News Ticker
221.png

রণক্ষেত্র ফ্রান্স, পুলিশের সঙ্গে বিক্ষোভকারীদের ব্যাপক সংঘর্ষ

অনলাইন ডেস্ক

প্রকাশিত: ১৭ অক্টোবর, ২০২৬ ২২:৩০

শেয়ার

শেয়ার

রণক্ষেত্র ফ্রান্স, পুলিশের সঙ্গে বিক্ষোভকারীদের ব্যাপক সংঘর্ষ
ছবি: সংগৃহীত

জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি, জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি এবং সরকারি সেবার অবনতি নিয়ে ক্ষোভে উত্তাল ফ্রান্স। শনিবার (১৭ অক্টোবর) দেশটির রাজধানী প্যারিসসহ একাধিক শহরে ব্যাপক বিক্ষোভের মধ্যে পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষে জড়ান আন্দোলনকারীদের একাংশ। কোথাও পুলিশের কাঁদানে গ্যাস ও জলকামান ব্যবহার, কোথাও গাড়িতে আগুন, দোকানপাটে ভাঙচুর এবং সরকারি ভবনে হামলার ঘটনা ঘটেছে।

ফরাসি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, শনিবার দুপুরের পর পর্যন্ত দেশজুড়ে সংঘর্ষ ও সহিংসতার ঘটনায় অন্তত ২৭২ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। প্যারিস, মার্সেই, লিয়োঁ, তুলুজ, আঙ্গারস ও রেনসহ বিভিন্ন শহরে বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে।

সাম্প্রতিক বছরগুলোর মধ্যে এটি ফ্রান্সের অন্যতম উত্তেজনাপূর্ণ বিক্ষোভের দিন। তবে বিক্ষোভের অনেক কর্মসূচি শান্তিপূর্ণভাবেও অনুষ্ঠিত হয়েছে।

রাজধানী প্যারিসের প্লাস দে লা রিপাবলিক এলাকায় বিক্ষোভকারীদের সঙ্গে পুলিশের সংঘর্ষ হয়। মুখোশ ও হুড পরা কিছু বিক্ষোভকারী পুলিশকে লক্ষ্য করে আতশবাজি, পাথর ও বিভিন্ন বস্তু ছুড়লে পুলিশ কাঁদানে গ্যাস ব্যবহার করে তাঁদের ছত্রভঙ্গ করার চেষ্টা করে। কয়েকটি স্থানে জলকামানও ব্যবহার করা হয়।

সংঘর্ষের মধ্যে কয়েকটি গাড়ি ও ময়লার পাত্রে আগুন ধরিয়ে দেওয়া হয়। দোকানপাটের জানালা ভাঙচুরের ঘটনাও ঘটে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে গুরুত্বপূর্ণ সড়ক ও জনসমাগমস্থলে অতিরিক্ত দাঙ্গা পুলিশ মোতায়েন করা হয়।

পুলিশের অভিযানের কারণে আশপাশের কয়েকটি দোকান সাময়িকভাবে বন্ধ করে দেওয়া হয়। কাঁদানে গ্যাসের ধোঁয়ায় পথচারী ও পর্যটকদেরও দুর্ভোগে পড়তে হয়।

ফ্রান্সের দ্বিতীয় বৃহত্তম শহর মার্সেইয়ে বিক্ষোভকারীদের একটি দল সিটি হলের ভেতরে ঢুকে পড়ে। এ সময় ভবনের কিছু আসবাবপত্র ভাঙচুর করা হয়। পরে পুলিশ তাঁদের সেখান থেকে সরিয়ে দেয়। পরিস্থিতি মোকাবিলায় অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েনের আহ্বান জানান শহরটির মেয়র।

অন্যদিকে, লিয়োঁ শহরে একটি পর্যটন কার্যালয়ে আগুন ধরিয়ে দেওয়ার ঘটনা ঘটেছে। ভবনটিতে আগুন লাগার পর পুলিশ বিক্ষোভকারীদের ছত্রভঙ্গ করতে কাঁদানে গ্যাস ব্যবহার করে।

উত্তরাঞ্চলীয় লিল শহরেও মেয়রের কার্যালয়ে ভাঙচুরের খবর পাওয়া গেছে। দেশটির বিভিন্ন শহরে সরকারি স্থাপনা ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান লক্ষ্য করে হামলার ঘটনায় নিরাপত্তা পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ দেখা দিয়েছে।

বিক্ষোভের পেছনে রয়েছে একাধিক সামাজিক ও অর্থনৈতিক ইস্যু। সাম্প্রতিক মাসগুলোতে জ্বালানি, খাদ্য ও অন্যান্য নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম বেড়ে যাওয়ায় সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় নিয়ে অসন্তোষ বাড়ছে।

একই সঙ্গে সরকারি সেবার মান, সামাজিক নিরাপত্তা, বৈষম্য এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের অবকাঠামো নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করছেন বিক্ষোভকারীরা।

আন্দোলনটির সূচনা হয় প্যারিসের দরিদ্র উত্তরাঞ্চলের কয়েকটি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষকসংকট ও জরাজীর্ণ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে শিক্ষার্থীদের প্রতিবাদের মধ্য দিয়ে। পরে এতে শিক্ষক, শ্রমিক সংগঠন, জলবায়ুকর্মী, কৃষক এবং ২০১৮ সালের ‘ইয়েলো ভেস্ট’ আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিদের একটি অংশও যোগ দেন।

বিক্ষোভকারীদের দাবি, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পর্যাপ্ত শিক্ষক নিয়োগ, শ্রেণিকক্ষ ও অবকাঠামোর উন্নয়ন এবং সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় কমাতে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে।

ফ্রান্সে ২০১৮ সালে জ্বালানির ওপর কর বৃদ্ধি ও জীবনযাত্রার ব্যয়ের প্রতিবাদে ‘ইয়েলো ভেস্ট’ বা হলুদ জ্যাকেট আন্দোলনের সূচনা হয়েছিল। পরে তা বৈষম্য, অর্থনৈতিক নীতি এবং সরকারের বিরুদ্ধে বৃহত্তর আন্দোলনে রূপ নেয়।

বর্তমান বিক্ষোভে সেই আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিদের একটি অংশ আবার রাস্তায় নেমেছেন। তাঁদের পোশাকে হলুদ নিরাপত্তা জ্যাকেট দেখা গেছে। এতে ফ্রান্সে নতুন করে বড় ধরনের সামাজিক আন্দোলন গড়ে ওঠার সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা শুরু হয়েছে।

তবে বর্তমান আন্দোলনে শিক্ষার্থীদের দাবি, শ্রমিকদের অসন্তোষ এবং জীবনযাত্রার ব্যয়সংক্রান্ত ক্ষোভ—বিভিন্ন বিষয় একসঙ্গে যুক্ত হয়েছে। ফলে সব বিক্ষোভকারীর দাবি বা অবস্থান এক নয়।

ফরাসি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের হিসাব অনুযায়ী, শনিবার দুপুরের পর পর্যন্ত দেশজুড়ে অন্তত ২৭২ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। কর্তৃপক্ষের দাবি, বিক্ষোভের একাংশে পুলিশকে লক্ষ্য করে হামলা, দোকানপাটে লুটপাটের চেষ্টা এবং সরকারি ভবনে ভাঙচুরের ঘটনা ঘটেছে।

অন্যদিকে, কিছু বিক্ষোভকারী অভিযোগ করেছেন, শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদেও পুলিশ অতিরিক্ত বলপ্রয়োগ করেছে। শিক্ষার্থীদের ওপর পুলিশের আচরণ এবং বিক্ষোভ নিয়ন্ত্রণে ব্যবহৃত সরঞ্জাম নিয়ে আগেই বিতর্ক তৈরি হয়েছিল।

পুলিশের বলপ্রয়োগসংক্রান্ত কয়েকটি অভিযোগ তদন্তাধীন রয়েছে। বিক্ষোভে আহত ব্যক্তিদের সুনির্দিষ্ট সংখ্যা সম্পর্কে তাৎক্ষণিকভাবে পূর্ণাঙ্গ তথ্য পাওয়া যায়নি।

ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট এমানুয়েল মাখোঁর মেয়াদের শেষ পর্যায়ে এসে অর্থনৈতিক চাপ, সরকারি ঋণ এবং রাজনৈতিক বিভাজনের মধ্যে এই বিক্ষোভ নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে। সামনে প্রেসিডেন্ট নির্বাচন থাকায় জীবনযাত্রার ব্যয় ও সরকারি সেবার মান নিয়ে অসন্তোষ রাজনৈতিক আলোচনার গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে পরিণত হয়েছে।

ChannelNRB Footer