ষের তথ্য অনুযায়ী, বন্যা ও কাদার ঢলে অন্তত ছয়জন আহত হয়েছেন। আহতদের মধ্যে এক বছর বয়সী একটি শিশুও রয়েছে, যার হাড় ভাঙার খবর পাওয়া গেছে।
আকস্মিক বন্যায় বিভিন্ন স্থানে মানুষ আটকা পড়েন। ফায়ার সার্ভিসের সদস্যরা এক হাজারের বেশি মানুষকে উদ্ধার করেছেন অথবা নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নিয়েছেন বলে প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে।
বন্যার কারণে কয়েকটি চিকিৎসাকেন্দ্র ও একটি বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। চিকিৎসাকেন্দ্রের কক্ষ, শয্যা এবং চিকিৎসাসামগ্রীতে কাদা-পানি ঢুকে পড়ায় জরুরি সেবা পরিচালনায় সমস্যার সৃষ্টি হয়।
লাস কন্দেসের মেয়র কাতালিনা সান মার্টিনের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, সাম্প্রতিক দিনগুলোতে ওই এলাকায় প্রায় ১৪৪ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত হয়েছে। অক্টোবর মাসের স্বাভাবিক গড় বৃষ্টিপাতের তুলনায় এই পরিমাণ প্রায় নয় গুণ বেশি।
অস্বাভাবিক ভারী বৃষ্টিতে মাটি অতিরিক্ত পানিতে সিক্ত হয়ে পড়েছে। ফলে পাহাড়ি ঢাল থেকে কাদা ও পাথর নেমে আসা এবং নতুন করে ভূমিধসের ঝুঁকি বেড়েছে।
সান্তিয়াগোর মধ্য দিয়ে প্রবাহিত মাপোচো নদীর পানিও উপচে পড়ে। এতে নদীর আশপাশের এলাকায় বন্যার ঝুঁকি তৈরি হয় এবং কিছু বাসিন্দাকে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়।
পরিস্থিতির ভয়াবহতা বিবেচনায় চিলির প্রেসিডেন্ট হোসে আন্তোনিও কাস্ত লাস কন্দেস এলাকায় বিপর্যয় পরিস্থিতি ঘোষণা করেন। এর ফলে উদ্ধার অভিযান, জরুরি সহায়তা, ক্ষয়ক্ষতি নিরূপণ ও পুনর্বাসন কার্যক্রম সমন্বয়ে সরকারি সংস্থাগুলো বিশেষ ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ পায়।
এদিকে সান্তিয়াগো ও আশপাশের আরও ১০টি এলাকায় ভূমিধস ও বন্যার আশঙ্কায় উচ্চ সতর্কতা জারি করা হয়। ঝুঁকিপূর্ণ এলাকাগুলোতে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের কার্যক্রমও সাময়িকভাবে বন্ধ রাখার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
কর্তৃপক্ষ বাসিন্দাদের অপ্রয়োজনে বাইরে বের না হওয়া, প্লাবিত সড়ক এড়িয়ে চলা এবং জরুরি নির্দেশনা মেনে চলার আহ্বান জানিয়েছে।
টানা বৃষ্টির কারণে সান্তিয়াগোর বিভিন্ন এলাকায় বিদ্যুৎ সরবরাহও ব্যাহত হয়েছে। সপ্তাহের শুরুর দিকে ঝড়বৃষ্টির প্রভাবে প্রায় ১২ হাজার গ্রাহক বিদ্যুৎবিহীন হয়ে পড়েছিলেন বলে কর্মকর্তারা জানিয়েছেন।
বন্যার পানি ও কাদা জমে সড়ক চলাচলে বিঘ্ন সৃষ্টি হওয়ায় উদ্ধারকর্মীদের কাজেও চ্যালেঞ্জ তৈরি হয়। ক্ষতিগ্রস্ত বাড়িঘর ও অবকাঠামোর অবস্থা যাচাই এবং ঝুঁকিপূর্ণ এলাকার বাসিন্দাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে জরুরি তৎপরতা অব্যাহত থাকে।
বিশেষজ্ঞদের পর্যবেক্ষণে, প্রশান্ত মহাসাগরের পানির তাপমাত্রা বৃদ্ধির সঙ্গে সম্পর্কিত এল নিনো আবহাওয়াব্যবস্থা বৈশ্বিক বৃষ্টিপাতের ধরনে পরিবর্তন আনতে পারে। দক্ষিণ গোলার্ধের বসন্তকালে এর প্রভাবে কিছু অঞ্চলে স্বাভাবিকের তুলনায় বেশি বৃষ্টিপাত হতে পারে।
বিশ্ব আবহাওয়া সংস্থার পূর্বাভাস নিয়ে প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৬ সালের এল নিনো ডিসেম্বরের দিকে সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছাতে পারে। তবে চিলির এই নির্দিষ্ট বন্যার পেছনে এল নিনোর অবদান কতটা, তা নির্ধারণে আরও আবহাওয়াগত বিশ্লেষণ প্রয়োজন।
ভারী বৃষ্টির পর বন্যা ও ভূমিধসের ঝুঁকি পুরোপুরি কেটে যায়নি। ক্ষতিগ্রস্ত এলাকায় উদ্ধার, নিরাপত্তা পর্যবেক্ষণ ও পুনরুদ্ধার কার্যক্রম চলমান রয়েছে। নতুন করে বৃষ্টিপাত হলে পরিস্থিতির আরও অবনতি ঘটতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
চিলির সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ বাসিন্দাদের সতর্ক থাকার এবং সরকারি নির্দেশনা অনুসরণ করার আহ্বান জানিয়েছে।
আরও পড়ুন:







