তুরস্কের বৃহত্তম শহর ইস্তাম্বুলে গত কয়েক দিনের প্রবল বর্ষণে সৃষ্ট ভয়াবহ বন্যায় অন্তত চারজন নিহত হয়েছেন। নিখোঁজ ব্যক্তিদের সন্ধানে উদ্ধার অভিযান অব্যাহত রয়েছে। বন্যার পানিতে তলিয়ে গেছে বহু বাড়িঘর, দোকানপাট, সড়ক ও আন্ডারপাস। ভেসে গেছে অসংখ্য গাড়ি। পরিস্থিতি মোকাবিলায় হাজার হাজার উদ্ধারকর্মী ও জরুরি সেবাকর্মী কাজ করছেন।
তুরস্কের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, ১৯৪২ সালের পর ইস্তাম্বুলে এমন ভয়াবহ বৃষ্টিপাত ও বন্যা দেখা যায়নি।
১৪ অক্টোবর থেকে শুরু হওয়া ভারী বৃষ্টিপাত পরদিনও বিভিন্ন এলাকায় জনজীবন বিপর্যস্ত করে তোলে। আবহাওয়া বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, ৪৮ ঘণ্টায় ইস্তাম্বুলে যে পরিমাণ বৃষ্টি হয়েছে, তা সেপ্টেম্বর ও অক্টোবর মাসের দীর্ঘমেয়াদি সম্মিলিত গড় বৃষ্টিপাতের চেয়েও বেশি।
ইস্তাম্বুলের গভর্নর দাভুত গুল জানিয়েছেন, ১৯৪২ সালে আবহাওয়ার রেকর্ড সংরক্ষণ শুরু হওয়ার পর থেকে এটিই শহরটির সর্বোচ্চ বৃষ্টিপাতের ঘটনাগুলোর একটি।
শহরের বিভিন্ন এলাকায় পানি নিষ্কাশনব্যবস্থা উপচে পড়ে। নিচু সড়ক, ভূগর্ভস্থ পথ ও আবাসিক এলাকার নিচতলার ঘরগুলো দ্রুত পানিতে ডুবে যায়। কোথাও কোথাও স্রোতের তোড়ে পার্ক করা গাড়ি ভেসে গিয়ে একটির ওপর আরেকটি উঠে পড়ে।
বন্যায় প্রাণহানির ঘটনা ঘটেছে বিভিন্ন এলাকায়। নিহতদের মধ্যে রয়েছে ১৪ বছর বয়সী এক কিশোর, যে ফাতিহ এলাকার বালাত এলাকায় জমে থাকা পানিতে পা দেওয়ার পর বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হয়। হাসপাতালে নেওয়া হলেও তাকে বাঁচানো যায়নি।
এ ছাড়া সারিয়ের এলাকায় ৩৪ বছর বয়সী এক ব্যক্তি পিচ্ছিল ও প্লাবিত সড়কে পড়ে মাথায় আঘাত পান এবং পরে মারা যান। কাগিথানে এলাকায় আরও একজনের মরদেহ উদ্ধার করা হয়।
শুক্রবার সারিয়ের জেলার একটি সেতুর নিচ থেকে ৬৬ বছর বয়সী এক নিখোঁজ ব্যক্তির মরদেহ উদ্ধার করা হলে মৃতের সংখ্যা বেড়ে চারজনে দাঁড়ায়।
কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, নিখোঁজ ব্যক্তিদের খুঁজে বের করতে অনুসন্ধান অব্যাহত রয়েছে। বন্যাসংক্রান্ত মৃত্যুর ঘটনায় কোনো অবহেলা ছিল কি না, তা খতিয়ে দেখতে তদন্তও শুরু হয়েছে।
তুরস্কের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মুস্তাফা চিফচি জানিয়েছেন, বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত মানুষকে সহায়তা, ধ্বংসাবশেষ পরিষ্কার এবং জরুরি উদ্ধারকাজে প্রায় ৪৬ হাজার কর্মী নিয়োজিত রয়েছেন।
কর্তৃপক্ষের হিসাবে, বন্যাসংক্রান্ত ক্ষয়ক্ষতি ও অন্যান্য সমস্যার বিষয়ে প্রায় ৯ হাজার ৮৫০টি প্রতিবেদন পাওয়া গেছে। ক্ষতিগ্রস্ত বাড়িঘর ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান থেকে পানি সরানো এবং রাস্তাঘাট পরিষ্কারের কাজ চলছে।
বন্যায় আটকে পড়া কয়েক হাজার মানুষকে উদ্ধার করা হয়েছে। যাঁরা বাড়িতে ফিরতে পারছেন না, তাঁদের জন্য হোটেল ও সরকারি স্থাপনায় অস্থায়ী আশ্রয়ের ব্যবস্থা করা হয়েছে।
পরিস্থিতির অবনতির কারণে ইস্তাম্বুলের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে সাময়িকভাবে পাঠদান বন্ধ রাখা হয়েছে। বাসিন্দাদের অপ্রয়োজনে ঘরের বাইরে না যাওয়ার পরামর্শ দিয়েছে প্রশাসন। নিচতলা ও বেসমেন্টে বসবাসকারীদের নিরাপদ উঁচু স্থানে আশ্রয় নেওয়ার নির্দেশনাও দেওয়া হয়েছে।
বন্যা ও প্রতিকূল আবহাওয়ার কারণে ইস্তাম্বুল বিমানবন্দরে আসা ৪৩টি ফ্লাইট অন্য বিমানবন্দরে পাঠানো হয়। এ ছাড়া সাবিহা গোকচেন বিমানবন্দরে যাওয়া তিনটি ফ্লাইটও অন্যত্র সরিয়ে নেওয়া হয় বলে তুরস্কের পরিবহন মন্ত্রণালয়ের বরাত দিয়ে এএফপি জানিয়েছে।
কিছু এলাকায় বিদ্যুৎ ও পানির সরবরাহও ব্যাহত হয়েছে। ঝুঁকিপূর্ণ সড়কে যান চলাচল সীমিত করার পাশাপাশি জরুরি উদ্ধারকাজে অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে।
তুরস্কের পরিবেশ, নগরায়ণ ও জলবায়ু পরিবর্তনবিষয়ক মন্ত্রী মুরাত কুরুম বন্যার ক্ষয়ক্ষতি পরিদর্শন করেছেন। তিনি বলেছেন, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে অতিবৃষ্টির মতো চরম আবহাওয়ার ঘটনা বাড়ছে। একই সঙ্গে জলাধার ও খাল-নদীর আশপাশে অপরিকল্পিত নগরায়ণ বন্যার ঝুঁকি বাড়াতে পারে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, স্বল্প সময়ে অতিরিক্ত বৃষ্টিপাত হলে শহরের পানি নিষ্কাশনব্যবস্থা তা সামাল দিতে পারে না। কংক্রিটে ঢাকা সড়ক ও ভবনবহুল এলাকায় পানি দ্রুত জমে গিয়ে আকস্মিক বন্যার সৃষ্টি করতে পারে।
ইস্তাম্বুলের এ দুর্যোগ নগর পরিকল্পনা, পানি নিষ্কাশনব্যবস্থা এবং জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলায় দীর্ঘমেয়াদি পদক্ষেপের প্রয়োজনীয়তা আবারও সামনে এনেছে।
তুরস্কের আবহাওয়া অধিদপ্তর ইস্তাম্বুল ও আশপাশের চারটি প্রদেশে সপ্তাহান্তে আরও ভারী বৃষ্টিপাতের সতর্কতা দিয়েছে। এতে নতুন করে আকস্মিক বন্যা ও ভূমিধসের আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
কর্তৃপক্ষ বাসিন্দাদের নদী-খাল, আন্ডারপাস ও নিচু এলাকা এড়িয়ে চলতে বলেছে। উদ্ধারকর্মীরা ক্ষতিগ্রস্ত এলাকাগুলোতে তল্লাশি, পানি নিষ্কাশন এবং ক্ষয়ক্ষতি নিরূপণের কাজ চালিয়ে যাচ্ছেন।
আরও পড়ুন:







