News Ticker
221.png

বিশ্বে ক্ষুধার্ত ৬৪ কোটি মানুষ, সবচেয়ে বেশি খাবার অপচয় মালদ্বীপে

অনলাইন ডেস্ক

প্রকাশিত: ১৬ অক্টোবর, ২০২৬ ২৩:১৯

শেয়ার

শেয়ার

বিশ্বে ক্ষুধার্ত ৬৪ কোটি মানুষ, সবচেয়ে বেশি খাবার অপচয় মালদ্বীপে
ছবি: সংগৃহীত

বিশ্বজুড়ে একদিকে কোটি কোটি মানুষ পর্যাপ্ত খাবার পাচ্ছেন না, অন্যদিকে বিপুল পরিমাণ খাবার নষ্ট হচ্ছে। জাতিসংঘের সর্বশেষ হিসাব অনুযায়ী, ২০২৫ সালে বিশ্বের প্রায় ৬৪ কোটি ৫০ লাখ মানুষ ক্ষুধার মুখে ছিলেন। অন্যদিকে, বিশ্বে ভোক্তা পর্যায়ে প্রতি বছর নষ্ট হচ্ছে প্রায় ১০৫ কোটি টন খাবার। ব্যক্তিপ্রতি খাদ্য অপচয়ের হিসাবে বিশ্বের শীর্ষে রয়েছে মালদ্বীপ।

শুক্রবার (১৬ অক্টোবর) বিশ্ব খাদ্য দিবস উপলক্ষে প্রকাশিত বিভিন্ন আন্তর্জাতিক প্রতিবেদনে বৈশ্বিক ক্ষুধা ও খাদ্য অপচয়ের এই চিত্র উঠে এসেছে। আলজাজিরার এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বিশ্বে পরিবেশন করা প্রতি পাঁচ প্লেট খাবারের প্রায় এক প্লেট শেষ পর্যন্ত অপচয় হয়। অথচ বিশ্বের বহু মানুষ প্রতিদিন প্রয়োজনীয় খাবার থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন।

জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থা (এফএও) এবং সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৫ সালে বিশ্বের মোট জনসংখ্যার প্রায় ৭ দশমিক ৮ শতাংশ ক্ষুধার্ত ছিলেন। অর্থাৎ, প্রতি ১৩ জনে প্রায় একজন পর্যাপ্ত খাবার পাননি।

বিশ্বে ক্ষুধার হার টানা তৃতীয় বছরের মতো কমেছে। তবে এই অগ্রগতি ধীরগতির এবং সব অঞ্চলে সমান নয়।

জাতিসংঘের ‘দ্য স্টেট অব ফুড সিকিউরিটি অ্যান্ড নিউট্রিশন ইন দ্য ওয়ার্ল্ড ২০২৬’ প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৫ সালে ক্ষুধার হার ছিল ৭ দশমিক ৮ শতাংশ। ২০২৪ সালে এ হার ছিল ৮ দশমিক ১ শতাংশ এবং ২০২২ সালে ছিল ৮ দশমিক ৬ শতাংশ।

অর্থাৎ, পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতি হলেও করোনাভাইরাস মহামারির আগের সময়ের তুলনায় বিশ্বে ক্ষুধার্ত মানুষের সংখ্যা এখনো বেশি। খাদ্যের উচ্চমূল্য, দারিদ্র্য, সংঘাত, বাস্তুচ্যুতি এবং জলবায়ুজনিত সংকট বিভিন্ন অঞ্চলে খাদ্যনিরাপত্তার ওপর চাপ সৃষ্টি করছে।

আঞ্চলিক হিসাবে ক্ষুধার্ত মানুষের সবচেয়ে বড় অংশের বসবাস আফ্রিকায়। জাতিসংঘের হিসাব অনুযায়ী, ২০২৫ সালে মহাদেশটিতে প্রায় ৩০ কোটি ৯০ লাখ মানুষ ক্ষুধার মুখে ছিলেন। আফ্রিকার মোট জনসংখ্যার প্রায় প্রতি পাঁচজনে একজন পর্যাপ্ত খাবার থেকে বঞ্চিত ছিলেন।

অন্যদিকে, এশিয়ায় ক্ষুধার্ত মানুষের সংখ্যা ছিল প্রায় ২৯ কোটি ২০ লাখ। তবে জনসংখ্যার অনুপাতে বিভিন্ন অঞ্চলের পরিস্থিতিতে পার্থক্য রয়েছে।

জাতিসংঘের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বিশ্বজুড়ে ক্ষুধা কমানোর ক্ষেত্রে অগ্রগতি হলেও আফ্রিকাসহ বিভিন্ন অঞ্চলে খাদ্যনিরাপত্তা নিশ্চিত করা এখনো বড় চ্যালেঞ্জ। বিশেষ করে সংঘাতপ্রবণ এলাকা, দরিদ্র পরিবার এবং গ্রামীণ জনগোষ্ঠী খাদ্যসংকটের ঝুঁকিতে বেশি রয়েছে।

ব্যক্তিপ্রতি খাদ্য অপচয়ের হিসাবে সবচেয়ে বেশি খাবার নষ্ট হয় মালদ্বীপে। জাতিসংঘের পরিবেশ কর্মসূচি (ইউএনইপি)-এর হিসাবের ভিত্তিতে আলজাজিরার প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দেশটিতে একজন মানুষ বছরে গড়ে প্রায় ২৬০ কেজি খাবার অপচয় করেন। এই পরিমাণ বৈশ্বিক গড়ের প্রায় দ্বিগুণ।

তালিকায় মালদ্বীপের পর রয়েছে সিরিয়া, ডোমিনিকান রিপাবলিক, সেশেলস, মেক্সিকো ও তিউনিসিয়া। এসব দেশে ব্যক্তিপ্রতি বছরে ২১০ কেজির বেশি খাবার অপচয়ের হিসাব পাওয়া গেছে।

অন্যদিকে, স্পেনে ব্যক্তিপ্রতি খাদ্য অপচয়ের পরিমাণ তুলনামূলকভাবে কম, বছরে প্রায় ৩৯ কেজি বা তারও কম।

এখানে উল্লেখ্য, এই তুলনা ব্যক্তিপ্রতি খাদ্য অপচয়ের হিসাবের ভিত্তিতে করা হয়েছে; মোট জাতীয় খাদ্য অপচয়ের পরিমাণের ভিত্তিতে নয়।

জাতিসংঘের পরিবেশ কর্মসূচির ২০২৪ সালের ‘ফুড ওয়েস্ট ইনডেক্স’ প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২২ সালে বিশ্বে ভোক্তা পর্যায়ে প্রায় ১০৫ কোটি টন খাবার অপচয় হয়েছিল। খুচরা বিক্রয়কেন্দ্র, রেস্তোরাঁ এবং গৃহস্থালি থেকে এসব খাবার ফেলে দেওয়া হয়।

এর মধ্যে সবচেয়ে বড় অংশের অপচয় ঘটে গৃহস্থালি পর্যায়ে। ইউএনইপির হিসাবে, মোট খাদ্য অপচয়ের প্রায় ৬০ শতাংশ হয় বাড়িতে, ২৮ শতাংশ খাদ্যসেবা খাতে এবং ১২ শতাংশ খুচরা বিক্রয় পর্যায়ে।

খাবার নষ্ট হওয়ার অর্থ শুধু খাদ্যের অপচয় নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে কৃষিজমি, পানি, জ্বালানি, শ্রম ও অর্থের অপচয়। উৎপাদন থেকে শুরু করে পরিবহন, সংরক্ষণ ও রান্না পর্যন্ত প্রতিটি ধাপে ব্যবহৃত সম্পদের একটি বড় অংশ শেষ পর্যন্ত কাজে লাগছে না।

খাদ্য অপচয় পরিবেশের জন্যও বড় উদ্বেগের বিষয়। ফেলে দেওয়া খাবার ভাগাড়ে পচে গ্রিনহাউস গ্যাস, বিশেষ করে মিথেন, নির্গত করতে পারে। এতে বৈশ্বিক উষ্ণতা বৃদ্ধির ঝুঁকি বাড়ে।

ইউএনইপির তথ্য অনুযায়ী, বিশ্বে উৎপাদিত খাদ্যের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ শেষ পর্যন্ত মানুষের খাওয়ার কাজে লাগে না। ফলে খাদ্য উৎপাদনের জন্য ব্যবহৃত জমি, পানি ও অন্যান্য প্রাকৃতিক সম্পদের ওপর অপ্রয়োজনীয় চাপ তৈরি হয়।

অন্যদিকে, ফলমূল ও শাকসবজির মতো পচনশীল খাবার সংরক্ষণ ও পরিবহনের সীমাবদ্ধতার কারণে উৎপাদন থেকে বাজার পর্যন্ত বিভিন্ন পর্যায়ে নষ্ট হয়। উন্নত সংরক্ষণব্যবস্থা, কার্যকর সরবরাহব্যবস্থা এবং খাদ্যের চাহিদা অনুযায়ী উৎপাদন ও ক্রয় পরিকল্পনা এই ক্ষতি কমাতে সহায়তা করতে পারে।

প্রতি বছর ১৬ অক্টোবর বিশ্ব খাদ্য দিবস পালিত হয়। ১৯৪৫ সালের এই দিনে জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থা প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। ক্ষুধা দূর করা, পুষ্টিকর খাবারের প্রাপ্যতা বাড়ানো এবং টেকসই খাদ্যব্যবস্থা গড়ে তোলার বিষয়ে সচেতনতা তৈরিই দিবসটির অন্যতম উদ্দেশ্য।

২০২৬ সালের প্রতিপাদ্য ‘আজকের উদ্ভাবন, আগামী দিনের পুষ্টি’ (Innovate Today, Nourish Tomorrow)। প্রতিপাদ্যটি খাদ্যব্যবস্থায় উদ্ভাবন ও উন্নয়নের মাধ্যমে ভবিষ্যতের পুষ্টি চাহিদা পূরণের গুরুত্ব তুলে ধরে।

বিশ্বজুড়ে ক্ষুধার্ত মানুষের সংখ্যা এবং খাদ্য অপচয়ের বিপুল পরিমাণ দেখিয়ে দিচ্ছে, শুধু খাদ্য উৎপাদন বাড়ানোই যথেষ্ট নয়; উৎপাদিত খাবার সঠিকভাবে সংরক্ষণ, বিতরণ ও ব্যবহার নিশ্চিত করাও জরুরি।

বিশেষজ্ঞদের মতে, খাদ্য অপচয় কমাতে পরিবার পর্যায়ে প্রয়োজন অনুযায়ী খাবার কেনা ও রান্না, উদ্বৃত্ত খাবার নিরাপদে সংরক্ষণ, রেস্তোরাঁয় অপচয় কমানো এবং কৃষিপণ্য সংরক্ষণ ও পরিবহনের অবকাঠামো উন্নত করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে দরিদ্র জনগোষ্ঠীর জন্য পুষ্টিকর খাবারের সহজলভ্যতা নিশ্চিত করতে কার্যকর নীতিমালা ও সামাজিক উদ্যোগও গুরুত্বপূর্ণ।

বিশ্ব খাদ্য দিবসে তাই ক্ষুধা মোকাবিলার পাশাপাশি খাদ্যের অপচয় কমানো এবং সবার জন্য নিরাপদ ও পুষ্টিকর খাবার নিশ্চিত করার আহ্বান আরও জোরালো হয়ে উঠেছে।

ChannelNRB Footer