News Ticker
221.png

ইয়েমেনের প্রেসিডেন্ট প্রাসাদে হামলা, বাড়ছে পূর্ণাঙ্গ গৃহযুদ্ধের শঙ্কা

অনলাইন ডেস্ক

প্রকাশিত: ১৫ অক্টোবর, ২০২৬ ২৩:১১

শেয়ার

শেয়ার

ইয়েমেনের প্রেসিডেন্ট প্রাসাদে হামলা, বাড়ছে পূর্ণাঙ্গ গৃহযুদ্ধের শঙ্কা
ছবি: সংগৃহীত

ইয়েমেনের দক্ষিণাঞ্চলীয় বন্দরনগরী এডেনে আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত সরকারের ব্যবহৃত প্রেসিডেন্ট প্রাসাদ কমপ্লেক্সে ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালিয়েছে হুতি বিদ্রোহীরা। বৃহস্পতিবার (১৫ অক্টোবর) এ হামলায় অন্তত দুজন নিরাপত্তারক্ষী নিহত হয়েছেন। আহত হয়েছেন আরও কয়েকজন। এ ঘটনায় দেশটিতে নতুন করে পূর্ণাঙ্গ গৃহযুদ্ধ ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা আরও জোরালো হয়েছে।

এডেনের আল-মাশিক প্রেসিডেন্ট প্রাসাদ এলাকায় একাধিক বিস্ফোরণের শব্দ শোনা যায়। হামলার পর এলাকাজুড়ে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে এবং স্থানীয় বাসিন্দাদের অনেকে নিরাপদ আশ্রয়ের সন্ধানে বাড়িঘর ছেড়ে বেরিয়ে আসেন। হুতিরা হামলার দায় স্বীকার করেছে। তবে হামলার লক্ষ্যবস্তু ও ক্ষয়ক্ষতির বিষয়ে সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর বক্তব্য পুরোপুরি স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি।

হুতিরা প্রেসিডেন্ট প্রাসাদ কমপ্লেক্স লক্ষ্য করে একাধিক ক্ষেপণাস্ত্র ছুড়েছে। দেশটির তথ্যমন্ত্রী মুয়াম্মার আল-ইরিয়ানি জানিয়েছেন, হামলার সময় প্রধানমন্ত্রী শায়া আল-জিন্দানি ও মন্ত্রিসভার সদস্যরা নিরাপদ ছিলেন।

হুতি-নিয়ন্ত্রিত সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, কমপ্লেক্সের ভেতরে সৌদি কর্মকর্তাদের পরিচালিত একটি সামরিক অপারেশন সেন্টার এবং অস্ত্রের গুদাম লক্ষ্য করে হামলা চালানো হয়েছে। তবে এসব দাবির সত্যতা স্বাধীনভাবে নিশ্চিত করতে পারেনি রয়টার্স।

হামলার পর নিরাপত্তা পরিস্থিতি আরও কঠোর করা হয়েছে বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। ঘটনাটি ইয়েমেনের সরকার-নিয়ন্ত্রিত গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় নিরাপত্তা নিয়ে নতুন উদ্বেগ তৈরি করেছে।

ইয়েমেনের রাজধানী সানা ২০১৪ সালে হুতি বিদ্রোহীদের নিয়ন্ত্রণে চলে যাওয়ার পর এডেন আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত সরকারের অন্যতম প্রধান কেন্দ্র হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। আল-মাশিক প্রাসাদ দেশটির সরকারি কার্যক্রম পরিচালনার গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনাগুলোর একটি।

এ কারণে প্রাসাদ কমপ্লেক্সে হামলাকে শুধু একটি সামরিক স্থাপনায় আঘাত হিসেবে দেখা হচ্ছে না; এটি সরকারের নিরাপত্তাব্যবস্থা এবং রাষ্ট্রীয় কর্তৃত্বের ওপরও বড় ধরনের চাপ তৈরি করতে পারে।

বিশ্লেষকদের মতে, সরকারের গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা লক্ষ্য করে হামলা অব্যাহত থাকলে সংঘাতের পরিধি আরও বাড়তে পারে। তবে এই একটি হামলার ভিত্তিতে দেশজুড়ে পূর্ণাঙ্গ গৃহযুদ্ধের পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে বলে নিশ্চিত সিদ্ধান্তে পৌঁছানো এখনই সম্ভব নয়।

ইয়েমেনের সাম্প্রতিক উত্তেজনার পেছনে সৌদি আরবের সামরিক ভূমিকা এবং হুতি বিদ্রোহীদের পাল্টা হামলা গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে উঠেছে। সৌদি নেতৃত্বাধীন জোটের দাবি, হুতিরা সম্প্রতি সৌদি আরবের বিমানবন্দর, বন্দর ও তেল অবকাঠামো লক্ষ্য করে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালিয়েছে।

সৌদি নেতৃত্বাধীন জোট হুতিদের বিরুদ্ধে গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনায় একাধিক হামলার অভিযোগ এনেছে। জোটের মুখপাত্র তুর্কি আল-মালিকি দাবি করেছেন, সৌদি আরবের রিয়াদ ও অন্যান্য এলাকায় হামলার ঘটনায় হতাহত হয়েছেন বহু মানুষ। জোট ইয়েমেনে হুতিদের অস্ত্রের গুদাম ও ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণকেন্দ্র লক্ষ্য করেও অভিযান চালানোর কথা জানিয়েছে।

অন্যদিকে, হুতিদের বক্তব্য অনুযায়ী, এডেনের হামলার লক্ষ্য ছিল সৌদি সামরিক কার্যক্রমের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট একটি স্থাপনা। ফলে ইয়েমেনের অভ্যন্তরীণ সংঘাতের সঙ্গে সৌদি আরবের সামরিক সম্পৃক্ততা আরও সরাসরি সংঘর্ষের রূপ নিচ্ছে।

ইয়েমেনে দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক বিভাজন, বিভিন্ন সশস্ত্র গোষ্ঠীর নিয়ন্ত্রণ এবং বিদেশি শক্তির সম্পৃক্ততা সংঘাতকে জটিল করে তুলেছে। ২০১৪ সালে হুতিদের সানা দখলের পর সংঘাত ব্যাপক আকার নেয়। পরের বছর সৌদি নেতৃত্বাধীন জোট ইয়েমেনের আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত সরকারকে সমর্থন দিতে সামরিক অভিযান শুরু করে।

২০২২ সালে জাতিসংঘের মধ্যস্থতায় যুদ্ধবিরতি কার্যকর হওয়ার পর বড় ধরনের লড়াই অনেকটা কমে এসেছিল। তবে স্থায়ী রাজনৈতিক সমাধানের প্রচেষ্টা সফল হয়নি। সাম্প্রতিক সময়ে সৌদি আরব ও হুতিদের মধ্যে পাল্টাপাল্টি হামলা এবং ইয়েমেনের সরকারি বাহিনীর সামরিক অভিযান নতুন করে সংঘাত বৃদ্ধির আশঙ্কা তৈরি করেছে।

প্রেসিডেন্ট প্রাসাদে হামলা, গুরুত্বপূর্ণ সামরিক স্থাপনায় পাল্টা অভিযান এবং আঞ্চলিক শক্তিগুলোর সম্পৃক্ততা অব্যাহত থাকলে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হতে পারে। একই সঙ্গে দেশটির বেসামরিক জনগণের নিরাপত্তা, খাদ্য সরবরাহ ও চিকিৎসাসেবা নিয়ে উদ্বেগ বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে।

দীর্ঘদিনের সংঘাতের কারণে ইয়েমেন ইতোমধ্যে গুরুতর মানবিক সংকটে রয়েছে। নতুন করে যুদ্ধ তীব্র হলে বাস্তুচ্যুত মানুষের সংখ্যা বাড়তে পারে এবং খাদ্য, বিশুদ্ধ পানি ও চিকিৎসাসেবার সংকট আরও গভীর হতে পারে।

বিশেষ করে ঘনবসতিপূর্ণ এলাকায় ক্ষেপণাস্ত্র হামলা ও পাল্টা সামরিক অভিযান বেসামরিক মানুষের জীবনকে ঝুঁকির মুখে ফেলতে পারে। তাই সংঘাতের বিস্তার ঠেকাতে কূটনৈতিক উদ্যোগ, বেসামরিক স্থাপনার সুরক্ষা এবং মানবিক সহায়তা অব্যাহত রাখা জরুরি।

সব মিলিয়ে, এডেনের প্রেসিডেন্ট প্রাসাদ কমপ্লেক্সে হামলা ইয়েমেনের চলমান সংঘাতে নতুন উত্তেজনা যোগ করেছে। তবে পরিস্থিতি শেষ পর্যন্ত পূর্ণাঙ্গ গৃহযুদ্ধে রূপ নেবে কি না, তা নির্ভর করবে পরবর্তী সামরিক পদক্ষেপ, আঞ্চলিক শক্তিগুলোর ভূমিকা এবং রাজনৈতিক সমঝোতার সম্ভাবনার ওপর।

ChannelNRB Footer