ভূমধ্যসাগরের তলদেশে মিলেছে প্রায় ৪ হাজার ৭০০ বছর আগের একটি জাহাজডুবির নিদর্শন। প্রত্নতাত্ত্বিকদের দাবি, এটি এখন পর্যন্ত শনাক্ত হওয়া বিশ্বের সবচেয়ে প্রাচীন জাহাজডুবির নিদর্শন হতে পারে। তুরস্কের দক্ষিণাঞ্চলের আনতালিয়া প্রদেশে কেকোভা দ্বীপের কাছে সমুদ্রের প্রায় ৩০ মিটার গভীরে পাওয়া গেছে প্রাচীন এই বাণিজ্যিক জাহাজের বহন করা বিভিন্ন সামগ্রী।
বুধবার (১৪ অক্টোবর) প্রকাশিত বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, প্রাথমিকভাবে নিদর্শনগুলো প্রায় ৪ হাজার ৪০০ থেকে ৪ হাজার ৭০০ বছরের পুরোনো বলে ধারণা করা হচ্ছে। এগুলোর সময়কাল প্রাচীন মিসরে গিজার মহাপিরামিড নির্মাণের সময়ের কাছাকাছি। আবিষ্কারটি প্রাচীন ভূমধ্যসাগরীয় অঞ্চলের নৌ-বাণিজ্য ও সভ্যতাগুলোর পারস্পরিক যোগাযোগ সম্পর্কে নতুন তথ্য দিতে পারে।
প্রত্নতাত্ত্বিকেরা সমুদ্রের তলদেশে ছড়িয়ে থাকা ৩০টিরও বেশি মাটির তৈরি বড় সংরক্ষণপাত্র এবং তিনটি পাথরের নোঙরের সন্ধান পেয়েছেন। প্রাচীনকালে এ ধরনের পাত্রে বিভিন্ন পণ্য সংরক্ষণ ও পরিবহন করা হতো।
তবে দীর্ঘ সময় পানির নিচে থাকার কারণে জাহাজটির কাঠের কাঠামো আর টিকে নেই। ফলে জাহাজটির বয়স নির্ধারণে এর সঙ্গে পাওয়া মাটির পাত্রের আকৃতি, নকশা ও অলংকরণ বিশ্লেষণ করা হয়েছে। এসব বৈশিষ্ট্যের সঙ্গে প্রাচীন ব্রোঞ্জ যুগের নিদর্শনের মিল পেয়েছেন গবেষকেরা।
গবেষকদের ধারণা, জাহাজটি পূর্ব ভূমধ্যসাগরীয় অঞ্চলের কোনো বন্দর থেকে পণ্য নিয়ে বাণিজ্যিক যাত্রায় বের হয়েছিল। মাটির পাত্রগুলোর সঙ্গে লেভান্ত অঞ্চলের প্রাচীন নিদর্শনের মিল থাকায় বর্তমান সিরিয়া, লেবানন, ইসরায়েল ও ফিলিস্তিন-সংলগ্ন এলাকার সঙ্গে এর সম্ভাব্য বাণিজ্যিক সম্পর্ক নিয়ে আলোচনা করছেন বিশেষজ্ঞরা।
জাহাজটিতে ঠিক কী ধরনের পণ্য ছিল, তা এখনো পুরোপুরি নিশ্চিত নয়। তবে গবেষকদের ধারণা, এসব পাত্রে জলপাইয়ের তেল, মদ কিংবা অন্যান্য বাণিজ্যিক পণ্য বহন করা হয়ে থাকতে পারে। পাত্রগুলোর অবশিষ্টাংশ ও অন্যান্য নিদর্শন বিশ্লেষণ করে এ বিষয়ে আরও তথ্য পাওয়ার আশা করছেন তাঁরা।
প্রত্নতাত্ত্বিকদের একটি সম্ভাবনা হলো, জাহাজটি প্রাচীন ভূমধ্যসাগরীয় বাণিজ্যপথ ধরে ট্রয় কিংবা ক্রিট দ্বীপের দিকে যাচ্ছিল। তবে এর নির্দিষ্ট গন্তব্য, যাত্রাপথ এবং কী কারণে জাহাজটি ডুবে গিয়েছিল, সে বিষয়ে নিশ্চিত প্রমাণ এখনো পাওয়া যায়নি।
প্রাচীনকালে ভূমধ্যসাগর ছিল বিভিন্ন সভ্যতার মধ্যে পণ্য, প্রযুক্তি ও সাংস্কৃতিক ধারণা বিনিময়ের গুরুত্বপূর্ণ পথ। এই জাহাজডুবির নিদর্শন সেই সময়ের নৌযাত্রা এবং দূরবর্তী অঞ্চলের মধ্যে বাণিজ্যিক যোগাযোগের বিস্তার সম্পর্কে গবেষকদের নতুন করে অনুসন্ধানের সুযোগ তৈরি করেছে।
এত দিন গ্রিসের ডোকোস দ্বীপের কাছে পাওয়া একটি প্রাচীন জাহাজডুবির নিদর্শনকে বিশ্বের সবচেয়ে পুরোনো জাহাজডুবির নিদর্শনগুলোর মধ্যে অন্যতম হিসেবে বিবেচনা করা হতো। সেটির সময়কাল আনুমানিক খ্রিষ্টপূর্ব ২২০০ অব্দের কাছাকাছি।
অন্যদিকে, তুরস্কের কেকোভা দ্বীপের কাছে পাওয়া নতুন নিদর্শনগুলো খ্রিষ্টপূর্ব আনুমানিক ২৬০০ থেকে ২৪০০ অব্দের বলে ধারণা করা হচ্ছে। এই সময়কাল নিশ্চিত হলে নতুন আবিষ্কারটি আগের রেকর্ডকে ছাড়িয়ে যেতে পারে।
তবে প্রত্নতাত্ত্বিক রেকর্ডে ‘বিশ্বের সবচেয়ে পুরোনো’ হিসেবে কোনো নিদর্শনের অবস্থান নির্ভর করে বয়স নির্ধারণ, প্রাপ্ত প্রমাণ এবং আবিষ্কারের শ্রেণিবিন্যাসের ওপর। তাই এ দাবিকে চূড়ান্তভাবে প্রতিষ্ঠিত করতে আরও গবেষণা গুরুত্বপূর্ণ।
প্রাচীন জাহাজের কাঠের অংশ সাধারণত দীর্ঘ সময় পানির নিচে থাকলে নষ্ট হয়ে যায়। ফলে জাহাজের মালামাল, মাটির পাত্র, নোঙর এবং সমুদ্রের তলদেশে ছড়িয়ে থাকা অন্যান্য উপাদান থেকেই অনেক সময় জাহাজটির ইতিহাস পুনর্গঠন করতে হয়।
কেকোভার কাছে পাওয়া নিদর্শনগুলো বিশ্লেষণ করে প্রাচীন মানুষের নৌযাত্রার সক্ষমতা, পণ্য পরিবহনের পদ্ধতি এবং বিভিন্ন অঞ্চলের মধ্যে বাণিজ্যিক সম্পর্ক সম্পর্কে আরও ধারণা পাওয়া যেতে পারে। গবেষণার পরিধি বাড়লে প্রায় পাঁচ হাজার বছর আগের মানুষের সমুদ্রনির্ভর জীবন ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের নতুন দিকও উন্মোচিত হতে পারে।
আরও পড়ুন:







