সুন্দরী প্রতিযোগিতার পরিবর্তে তরুণীদের মেধা, জ্ঞান ও বৈজ্ঞানিক দক্ষতাকে গুরুত্ব দিতে নতুন উদ্যোগ নিয়েছে পশ্চিম আফ্রিকার দেশ বুরকিনা ফাসো। দেশটিতে জাতীয় পর্যায়ে সুন্দরী প্রতিযোগিতা সাময়িকভাবে স্থগিত করার পর চালু করা হয়েছে ‘হাকিলি মুসো’ (HAKILI Mousso) নামের বিজ্ঞান প্রতিযোগিতা। এতে গণিত, পদার্থবিজ্ঞান ও রসায়নে নিজেদের দক্ষতা তুলে ধরার সুযোগ পেয়েছেন ৮৪ জন তরুণী।
বুরকিনা ফাসো সরকারের উদ্যোগে আয়োজিত এ প্রতিযোগিতার প্রথম আসরের পুরস্কার বিতরণী অনুষ্ঠিত হয় গত ১৯ সেপ্টেম্বর। দেশটির সরকারের ভাষ্য, তরুণীদের বিজ্ঞানচর্চায় উৎসাহিত করা এবং বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিনির্ভর পেশায় নারীদের অংশগ্রহণ বাড়ানোই এ উদ্যোগের মূল লক্ষ্য।
২০২৬ সালের জুনে বুরকিনা ফাসো সরকার দেশজুড়ে সুন্দরী প্রতিযোগিতা সাময়িকভাবে স্থগিতের ঘোষণা দেয়। কর্তৃপক্ষ জানায়, এসব প্রতিযোগিতার আয়োজন ও বিষয়বস্তু পর্যালোচনা করে নতুন নীতিমালা তৈরি করা হবে। এর উদ্দেশ্য দেশের সাংস্কৃতিক পরিচয়, সামাজিক মূল্যবোধ, ঐতিহ্য ও মানবিক মর্যাদার সঙ্গে প্রতিযোগিতাগুলোর সামঞ্জস্য নিশ্চিত করা।
এরপর তরুণীদের প্রতিভা তুলে ধরার বিকল্প মঞ্চ হিসেবে সামনে আসে ‘হাকিলি মুসো’। স্থানীয় ভাষায় নামটির অর্থ ‘নারীর বুদ্ধিমত্তা’।
এই প্রতিযোগিতায় বাহ্যিক সৌন্দর্যের পরিবর্তে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে শিক্ষাগত যোগ্যতা, বিশ্লেষণী ক্ষমতা ও বিজ্ঞানের কঠিন বিষয়গুলোতে দক্ষতার ওপর।
তবে সরকার সুন্দরী প্রতিযোগিতা চিরতরে নিষিদ্ধ করেছে—বিষয়টি এমন নয়। দেশটির সংস্কৃতিমন্ত্রী জানিয়েছেন, নতুন নীতিমালা অনুযায়ী সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য ও নারীর মর্যাদাকে গুরুত্ব দিয়ে এসব প্রতিযোগিতা নতুন আঙ্গিকে ফিরিয়ে আনার পরিকল্পনা রয়েছে।
প্রতিযোগিতার প্রথম আসরে অংশ নেওয়া ৮৪ জন তরুণী ২০২৬ সালে বিজ্ঞান বিভাগ থেকে উচ্চমাধ্যমিক সমমানের পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন। নির্ধারিত যোগ্যতা ও ফলাফলের ভিত্তিতে তাঁদের চূড়ান্ত প্রতিযোগিতার জন্য নির্বাচন করা হয়।
গণিত, পদার্থবিজ্ঞান ও রসায়ন—এই তিনটি বিষয়ে প্রতিযোগিতা অনুষ্ঠিত হয়। প্রতিটি বিষয়ে সেরা পাঁচজনকে পুরস্কৃত করা হয়।
বিজয়ীদের মধ্যে রসায়নে ইনেস মারি ফাবিওলাস নিকিয়েমা ২০ নম্বরের মধ্যে ১৮ দশমিক ৭৩ পেয়ে প্রথম স্থান অর্জন করেন। পদার্থবিজ্ঞানে আমিনাতা ত্রাওরে ১৫ নম্বর পেয়ে এবং গণিতে আদজারাতু বামা ১৪ দশমিক ২৫ নম্বর পেয়ে প্রথম হন।
তিন বিষয়ে প্রথম স্থান অর্জনকারী প্রত্যেককে ২০ লাখ পশ্চিম আফ্রিকান সিএফএ ফ্রাঁ, একটি মোটরসাইকেল ও একটি ল্যাপটপ দেওয়া হয়। অন্য কৃতী প্রতিযোগীরাও পেয়েছেন অর্থ পুরস্কার, কম্পিউটার, বৃত্তি ও অন্যান্য সহায়তা।
প্রতিযোগিতার বিজয়ীদের সঙ্গে গত ২১ সেপ্টেম্বর রাজধানী ওয়াগাদুগুর কুলুবা প্রাসাদে সাক্ষাৎ করেন দেশটির প্রেসিডেন্ট ইব্রাহিম ত্রাওরে।
এ সময় তরুণীদের বিজ্ঞানচর্চা অব্যাহত রাখা এবং দেশের উন্নয়নে নিজেদের জ্ঞান কাজে লাগানোর ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়। সরকারের মতে, বিজ্ঞান, প্রযুক্তি ও শিল্প খাতে দক্ষ জনশক্তি গড়ে তুলতে নারীদের অংশগ্রহণ বাড়ানো অত্যন্ত জরুরি।
প্রতিযোগিতার মাধ্যমে তরুণীরা নিজেদের সক্ষমতা সম্পর্কে আত্মবিশ্বাসী হবেন এবং ভবিষ্যতে গবেষণা, প্রযুক্তি ও প্রকৌশলসহ বিভিন্ন পেশায় এগিয়ে যেতে উৎসাহ পাবেন—এমন প্রত্যাশা জানিয়েছে কর্তৃপক্ষ।
বুরকিনা ফাসোর সরকারি তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫-২৬ শিক্ষাবর্ষে বিজ্ঞানভিত্তিক শিক্ষার বিভিন্ন ধারায় নারীদের অংশগ্রহণ ছিল ৩৬ দশমিক ৭ শতাংশ। অন্যদিকে, বিজ্ঞানবহির্ভূত শিক্ষার ধারায় তাঁদের অংশগ্রহণ ছিল ৫৯ দশমিক ৫ শতাংশ।
এই ব্যবধান দেশটিতে বিজ্ঞান শিক্ষায় নারীদের অংশগ্রহণ বাড়ানোর প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরে। গণিত, পদার্থবিজ্ঞান ও রসায়নের মতো বিষয়ে মেয়েদের আগ্রহ বাড়ানো এবং প্রচলিত সামাজিক ধারণা দূর করতে ‘হাকিলি মুসো’ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে বলে মনে করছে সরকার।
বিশেষ করে উচ্চমাধ্যমিক পর্যায়ে বিজ্ঞান বিষয়ে ভালো ফল করা শিক্ষার্থীদের উচ্চশিক্ষা ও গবেষণার সুযোগ তৈরি করা গেলে দীর্ঘ মেয়াদে দক্ষ নারী বিজ্ঞানী ও প্রযুক্তিবিদ গড়ে তোলা সম্ভব হতে পারে।
বুরকিনা ফাসোর এ সিদ্ধান্ত আন্তর্জাতিক পরিসরেও আলোচনার জন্ম দিয়েছে। একদিকে, বিজ্ঞান প্রতিযোগিতার মাধ্যমে নারীদের শিক্ষাগত অর্জন ও বৈজ্ঞানিক দক্ষতাকে সামনে আনার উদ্যোগ প্রশংসিত হচ্ছে। অন্যদিকে, সুন্দরী প্রতিযোগিতা স্থগিত করার সিদ্ধান্তের সঙ্গে নারীর ব্যক্তিগত পছন্দ ও স্বাধীনতার প্রশ্নও যুক্ত হয়েছে।
সমালোচকদের একটি অংশের মতে, নারীর ক্ষমতায়ন নিশ্চিত করতে বিজ্ঞান শিক্ষায় সুযোগ বাড়ানোর পাশাপাশি তাঁদের নিজস্ব পছন্দ অনুযায়ী সাংস্কৃতিক ও সৃজনশীল কর্মকাণ্ডে অংশ নেওয়ার স্বাধীনতাও থাকা প্রয়োজন।
অন্যদিকে, বুরকিনা ফাসো সরকার বলছে, নতুন উদ্যোগের উদ্দেশ্য নারীদের প্রতিভাকে আরও বিস্তৃতভাবে তুলে ধরা এবং দেশের সাংস্কৃতিক মূল্যবোধের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ প্রতিযোগিতার পরিবেশ তৈরি করা।
আরও পড়ুন:







