ছাত্র-জনতার টানা বিক্ষোভ ও সংঘর্ষে উত্তাল হয়ে উঠেছে ইউরোপের বলকান অঞ্চলের দেশ আলবেনিয়া। রাজধানী তিরানায় হাজারো বিক্ষোভকারী প্রধানমন্ত্রী এদি রামার পদত্যাগের দাবিতে রাজপথে নেমেছেন। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পুলিশ কাঁদানে গ্যাস ও জলকামান ব্যবহার করছে। কয়েক দিন ধরে চলা বিক্ষোভে সরকারি ভবন, ব্যাংক ও বিভিন্ন ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটেছে।
তবে ব্যাপক বিক্ষোভের মধ্যেও পদত্যাগ করতে রাজি নন প্রধানমন্ত্রী এদি রামা। বৃহস্পতিবার (১৫ অক্টোবর) তিনি জানিয়েছেন, সরকারের পরিবর্তন গণতান্ত্রিক নির্বাচনের মাধ্যমেই হওয়া উচিত। একই সঙ্গে শিক্ষার্থীদের শিক্ষা ব্যয় ও অন্যান্য যৌক্তিক উদ্বেগ নিয়ে আলোচনার আগ্রহ প্রকাশ করেছেন তিনি।
রয়টার্স প্রতিবেদন অনুযায়ী, তিন দিন ধরে চলা এই আন্দোলন রামার নেতৃত্বাধীন সরকারের জন্য বড় ধরনের রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
আন্দোলনকারীদের প্রধান দাবির মধ্যে রয়েছে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার পরিবেশ উন্নত করা, টিউশন ফি কমানো, শিক্ষার্থীদের আর্থিক সহায়তা বাড়ানো এবং স্নাতকদের কর্মসংস্থানের সুযোগ নিশ্চিত করা।
শিক্ষার্থীদের অভিযোগ, উচ্চশিক্ষার ব্যয় ক্রমেই বাড়ছে, অথচ বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে প্রয়োজনীয় সুযোগ-সুবিধার ঘাটতি রয়েছে। পড়াশোনা শেষ করার পর উপযুক্ত চাকরি পাওয়ার অনিশ্চয়তাও তরুণদের মধ্যে হতাশা বাড়াচ্ছে।
এর পাশাপাশি সরকারের বিরুদ্ধে দুর্নীতি, স্বজনপ্রীতি ও ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগ তুলে বিক্ষোভকারীরা প্রধানমন্ত্রীর পদত্যাগ দাবি করছেন। সরকারের পক্ষ থেকে দুর্নীতির অভিযোগ অস্বীকার করা হয়েছে।
আন্দোলনটি প্রথমে শিক্ষার্থীদের শিক্ষা-সংক্রান্ত দাবিকে কেন্দ্র করে শুরু হলেও পরে তা বৃহত্তর সরকারবিরোধী আন্দোলনে রূপ নিয়েছে।
বুধবার তিরানায় বিক্ষোভকারীদের সঙ্গে পুলিশের ব্যাপক সংঘর্ষ হয়। এ সময় শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের ভবনে আগুন দেওয়া হয় এবং আশপাশের কয়েকটি ব্যাংক ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে ভাঙচুর চালানো হয়। কোথাও কোথাও বিক্ষোভকারীরা পুলিশের দিকে পাথর ছোড়েন এবং রাস্তায় ব্যারিকেড তৈরি করেন।
পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পুলিশ কাঁদানে গ্যাস ও জলকামান ব্যবহার করে। সংঘর্ষে বহু পুলিশ সদস্য ও বিক্ষোভকারী আহত হন। বিভিন্ন প্রতিবেদনে আহত ও গ্রেপ্তার ব্যক্তির সংখ্যা নিয়ে কিছু পার্থক্য রয়েছে।
বৃহস্পতিবারও রাজধানীতে বিক্ষোভ অব্যাহত থাকে। এদিন উচ্চমাধ্যমিক পর্যায়ের শিক্ষার্থীরাও আন্দোলনে যোগ দেন। তিরানার বিভিন্ন সড়কে মিছিল ও পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষের ঘটনায় স্বাভাবিক জীবনযাত্রা ব্যাহত হয়।
আন্দোলন রাজধানীর বাইরেও ছড়িয়ে পড়েছে। স্থানীয় সংবাদমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী, দেশটির এলবাসান, শকোদর, দুরেসসহ বিভিন্ন শহরেও বিক্ষোভের খবর পাওয়া গেছে।
বর্তমান আন্দোলনের পেছনে শিক্ষাব্যবস্থার সমস্যা ছাড়াও দক্ষিণ আলবেনিয়ার উপকূলীয় এলাকায় একটি বিলাসবহুল পর্যটনকেন্দ্র নির্মাণের পরিকল্পনা নিয়ে দীর্ঘদিনের অসন্তোষ রয়েছে।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের জামাতা জ্যারেড কুশনারের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট এই প্রকল্পটি নিয়ে স্থানীয় বাসিন্দা ও আন্দোলনকারীদের মধ্যে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। বিক্ষোভকারীদের অভিযোগ, প্রকল্পটি ঘিরে জমির মালিকানা, পরিবেশগত প্রভাব, স্বচ্ছতা এবং সম্ভাব্য দুর্নীতি নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন রয়েছে।
প্রকল্পটির বিরুদ্ধে কয়েক মাস ধরে শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদ চলছিল। পরে শিক্ষার্থীদের শিক্ষা-সংক্রান্ত দাবির সঙ্গে এই অসন্তোষ যুক্ত হয়ে আন্দোলনকে আরও বিস্তৃত করে।
তবে প্রকল্পটির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের সবকিছু প্রমাণিত নয়। এ বিষয়ে আইনি বিরোধ ও তদন্ত-সংক্রান্ত তথ্য আলাদাভাবে যাচাই করা প্রয়োজন।
বিক্ষোভকারীদের প্রধান দাবি প্রধানমন্ত্রীর পদত্যাগ হলেও এদি রামা তা প্রত্যাখ্যান করেছেন। তাঁর বক্তব্য, গত বছর নির্বাচনে জনগণের কাছ থেকে পাওয়া ম্যান্ডেট অনুযায়ী সরকার কাজ চালিয়ে যাবে।
রামা জানিয়েছেন, শিক্ষার ব্যয় বৃদ্ধি নিয়ে শিক্ষার্থীদের সঙ্গে আলোচনা করতে তিনি প্রস্তুত। তবে সরকারি স্থাপনায় হামলা, সরকারি ও ব্যক্তিমালিকানাধীন সম্পত্তি ধ্বংস এবং জননিরাপত্তা বিপন্ন করার ঘটনাকে তিনি সমর্থন করেন না।
২০২৫ সালের নির্বাচনে রামার সোশ্যালিস্ট পার্টি টানা চতুর্থবারের মতো জয় পায়। ফলে পরবর্তী নির্ধারিত সংসদীয় নির্বাচন ২০২৯ সালে হওয়ার কথা। বিরোধী দলগুলো অবশ্য বর্তমান পরিস্থিতিতে অন্তর্বর্তী সরকার গঠন এবং আগাম নির্বাচনের দাবি তুলেছে।
আলবেনিয়া দীর্ঘদিন ধরে ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) সদস্যপদ পাওয়ার জন্য আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছে। সরকার ২০২৮ সালের মধ্যে সদস্যপদ অর্জনের লক্ষ্য সামনে রেখেছে।
কিন্তু দুর্নীতির অভিযোগ, বিচারব্যবস্থার জবাবদিহি, অর্থনৈতিক বৈষম্য এবং তরুণদের কর্মসংস্থানের সংকট দেশটির ইউরোপীয় একীকরণ প্রক্রিয়ায় গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
ইইউর আলবেনিয়া প্রতিনিধিদল সহিংসতা বন্ধ এবং পরিস্থিতি শান্ত করার আহ্বান জানিয়েছে। সংস্থাটি বিক্ষোভকারীদের সংযত থাকার পাশাপাশি কর্তৃপক্ষকে পরিস্থিতি মোকাবিলায় যথাযথ ও আনুপাতিক পদক্ষেপ নেওয়ার ওপর গুরুত্ব দিয়েছে।
আলবেনিয়ায় চলমান বিক্ষোভ সরকারের ওপর জনমতের চাপ বাড়িয়েছে। শিক্ষার্থীদের দাবির সঙ্গে দুর্নীতিবিরোধী আন্দোলন ও বিতর্কিত পর্যটন প্রকল্প নিয়ে অসন্তোষ যুক্ত হওয়ায় পরিস্থিতি জটিল হয়ে উঠেছে।
আরও পড়ুন:







