একসঙ্গে পাঁচটি পূর্ণকালীন সরকারি চাকরি করে বেতন নেওয়ার অভিযোগে যুক্তরাজ্যের এক সরকারি কর্মচারীর বিরুদ্ধে আদালতে বিচার শুরু হয়েছে। কাশিম চৌধুরী (৫৫) নামের ওই ব্যক্তি দীর্ঘদিন ধরে একাধিক সরকারি দপ্তর ও প্রতিষ্ঠানে চাকরি করলেও বিষয়টি গোপন রেখেছিলেন বলে অভিযোগ করেছেন কৌঁসুলিরা। দূর থেকে কাজ করার সুযোগ কাজে লাগিয়ে একাধিক প্রতিষ্ঠানের বেতন নেওয়ার অভিযোগে তাঁর বিরুদ্ধে প্রতারণার নয়টি অভিযোগ আনা হয়েছে।
মঙ্গলবার (১৩ অক্টোবর) লন্ডনের সাউথওয়ার্ক ক্রাউন কোর্টে তাঁর বিচারকাজ চলাকালে এসব তথ্য উঠে আসে। ২০২০ থেকে ২০২৩ সালের মধ্যে একাধিক প্রতিষ্ঠানে তাঁর চাকরির সময় পরস্পরের সঙ্গে মিলে যায়। এতে একই সময়ে একাধিক পূর্ণকালীন পদে দায়িত্ব পালন ও বেতন নেওয়ার অভিযোগ ওঠে।
তবে কাশিম চৌধুরী তাঁর বিরুদ্ধে আনা প্রতারণার অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। ফলে আদালতের চূড়ান্ত রায় না আসা পর্যন্ত তাঁকে দোষী সাব্যস্ত বলা যাবে না।
আদালতে উপস্থাপিত অভিযোগ অনুযায়ী, ২০২০ সালের ফেব্রুয়ারিতে পূর্ব লন্ডনের টাওয়ার হ্যামলেটস কাউন্সিলে জনস্বাস্থ্য কর্মসূচি ব্যবস্থাপক হিসেবে চাকরি শুরু করেন কাশিম চৌধুরী। ওই পদে তাঁর বার্ষিক বেতন ছিল প্রায় ৫০ হাজার পাউন্ড।
২০২১ সালের এপ্রিলে তিনি পরিবেশ, খাদ্য ও গ্রামীণ বিষয়ক দপ্তর—ডেফরা (Defra)-তে আরেকটি পূর্ণকালীন চাকরি নেন। কৌঁসুলিদের দাবি, এক বছরেরও বেশি সময় তিনি একই সঙ্গে দুটি চাকরিতে বহাল ছিলেন।
পরবর্তী সময়ে তিনি এনএইচএস ট্রাস্টসহ বিভিন্ন সরকারি দপ্তর ও জনসেবামূলক প্রতিষ্ঠানে কাজ করেন। এসব প্রতিষ্ঠানের মধ্যে স্বাস্থ্য ও সামাজিক পরিচর্যা বিভাগ, যুক্তরাজ্যের স্বাস্থ্য নিরাপত্তা সংস্থা (ইউকেএইচএসএ), ব্যবসা ও বাণিজ্য বিভাগ, ফুড স্ট্যান্ডার্ডস এজেন্সি এবং স্বরাষ্ট্র দপ্তরের নামও এসেছে।
কৌঁসুলিদের ভাষ্য অনুযায়ী, একপর্যায়ে তাঁর পাঁচটি পূর্ণকালীন চাকরি একই সময়ে চলছিল। এসব চাকরির সম্মিলিত কর্মঘণ্টা সপ্তাহে ১৮৩ ঘণ্টায় পৌঁছেছিল, যা একটি সপ্তাহের মোট ১৬৮ ঘণ্টার চেয়েও বেশি।
আদালতে কৌঁসুলিরা অভিযোগ করেন, অন্য চাকরিগুলোর বিষয় গোপন রাখতে কাশিম চৌধুরী বিভিন্ন কৌশল অবলম্বন করেছিলেন। এর মধ্যে অসুস্থতার কথা বলে ছুটি নেওয়া এবং দূর থেকে কাজ করার সুযোগ কাজে লাগানোর অভিযোগ রয়েছে।
একটি অনলাইন বৈঠকে তাঁর ব্যবস্থাপক তাঁর মুখে সাদা মেকআপের মতো পদার্থ দেখতে পান বলে আদালতে জানানো হয়। কৌঁসুলিদের দাবি, অসুস্থ দেখানোর জন্য তিনি এমনটি করেছিলেন। এ ছাড়া অনলাইন বৈঠকে ক্যামেরা বন্ধ রাখা, কম্পিউটারে সমস্যার কথা জানানো এবং নির্ধারিত বৈঠকে অংশ না নেওয়ার ঘটনাও অভিযোগের অংশ হিসেবে তুলে ধরা হয়।
কৌঁসুলিদের আরও অভিযোগ, চাকরির আবেদনপত্রে আগের চাকরির তথ্য গোপন করা হয়েছিল। একাধিক প্রতিষ্ঠানে চাকরি করার বিষয়টি সংশ্লিষ্ট নিয়োগকর্তাদের কাছে প্রকাশ না করেই তিনি বেতন গ্রহণ করতেন বলে দাবি করা হয়েছে।
সরকারি চাকরির তথ্য যাচাইয়ের একটি প্রক্রিয়ায় একাধিক প্রতিষ্ঠানে তাঁর চাকরির তথ্যের অসংগতি ধরা পড়ে বলে প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে। এরপর বিষয়টি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের নজরে আসে।
২০২৩ সালের জুলাই মাসে নিজ বাড়ি থেকে তাঁকে গ্রেপ্তার করা হয় বলে আদালতে উপস্থাপিত তথ্যে উল্লেখ রয়েছে। তদন্তে তাঁর একাধিক চাকরি এবং সেসব থেকে পাওয়া বেতনের তথ্য খতিয়ে দেখা হয়।
কৌঁসুলিদের হিসাব অনুযায়ী, একাধিক চাকরির মাধ্যমে কাশিম চৌধুরী মোট ২ লাখ ৮৪ হাজার ৬১৩ পাউন্ড বেতন পেয়েছিলেন বলে অভিযোগ রয়েছে। ২০২৩ সালের এপ্রিল মাসে এক মাসেই তাঁর হাতে পাওয়া বেতনের পরিমাণ ১১ হাজার পাউন্ড ছাড়িয়ে গিয়েছিল বলে আদালতে জানানো হয়।
তবে এই অর্থের পুরোটা অবৈধভাবে অর্জিত হয়েছিল কি না, তা আদালতে প্রমাণের বিষয়। অভিযোগের সত্যতা ও তাঁর দায় নির্ধারণের জন্য বিচারপ্রক্রিয়া চলছে।
কাশিম চৌধুরীর বিরুদ্ধে মোট নয়টি প্রতারণার অভিযোগ আনা হয়েছে। তবে তিনি অসৎ উদ্দেশ্যে কাজ করেছেন কিংবা প্রতারণার মাধ্যমে অর্থ উপার্জন করেছেন—এমন অভিযোগ অস্বীকার করেছেন।
আদালতে কৌঁসুলিরা তাঁর চাকরির সময়সূচি, নিয়োগসংক্রান্ত তথ্য এবং একাধিক প্রতিষ্ঠানে একই সময়ে কাজ করার বিষয়গুলো তুলে ধরেছেন। অন্যদিকে, অভিযোগ অস্বীকার করায় মামলার চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত এখনো আদালতের ওপর নির্ভর করছে।
একই সময়ে একাধিক সরকারি চাকরি করার এই ঘটনা যুক্তরাজ্যের সরকারি নিয়োগব্যবস্থা, কর্মীদের তথ্য যাচাই এবং দূর থেকে কাজের সুযোগের তদারকি নিয়ে নতুন করে আলোচনা তৈরি করেছে।
আরও পড়ুন:







