সুদান ও মিসরের সীমান্তবর্তী এলাকায় একটি স্বর্ণখনিতে বিমান হামলায় অন্তত ৭২ জন শ্রমিক নিহত হয়েছেন। গত শনিবার (১০ অক্টোবর) সুদানের নীল নদ রাজ্যের সীমান্তবর্তী দুর্গম পার্বত্য অঞ্চলে এ হামলার ঘটনা ঘটে। সুদানের মানবাধিকার সংগঠন ‘ইমার্জেন্সি লইয়ার্স’ প্রাথমিকভাবে নিহতের এ সংখ্যা জানিয়েছে।
সংগঠনটি হামলার জন্য মিসরের বিমানবাহিনীকে দায়ী করেছে। তবে এ অভিযোগ স্বাধীনভাবে নিশ্চিত করা সম্ভব হয়নি। এ ঘটনায় মিসরীয় কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকেও তাৎক্ষণিক কোনো আনুষ্ঠানিক বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, সুদান-মিসর সীমান্তের কাছাকাছি জাবাল আল-উকাইদাত এলাকায় এ হামলা চালানো হয়। অঞ্চলটি অনানুষ্ঠানিক ও প্রচলিত পদ্ধতিতে স্বর্ণ উত্তোলনের জন্য পরিচিত। জীবিকার তাগিদে বহু শ্রমিক সেখানে কাজ করেন।
মানবাধিকার সংগঠনটির দাবি, হামলার সময় ওই এলাকায় বেসামরিক স্বর্ণখনি শ্রমিকেরা অবস্থান করছিলেন। বিমান থেকে একাধিকবার হামলা চালানো হলে ঘটনাস্থলে ব্যাপক প্রাণহানির ঘটনা ঘটে।
হামলা থেকে বাঁচতে শ্রমিকেরা আশপাশের পাহাড়ি এলাকায় পালিয়ে যান। এতে হতাহতদের সঠিক সংখ্যা নির্ধারণ এবং নিখোঁজ ব্যক্তিদের সন্ধান করা কঠিন হয়ে পড়েছে।
বার্তা সংস্থা এএফপিকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে বেঁচে যাওয়া এক শ্রমিক আবদেলআজিজ ইউসুফ জানান, স্থানীয় সময় সকাল ৮টার দিকে আকাশে একটি বিমান দেখতে পান তাঁরা। এরপর খনিতে পাঁচ দফা হামলা চালানো হয় বলে তিনি দাবি করেন।
তিনি জানান, হামলার পর প্রাণ বাঁচাতে শ্রমিকেরা পাহাড়ের দিকে ছুটে যান। দ্বিতীয়বার হামলার আশঙ্কায় সবাই আতঙ্কিত হয়ে পড়েন।
আরেক প্রত্যক্ষদর্শী শরাফ আলী জানান, হামলার পর শ্রমিকেরা বিভিন্ন দিকে ছড়িয়ে পড়েন। কেউ কাছাকাছি বাজারের দিকে যান, আবার কেউ অন্য পথে পালিয়ে যান। ফলে ঠিক কতজন নিহত বা নিখোঁজ হয়েছেন, তা নির্ধারণ করা কঠিন হয়ে পড়েছে।
সুদানের মানবাধিকার সংগঠন ‘ইমার্জেন্সি লইয়ার্স’ অভিযোগ করেছে, মিসরের বিমানবাহিনী সুদানের অভ্যন্তরে অবস্থিত খনি এলাকায় হামলা চালিয়েছে। সংগঠনটির ভাষ্য অনুযায়ী, এ ঘটনায় বেসামরিক শ্রমিকদের প্রাণহানি ঘটেছে।
তবে হামলার জন্য মিসরীয় বাহিনীকে দায়ী করার এ অভিযোগ স্বাধীনভাবে যাচাই করা যায়নি। মিসরের সেনাবাহিনীও এ হামলার দায় স্বীকার করেনি। ফলে হামলার প্রকৃত উৎস, উদ্দেশ্য এবং সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর ভূমিকা এখনো স্পষ্ট নয়।
এদিকে সুদানের সেনাপ্রধান ও অন্তর্বর্তীকালীন সার্বভৌম পরিষদের প্রধান আবদেল ফাত্তাহ আল-বুরহান সোমবার (১২ অক্টোবর) ঘটনাটি তদন্তের নির্দেশ দিয়েছেন বলে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম জানিয়েছে।
জাবাল আল-উকাইদাত এলাকায় চলতি বছরের জুন মাসেও বিমান হামলার ঘটনা ঘটেছিল। সে সময় একই ধরনের অনানুষ্ঠানিক স্বর্ণখনি এলাকায় হামলায় ২৩ জন শ্রমিক নিহত হয়েছিলেন বলে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
মিসরীয় কর্তৃপক্ষ এর আগে সীমান্ত এলাকায় অবৈধ স্বর্ণ উত্তোলন ও চোরাচালানবিরোধী অভিযান পরিচালনার কথা জানিয়েছিল।
সুদান ও মিসরের মধ্যে সীমান্তের কিছু এলাকা নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে বিরোধ রয়েছে। বিশেষ করে হালায়েব ত্রিভুজ অঞ্চলটি দুই দেশের দাবির কারণে কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ। অঞ্চলটিতে খনিজ সম্পদ, স্বর্ণ উত্তোলন এবং সীমান্তপথে অবৈধ বাণিজ্য নিয়ে বিভিন্ন সময়ে উত্তেজনা তৈরি হয়েছে।
২০২৩ সালের এপ্রিল থেকে সুদানের সেনাবাহিনী ও আধাসামরিক বাহিনী র্যাপিড সাপোর্ট ফোর্সেসের (আরএসএফ) মধ্যে সংঘাত দেশটিতে ব্যাপক মানবিক সংকট তৈরি করেছে। সংঘাতের কারণে বহু মানুষ জীবিকার সন্ধানে ঝুঁকিপূর্ণ অনানুষ্ঠানিক স্বর্ণখনি খাতে কাজ করতে বাধ্য হচ্ছেন।
স্বর্ণ সুদানের অর্থনীতির গুরুত্বপূর্ণ সম্পদ। একই সঙ্গে দেশটির সংঘাত ও চোরাচালান অর্থনীতিতেও এ খাতের ভূমিকা নিয়ে উদ্বেগ রয়েছে।
দুর্গম এলাকা, চিকিৎসাসেবার সীমাবদ্ধতা এবং পালিয়ে যাওয়া শ্রমিকদের সন্ধান করতে না পারার কারণে নিহত ও আহতদের পূর্ণাঙ্গ হিসাব পেতে সময় লাগতে পারে। মানবাধিকার সংগঠনটির দেওয়া ৭২ জন নিহতের সংখ্যা প্রাথমিক হিসাব; চূড়ান্ত সংখ্যা এখনো নিশ্চিত নয়।
ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত, হতাহতদের পরিচয় শনাক্ত এবং নিখোঁজ শ্রমিকদের সন্ধান এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। পাশাপাশি সীমান্তবর্তী খনিগুলোতে কর্মরত বেসামরিক শ্রমিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার প্রশ্নও সামনে এসেছে।
আরও পড়ুন:







