প্রতিদিন প্রায় পাঁচ হাজার সিঁড়ি বেয়ে দুর্গম পাহাড়ের চূড়ায় ওঠেন তিনি। সেখানে পৌঁছে দেন আজান, ইমামতি করেন জামাতে নামাজে। শুধু তা-ই নয়, দেশ-বিদেশ থেকে আসা পর্যটকদের স্বাগত জানান এবং শোনান ঐতিহাসিক মসজিদ ও প্রাচীন নগরীর গল্প। তুরস্কের পূর্বাঞ্চলীয় ভান শহরের ইমাম সিবগাতুল্লাহ বিলমেজের প্রতিদিনের জীবন এমনই।
উসমানীয় আমলের ঐতিহাসিক সুলাইমান খান মসজিদটি অবস্থিত ভান দুর্গের পাথুরে চূড়ায়। আতাতুর্ক সাংস্কৃতিক উদ্যান থেকে সেখানে পৌঁছাতে তাঁকে পাড়ি দিতে হয় খাড়া ও দুর্গম সিঁড়িপথ। শারীরিক পরিশ্রমের এই দীর্ঘ যাত্রা সত্ত্বেও নিজের দায়িত্ব আনন্দের সঙ্গে পালন করে যাচ্ছেন তিনি।
শনিবার (১৭ অক্টোবর) প্রকাশিত সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত পাঁচ মাস ধরে ঐতিহাসিক এই মসজিদের ভারপ্রাপ্ত ইমাম হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন সিবগাতুল্লাহ।
ভান দুর্গের উঁচু পাথুরে চূড়ায় অবস্থিত মসজিদটিতে পৌঁছাতে প্রতিদিন আতাতুর্ক সাংস্কৃতিক উদ্যান এলাকা থেকে সিঁড়ি বেয়ে ওপরে ওঠেন সিবগাতুল্লাহ। পথটি দীর্ঘ, খাড়া ও কষ্টসাধ্য। তারপরও নিয়মিত দায়িত্ব পালনে কোনো অনীহা নেই তাঁর।
জোহরের নামাজের আগেই মসজিদে পৌঁছান তিনি। সেখানে আজান দেওয়া, নামাজের ইমামতি করা এবং দর্শনার্থীদের সঙ্গে সময় কাটানো তাঁর দৈনন্দিন কাজের অংশ। জোহর, আসর ও মাগরিবের নামাজ শেষে নিচে নেমে আসেন তিনি।
মসজিদটির দুর্গম অবস্থানের কারণে ফজর ও এশার সময় সাধারণ মুসল্লিদের যাতায়াত কঠিন। এ কারণে ওই দুই ওয়াক্তে সেখানে নিয়মিত জামাত অনুষ্ঠিত হয় না বলে সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে।
প্রতিদিনের এই দীর্ঘ যাত্রা যে সহজ নয়, তা স্বীকার করেছেন সিবগাতুল্লাহ নিজেই। তবে দায়িত্বটিকে তিনি বোঝা হিসেবে দেখেন না। বরং স্বেচ্ছায় এই কাজ করতে পেরে সন্তুষ্ট তিনি।
তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে দুর্গের চূড়ায় পৌঁছানোর পর চারপাশের মনোরম দৃশ্য দেখলে যাত্রার ক্লান্তি অনেকটাই সার্থক মনে হয়। মানুষের দোয়া ও ভালোবাসাও তাঁকে অনুপ্রাণিত করে।
দর্শনার্থীদের কাছ থেকে ‘আল্লাহ আপনার প্রতি সন্তুষ্ট হোন’—এমন শুভকামনা শুনতে পারাকে নিজের কাজের অন্যতম বড় প্রাপ্তি বলে মনে করেন তিনি।
সিবগাতুল্লাহর দায়িত্ব কেবল আজান দেওয়া ও নামাজ পড়ানোর মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। ভান দুর্গ দেখতে আসা দেশি-বিদেশি পর্যটকদের স্বাগত জানান তিনি। তাঁদের কাছে মসজিদটির ইতিহাস, প্রাচীন ভান নগরী এবং উরার্তু সভ্যতার বিভিন্ন দিক তুলে ধরেন।
মসজিদটি সুলতান সুলেইমান দ্য ম্যাগনিফিসেন্টের সময়ের ঐতিহাসিক স্থাপনার সঙ্গে সম্পর্কিত হওয়ায় দর্শনার্থীদের আগ্রহও বেশি। অনেক পর্যটক দুর্গ ঘুরে দেখার পাশাপাশি মসজিদটি পরিদর্শন করেন।
বিদেশি পর্যটকদের সঙ্গে নিয়মিত কথা বলতে গিয়ে সিবগাতুল্লাহর ইংরেজি ভাষায় যোগাযোগের দক্ষতাও বেড়েছে। এখন তিনি তাঁদের বিভিন্ন প্রশ্নের উত্তর দেন এবং ইসলাম ও ঐতিহাসিক স্থাপনাটি সম্পর্কে আলোচনা করেন।
তাঁর মতে, এ ধরনের কথোপকথন দুই পক্ষের জন্যই শেখার সুযোগ তৈরি করে।
বর্তমান দায়িত্ব নেওয়ার আগে সিবগাতুল্লাহ প্রায় পাঁচ বছর তুরস্কের ধর্মবিষয়ক অধিদপ্তর এবং স্থানীয় মুফতি কার্যালয়ের অধীনে বিভিন্ন পদে কাজ করেছেন। সেই অভিজ্ঞতা তাঁর বর্তমান দায়িত্ব পালনে সহায়ক হয়েছে।
গত পাঁচ মাস ধরে সুলাইমান খান মসজিদের ভারপ্রাপ্ত ইমাম হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন তিনি। ধর্মীয় দায়িত্বের পাশাপাশি ঐতিহাসিক স্থাপনাটি দেখতে আসা পর্যটকদের সঙ্গে যোগাযোগের কাজও সামলাচ্ছেন।
ভান দুর্গের চূড়ায় অবস্থিত সুলাইমান খান মসজিদটির সুনির্দিষ্ট নির্মাণকাল জানা যায়নি। তবে ঐতিহাসিক তথ্য অনুযায়ী, ১৫৩৪ সালে উসমানীয় সুলতান সুলেইমান দ্য ম্যাগনিফিসেন্ট মসজিদটি সংস্কার করেছিলেন।
দীর্ঘ সময় অবহেলিত থাকার পর কয়েক বছর আগে মসজিদটি সংস্কার করে আবার নামাজের জন্য খুলে দেওয়া হয়। বর্তমানে এটি ধর্মীয় উপাসনালয়ের পাশাপাশি ঐতিহাসিক ও পর্যটন আকর্ষণ হিসেবেও পরিচিত।
মসজিদটির অবস্থান, প্রাচীন স্থাপত্য এবং চারপাশের প্রাকৃতিক দৃশ্য পর্যটকদের আকর্ষণ করে। আর সেখানে নিয়মিত দায়িত্ব পালন করে যাচ্ছেন সিবগাতুল্লাহ বিলমেজ।
প্রতিদিনের পাঁচ হাজার সিঁড়ির কঠিন পথ তাঁর কাছে শুধু কর্মস্থলে পৌঁছানোর যাত্রা নয়; এটি ধর্মীয় দায়িত্ব, মানুষের সেবা এবং ইতিহাসকে দর্শনার্থীদের কাছে তুলে ধরারও অংশ।
আরও পড়ুন:







