অর্থনীতিতে ২০২৬ সালের নোবেল পুরস্কার পেয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রের দুই বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ রবার্ট ই. হল ও মাইকেল উডফোর্ড। সামষ্টিক অর্থনীতির স্থিতিশীলতা বজায় রাখার নীতিমালার ক্ষুদ্র অর্থনৈতিক ভিত্তি প্রতিষ্ঠায় গুরুত্বপূর্ণ অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ তাঁদের এ পুরস্কার দেওয়া হয়েছে।
সোমবার (১২ অক্টোবর) সুইডেনের রাজধানী স্টকহোমে রয়্যাল সুইডিশ একাডেমি অব সায়েন্সেস এ পুরস্কার ঘোষণা করে। তাঁদের গবেষণা অর্থনৈতিক মন্দা, মূল্যস্ফীতি, জ্বালানিসংকট এবং অর্থনীতিতে আকস্মিক ধাক্কা মোকাবিলায় সরকার ও কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নীতিনির্ধারণকে আরও কার্যকর করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে বলে জানিয়েছে পুরস্কার কর্তৃপক্ষ।
এ বছরের পুরস্কারের আনুষ্ঠানিক নাম ‘দ্য সেভেরিজেস রিক্সব্যাংক প্রাইজ ইন ইকোনমিক সায়েন্সেস ইন মেমোরি অব আলফ্রেড নোবেল’। দুই বিজয়ী যৌথভাবে ১ কোটি ২০ লাখ সুইডিশ ক্রোনা পাবেন। অর্থাৎ প্রত্যেকে পাবেন ৬০ লাখ সুইডিশ ক্রোনা।
নোবেল পুরস্কার কমিটির মতে, রবার্ট ই. হল ও মাইকেল উডফোর্ড এমন কিছু সামষ্টিক অর্থনৈতিক মডেল তৈরি ও বিকাশে অবদান রেখেছেন, যেগুলো অর্থনীতির উত্থান-পতন মোকাবিলায় কার্যকর নীতিমালা গ্রহণে সহায়তা করে।
একটি দেশের অর্থনীতিতে কখনো প্রবৃদ্ধি বাড়ে, আবার কখনো উৎপাদন কমে, বেকারত্ব বাড়ে কিংবা মূল্যস্ফীতি তীব্র হয়। এসব পরিস্থিতিতে সরকার ও কেন্দ্রীয় ব্যাংক কী ধরনের পদক্ষেপ নেবে, তা নির্ধারণ করা অর্থনৈতিক নীতিনির্ধারণের অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ।
হল ও উডফোর্ডের গবেষণা দেখিয়েছে, শুধু মূল্যস্ফীতি, উৎপাদন ও ভোগের মতো অর্থনৈতিক সূচকের পারস্পরিক পরিসংখ্যানগত সম্পর্ক বিশ্লেষণ করলেই যথেষ্ট নয়। বরং পরিবার ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান কীভাবে সিদ্ধান্ত নেয়, ভবিষ্যৎ সম্পর্কে তাদের প্রত্যাশা কী এবং এসব সিদ্ধান্ত সম্মিলিতভাবে সামগ্রিক অর্থনীতিকে কীভাবে প্রভাবিত করে, তা বোঝাও জরুরি।
১৯৭০-এর দশকে তেলের মূল্যবৃদ্ধি ও জ্বালানিসংকটের সময় পশ্চিমা অর্থনীতিগুলো উচ্চ মূল্যস্ফীতি, দুর্বল প্রবৃদ্ধি ও বেকারত্বের মতো সমস্যার মুখোমুখি হয়েছিল। তখন প্রচলিত অর্থনৈতিক মডেল দিয়ে এসব সমস্যার কার্যকর সমাধান খুঁজে পাওয়া কঠিন হয়ে পড়ে।
এর আগে অর্থনৈতিক মন্দা মোকাবিলায় সুদের হার কমানো ও সরকারি ব্যয় বাড়ানোর মতো পদক্ষেপকে গুরুত্ব দেওয়া হতো। কিন্তু অর্থনীতির বিভিন্ন উপাদান কীভাবে একে অপরকে প্রভাবিত করে এবং মানুষ ভবিষ্যৎ পরিস্থিতি সম্পর্কে কী প্রত্যাশা করে, তা যথাযথভাবে বিবেচনা না করলে এসব পদক্ষেপ সব সময় প্রত্যাশিত ফল দেয় না।
হল ও উডফোর্ডের গবেষণা অর্থনৈতিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের পেছনে পরিবার ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের আচরণ এবং ভবিষ্যৎ সম্পর্কে তাদের প্রত্যাশাকে গুরুত্ব দিয়ে নীতিনির্ধারণের তাত্ত্বিক ভিত্তি শক্তিশালী করেছে।
অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে কেন্দ্রীয় ব্যাংক সাধারণত সুদের হার ও মুদ্রানীতি ব্যবহার করে। অন্যদিকে সরকার কর, সরকারি ব্যয় ও বাজেটনীতির মাধ্যমে অর্থনীতিকে প্রভাবিত করে।
হল ও উডফোর্ডের গবেষণাভিত্তিক মডেলগুলো এসব নীতি কখন এবং কীভাবে প্রয়োগ করা উচিত, তা বিশ্লেষণে সহায়তা করে। বিশেষ করে অর্থনীতিতে মন্দা দেখা দিলে কী ধরনের পদক্ষেপ প্রয়োজন এবং অতিরিক্ত চাহিদার কারণে মূল্যস্ফীতি বাড়লে কীভাবে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করা যায়, তা বুঝতে এ গবেষণা গুরুত্বপূর্ণ।
এ ক্ষেত্রে জনগণ ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের প্রত্যাশাও বড় ভূমিকা রাখে। কেন্দ্রীয় ব্যাংক ভবিষ্যৎ সুদের হার সম্পর্কে কী বার্তা দিচ্ছে কিংবা সরকার কী ধরনের অর্থনৈতিক নীতি গ্রহণ করতে যাচ্ছে—এসব তথ্যের ভিত্তিতে মানুষ সঞ্চয়, ব্যয়, বিনিয়োগ ও পণ্য উৎপাদনের সিদ্ধান্ত নেয়।
পুরস্কার কমিটির ভাষ্য অনুযায়ী, দুই অর্থনীতিবিদের গবেষণা কেন্দ্রীয় ব্যাংক ও সরকারকে অর্থনীতির আকস্মিক পরিবর্তন মোকাবিলায় আরও ভালোভাবে প্রস্তুত হতে সাহায্য করেছে।
রবার্ট ই. হল যুক্তরাষ্ট্রের একজন প্রখ্যাত অর্থনীতিবিদ। ১৯৪৩ সালে ক্যালিফোর্নিয়ার পালো আল্টোতে জন্মগ্রহণ করেন তিনি। তিনি যুক্তরাষ্ট্রের স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক।
অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, ভোগব্যয়, কর্মসংস্থান ও সামষ্টিক অর্থনীতির বিভিন্ন বিষয়ে তাঁর গবেষণা রয়েছে। বিশেষ করে পরিবারগুলো ভবিষ্যৎ আয় সম্পর্কে প্রত্যাশার ভিত্তিতে কীভাবে ভোগ ও সঞ্চয়ের সিদ্ধান্ত নেয়, তা বিশ্লেষণে তাঁর কাজ গুরুত্বপূর্ণ।
তাঁর গবেষণা অর্থনীতির সামগ্রিক চিত্র বোঝার পাশাপাশি ব্যক্তিগত ও পারিবারিক সিদ্ধান্ত কীভাবে জাতীয় অর্থনীতিতে প্রভাব ফেলে, তা ব্যাখ্যা করতে সহায়তা করেছে।
মাইকেল উডফোর্ড যুক্তরাষ্ট্রের আরেকজন বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ। ১৯৫৫ সালে ম্যাসাচুসেটস অঙ্গরাজ্যের চিকোপিতে জন্মগ্রহণ করেন তিনি। তিনি নিউইয়র্কের কলাম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক।
আধুনিক সামষ্টিক অর্থনীতি, মুদ্রানীতি এবং কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নীতিগত যোগাযোগ নিয়ে তাঁর গবেষণা বিশেষভাবে পরিচিত। সুদের হার, মূল্যস্ফীতি এবং ভবিষ্যৎ অর্থনৈতিক পরিস্থিতি সম্পর্কে মানুষের প্রত্যাশা কীভাবে বর্তমান অর্থনৈতিক সিদ্ধান্তকে প্রভাবিত করে, তা তাঁর গবেষণার গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নীতিগত ঘোষণা ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা অর্থনীতির বিভিন্ন পক্ষের আচরণে কী ধরনের পরিবর্তন আনতে পারে, তা বোঝার ক্ষেত্রেও তাঁর কাজ গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখেছে।
অর্থনীতির এ পুরস্কারটি আলফ্রেড নোবেলের মূল উইলে উল্লিখিত পাঁচটি পুরস্কারের অন্তর্ভুক্ত ছিল না। সুইডেনের কেন্দ্রীয় ব্যাংক সেভেরিজেস রিক্সব্যাংক ১৯৬৮ সালে পুরস্কারটি প্রতিষ্ঠা করে এবং ১৯৬৯ সালে প্রথমবার এটি দেওয়া হয়।
মূল নোবেল পুরস্কারগুলোর মতো অর্থনীতির পুরস্কারও মর্যাদাপূর্ণ আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি হিসেবে বিবেচিত হয়। তবে এর অর্থায়ন ও প্রতিষ্ঠার ইতিহাস অন্য নোবেল পুরস্কারগুলোর থেকে আলাদা।
২০২৫ সালে অর্থনীতিতে নোবেল পুরস্কার পেয়েছিলেন জোয়েল মোকির, ফিলিপ আগিয়োঁ ও পিটার হাওয়িট। প্রযুক্তিগত উদ্ভাবন, অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি এবং ‘ক্রিয়েটিভ ডেস্ট্রাকশন’ তত্ত্বে অবদানের জন্য তাঁদের স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছিল।
নোবেল পুরস্কারের প্রচলিত রীতি অনুযায়ী, রবার্ট ই. হল ও মাইকেল উডফোর্ড আগামী ১০ ডিসেম্বর সুইডেনের স্টকহোমে আয়োজিত অনুষ্ঠানে পদক, সনদ ও পুরস্কারের অর্থ গ্রহণ করবেন। দিনটি আলফ্রেড নোবেলের মৃত্যুবার্ষিকী।
অর্থনৈতিক অস্থিরতা, মূল্যস্ফীতি ও বৈশ্বিক সংকট মোকাবিলায় কার্যকর নীতিমালা তৈরির প্রয়োজনীয়তা যখন বিশ্বজুড়ে আলোচিত, তখন হল ও উডফোর্ডের গবেষণার এ স্বীকৃতি অর্থনৈতিক নীতিনির্ধারণে তাত্ত্বিক গবেষণার গুরুত্ব আবারও সামনে নিয়ে এসেছে।
আরও পড়ুন:







