জীবনের ৪২ বছর পার করে অবশেষে বই পড়তে ও লিখতে শেখেন যুক্তরাজ্যের এক লরিচালক। দীর্ঘদিন ধরে পড়তে না পারার সীমাবদ্ধতা আড়াল করে চললেও শেষ পর্যন্ত নিজের প্রচেষ্টা ও সহযোগিতার মাধ্যমে সেই বাধা অতিক্রম করেছেন পিটার নামের ওই ব্যক্তি। তাঁর জীবনের এই পরিবর্তন এখন অন্য প্রাপ্তবয়স্কদের জন্যও অনুপ্রেরণার গল্প হয়ে উঠেছে।
যুক্তরাজ্যের সংবাদমাধ্যম দ্য গার্ডিয়ান-এর ১৪ অক্টোবর প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে পিটারের এই ব্যতিক্রমী জীবনসংগ্রামের কথা তুলে ধরা হয়েছে। প্রতিবেদনে বলা হয়, শৈশব থেকেই পড়াশোনায় নানা প্রতিবন্ধকতার মুখোমুখি হয়েছিলেন তিনি। জন্ম থেকেই তাঁর শ্রবণশক্তি আংশিক কম ছিল। শ্রেণিকক্ষের কোলাহল ও শিক্ষার পরিবেশের সঙ্গে মানিয়ে নিতে না পারায় পড়াশোনায় পিছিয়ে পড়েন। একপর্যায়ে কোনো আনুষ্ঠানিক শিক্ষাগত যোগ্যতা ছাড়াই স্কুল ছাড়তে হয় তাঁকে।
শৈশবে পড়তে শেখার ক্ষেত্রে ব্যর্থতার প্রভাব পিটারের জীবনে দীর্ঘদিন ধরে ছিল। সাধারণ লেখা পড়তে না পারলেও তিনি বিভিন্ন কৌশলে দৈনন্দিন জীবন পরিচালনা করতেন। স্মৃতিশক্তির ওপর নির্ভর করে রাস্তা চিনতেন, প্রয়োজনীয় তথ্য মনে রাখতেন এবং কাজের দায়িত্ব সামলাতেন।
মাত্র ২২ বছর বয়সে লরিচালক হিসেবে কর্মজীবন শুরু করেন তিনি। দীর্ঘ সময় ধরে এই পেশায় কাজ করলেও পড়তে না পারার বিষয়টি ছিল তাঁর জীবনের একটি গোপন সীমাবদ্ধতা। প্রয়োজনীয় অনেক কাজে অন্যের সহযোগিতা নিতে হতো, আর নিজের অসুবিধার কথা প্রকাশ না করার চেষ্টাও করতেন তিনি।
পিটারের জীবনে বড় পরিবর্তনের সূচনা হয় কোভিড-১৯ মহামারির সময়। লকডাউনের কারণে স্বাভাবিক জীবনযাত্রা ব্যাহত হলে সংসার ও পরিবারের দায়িত্ব সামলানো তাঁর জন্য আরও কঠিন হয়ে ওঠে।
বিশেষ করে পরিবারের জন্য বাজার করতে গিয়ে সমস্যায় পড়েন তিনি। তাঁর পরিবারের সদস্যদের খাবারে অ্যালার্জির বিষয়টি বিবেচনায় রেখে দুধ ও অন্যান্য পণ্যের গায়ে লেখা উপাদান পড়া জরুরি ছিল। কিন্তু লেখা পড়তে না পারায় ভুল পণ্য কিনে ফেলার আশঙ্কা তাঁকে উদ্বিগ্ন করে তোলে।
এই ঘটনা তাঁকে উপলব্ধি করতে সাহায্য করে যে, এত দিন নানা উপায়ে সীমাবদ্ধতা সামলে চললেও এবার তা কাটিয়ে ওঠার জন্য বাস্তব পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন। শেষ পর্যন্ত নিজের সমস্যার কথা স্ত্রীকে জানান। স্ত্রীর উৎসাহেই আবার পড়তে শেখার চেষ্টা শুরু করেন তিনি।
পিটার যোগাযোগ করেন যুক্তরাজ্যের প্রাপ্তবয়স্কদের পড়তে শেখানোর দাতব্য সংস্থা রিড ইজির (Read Easy) সঙ্গে। সেখানে স্বেচ্ছাসেবী প্রশিক্ষক অ্যালিসনের সহায়তা পান তিনি। পাশাপাশি শ্যানন ট্রাস্টের (Shannon Trust) শেখার উপকরণও তাঁর কাজে আসে।
ধীরে ধীরে অক্ষর চেনা, শব্দ পড়া এবং বাক্য বোঝার দক্ষতা অর্জন করতে থাকেন পিটার। দীর্ঘদিনের ভয় ও সংকোচ কাটিয়ে নিয়মিত অনুশীলনের মাধ্যমে অবশেষে বই পড়তে সক্ষম হন তিনি।
তাঁর জীবনে বিশেষ জায়গা করে নেয় জে কে রাউলিংয়ের জনপ্রিয় বই হ্যারি পটার অ্যান্ড দ্য ফিলোসফার্স স্টোন। এটি ছিল তাঁর পড়া প্রথম বই। যে বই একসময় কেবল অন্যদের হাতে দেখেছেন, সেই বই নিজে পড়ে শেষ করতে পারা তাঁর কাছে ছিল এক অসাধারণ অর্জন।
পড়তে শেখার পর পিটারের আত্মবিশ্বাস ও দৈনন্দিন জীবনযাপনে ইতিবাচক পরিবর্তন এসেছে। আগে যেসব কাজের জন্য অন্যের ওপর নির্ভর করতে হতো, এখন সেগুলো নিজে করার সক্ষমতা বাড়ছে তাঁর।
নিজের অভিজ্ঞতা অন্যদের সঙ্গে ভাগ করে নিতে বর্তমানে তিনি রিড ইজির একজন অ্যাম্বাসেডর হিসেবেও কাজ করছেন। যাঁরা প্রাপ্তবয়স্ক বয়সে এসেও পড়তে পারেন না, তাঁদের সাহায্য চাইতে এবং নতুন করে শেখার পথে এগিয়ে আসতে উৎসাহিত করছেন তিনি।
এমনকি ইংরেজি বিষয়ে জিসিএসই (GCSE) যোগ্যতা অর্জনের পরিকল্পনাও রয়েছে তাঁর। ভবিষ্যতে অন্যদের সহায়তা করার কাজে যুক্ত হওয়ার আগ্রহও প্রকাশ করেছেন পিটার।
পিটারের গল্প মনে করিয়ে দেয়, শৈশবে শিক্ষার সুযোগ বা প্রয়োজনীয় সহায়তা না পেলে একজন মানুষকে সারা জীবন সেই সীমাবদ্ধতার মধ্যে থাকতে হবে—এমন নয়। সঠিক সহযোগিতা, অনুশীলন ও আত্মবিশ্বাস থাকলে প্রাপ্তবয়স্ক বয়সেও নতুন দক্ষতা অর্জন সম্ভব।
৪২ বছর বয়সে বই পড়তে শেখা পিটারের কাছে শুধু একটি নতুন দক্ষতা অর্জন নয়; বরং নিজের দীর্ঘদিনের ভয় কাটিয়ে ওঠা এবং জীবনের নতুন সম্ভাবনার দরজা খুলে দেওয়ার গল্প।
আরও পড়ুন:







