News Ticker
221.png

বিশ্বজুড়ে ১০ বছরে সাড়ে ৪ হাজারেরও বেশি শিশু অভিবাসীর মৃত্যু: আইওএম

অনলাইন ডেস্ক

প্রকাশিত: ১৭ অক্টোবর, ২০২৬ ২৩:০৭

শেয়ার

শেয়ার

বিশ্বজুড়ে ১০ বছরে সাড়ে ৪ হাজারেরও বেশি শিশু অভিবাসীর মৃত্যু: আইওএম
ছবি: সংগৃহীত

উন্নত জীবন, নিরাপত্তা ও ভবিষ্যতের আশায় ঝুঁকিপূর্ণ পথে অভিবাসনের চেষ্টা করতে গিয়ে গত এক দশকে বিশ্বজুড়ে অন্তত ৪ হাজার ৪১৪ শিশু নিহত বা নিখোঁজ হয়েছে। আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থা (আইওএম) প্রকাশিত এক নতুন প্রতিবেদনে এ তথ্য উঠে এসেছে। সংস্থাটি বলছে, প্রকৃত সংখ্যা নথিভুক্ত হিসাবের চেয়ে অনেক বেশি হতে পারে।

আইওএমের ‘মিসিং মাইগ্র্যান্টস প্রজেক্ট’-এর তথ্য অনুযায়ী, ২০১৪ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত বিশ্বের বিভিন্ন অভিবাসনপথে এসব শিশুর মৃত্যু বা নিখোঁজ হওয়ার ঘটনা নথিভুক্ত করা হয়েছে। বিপজ্জনক সমুদ্রযাত্রা, মরুভূমির প্রতিকূল পরিবেশ, মানবপাচারকারীদের নির্যাতন এবং নিরাপদ অভিবাসনের সুযোগের অভাব শিশুদের ঝুঁকি বাড়িয়ে তুলছে।

আইওএমের প্রতিবেদনে ভূমধ্যসাগরীয় অভিবাসনপথকে শিশুদের জন্য সবচেয়ে প্রাণঘাতী পথ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। উত্তর আফ্রিকা থেকে ইউরোপে পৌঁছানোর আশায় এই সাগর পাড়ি দিতে গিয়ে দুই হাজারের বেশি শিশুর মৃত্যু বা নিখোঁজ হওয়ার ঘটনা নথিভুক্ত হয়েছে।

অভিবাসনপ্রত্যাশীরা প্রায়ই অতিরিক্ত যাত্রীবোঝাই নৌকায় বিপজ্জনক সমুদ্রযাত্রা করেন। অনেক ক্ষেত্রে নৌযানে পর্যাপ্ত নিরাপত্তাব্যবস্থা থাকে না। উত্তাল ঢেউ, প্রতিকূল আবহাওয়া ও নৌযানডুবির কারণে শিশুদের প্রাণহানির ঝুঁকি বেড়ে যায়।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, লাতিন আমেরিকা থেকে যুক্তরাষ্ট্রে পৌঁছানোর চেষ্টায় নদীতে ডুবে এবং মরুভূমির চরম আবহাওয়ায় অন্তত ৮৫০ শিশুর মৃত্যু নথিভুক্ত হয়েছে।

আইওএম সতর্ক করেছে, নথিভুক্ত পরিসংখ্যান দিয়ে শিশুদের মৃত্যুর প্রকৃত চিত্র পুরোপুরি বোঝা সম্ভব নয়। অনেক ক্ষেত্রে দুর্ঘটনার পর মরদেহ উদ্ধার করা যায় না। আবার মরদেহ পাওয়া গেলেও বয়স, পরিচয় কিংবা জাতীয়তা নিশ্চিত করা সম্ভব হয় না।

সংস্থাটির তথ্য অনুযায়ী, ২০১৪ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত বিশ্বজুড়ে অভিবাসনপথে প্রায় ৮১ হাজার মানুষের মৃত্যু বা নিখোঁজ হওয়ার ঘটনা নথিভুক্ত হয়েছে। তাঁদের মধ্যে ৪৪ হাজার ৮৬২ জনের, অর্থাৎ ৫৫ দশমিক ৫ শতাংশের বয়সসংক্রান্ত তথ্য পাওয়া যায়নি।

ফলে এই হিসাবের মধ্যে কত শিশু রয়েছে, তা নিশ্চিতভাবে নির্ধারণ করা সম্ভব হচ্ছে না। আইওএমের মতে, নথিভুক্ত ৪ হাজার ৪১৪ শিশুর সংখ্যা তাই প্রকৃত প্রাণহানির একটি অসম্পূর্ণ চিত্র মাত্র।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, যেসব শিশুর বয়স শনাক্ত করা সম্ভব হয়েছে, তাদের মধ্যে পাঁচ বছরের কম বয়সী শতাধিক শিশু রয়েছে। নথিভুক্ত শিশুদের মধ্যে ছেলেদের মৃত্যুহার মেয়েদের তুলনায় কিছুটা বেশি; শনাক্ত করা শিশুদের প্রায় ৬০ শতাংশ ছেলে।

তবে বহু শিশুর বয়স ও লিঙ্গ শনাক্ত করা সম্ভব হয়নি। বিশেষ করে সমুদ্রপথে নৌযানডুবির ঘটনায় পরিবারের সদস্যদের বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়া এবং মরদেহ উদ্ধার করতে না পারার কারণে তথ্য সংগ্রহ আরও কঠিন হয়ে পড়ে।

যুদ্ধ, সহিংসতা, দারিদ্র্য, খাদ্যসংকট, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব এবং উন্নত জীবনের আকাঙ্ক্ষা বহু পরিবারকে দেশ ছাড়তে বাধ্য করছে। অনেক শিশু পরিবারের সঙ্গে অভিবাসনের পথে বের হয়; আবার কেউ কেউ নিরাপত্তা ও কাজের সন্ধানে একাই যাত্রা করে।

কিন্তু নিরাপদ ও বৈধ অভিবাসনের সুযোগ সীমিত থাকায় অনেক পরিবার মানবপাচারকারী ও চোরাচালানকারীদের ওপর নির্ভর করতে বাধ্য হয়। এতে তারা বিপজ্জনক নৌযাত্রা, দুর্গম স্থলপথ এবং অপরাধী চক্রের নির্যাতনের ঝুঁকিতে পড়ে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, শিশুদের সুরক্ষা নিশ্চিত করতে অভিবাসনের পেছনের কারণগুলো মোকাবিলা করার পাশাপাশি নিরাপদ যাত্রার সুযোগ বাড়ানো প্রয়োজন।

শিশুদের মৃত্যু ও নিখোঁজ হওয়ার ঘটনা কমাতে আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থা আইওএম এবং জাতিসংঘের শিশু তহবিল ইউনিসেফ সরকারগুলোর মধ্যে সমন্বয় বাড়ানোর আহ্বান জানিয়েছে।

সংস্থাগুলো সীমান্ত ও সমুদ্রপথে উদ্ধার কার্যক্রম জোরদার করা, মানবপাচারকারী চক্রের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া এবং নিহতদের বয়স ও পরিচয় যথাযথভাবে নথিভুক্ত করার ওপর গুরুত্ব দিয়েছে।

আইওএমের কর্মকর্তাদের মতে, যেসব শিশুর মৃত্যু নথিভুক্ত হয় না, তাদের সুরক্ষায় প্রয়োজনীয় নীতি ও কর্মসূচি গ্রহণ করাও কঠিন হয়ে পড়ে। তাই তথ্য সংগ্রহ ও বিনিময়ের ব্যবস্থা উন্নত করা জরুরি।

বিশ্বজুড়ে অভিবাসনপথে হাজার হাজার শিশুর মৃত্যু ও নিখোঁজ হওয়ার ঘটনা আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের জন্য বড় উদ্বেগের বিষয় হয়ে উঠেছে। বিশেষ করে সমুদ্রপথে বিপজ্জনক যাত্রা এবং মানবপাচারকারীদের দৌরাত্ম্য শিশুদের জীবনকে আরও অনিশ্চিত করে তুলছে।

আইওএমের মতে, শিশুদের মৃত্যু কমাতে শুধু উদ্ধার অভিযান বাড়ালেই হবে না; নিরাপদ ও বৈধ অভিবাসনের সুযোগ তৈরি, মানবপাচার প্রতিরোধ এবং সংঘাত ও দারিদ্র্যপীড়িত অঞ্চলে শিশুদের সুরক্ষা নিশ্চিত করতে সমন্বিত পদক্ষেপ নিতে হবে।

সংস্থাটির এই প্রতিবেদন আবারও মনে করিয়ে দিয়েছে, অভিবাসনের পথে নথিভুক্ত প্রতিটি শিশুর মৃত্যু একটি মানবিক বিপর্যয়—আর যাদের হিসাব রাখা যায়নি, তাদের প্রকৃত সংখ্যা আরও বড় হতে পারে।

ChannelNRB Footer