News Ticker
221.png

জেন-জি বিক্ষোভে এবার উত্তাল ফ্রান্স

অনলাইন ডেস্ক

প্রকাশিত: ১৮ অক্টোবর, ২০২৬ ১৫:০৮

শেয়ার

শেয়ার

জেন-জি বিক্ষোভে এবার উত্তাল ফ্রান্স
ছবি: সংগৃহীত

ফ্রান্সজুড়ে ছড়িয়ে পড়েছে তরুণ প্রজন্মের নেতৃত্বে বিক্ষোভ। জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি, শিক্ষাব্যবস্থার সংকট, শিক্ষকদের ঘাটতি এবং সরকারি সেবার মান নিয়ে ক্ষোভ থেকে শুরু হওয়া আন্দোলন এখন দেশটির বড় রাজনৈতিক ও সামাজিক সংকটে রূপ নিচ্ছে। রাজধানী প্যারিসসহ বিভিন্ন শহরে বিক্ষোভকারীদের সঙ্গে পুলিশের সংঘর্ষ, অগ্নিসংযোগ ও দোকানপাটে লুটপাটের ঘটনা ঘটেছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে নিরাপত্তা বাহিনী মোতায়েন বাড়িয়েছে কর্তৃপক্ষ।

শনিবার, ১৭ অক্টোবর দেশজুড়ে অনুষ্ঠিত বিক্ষোভে বিপুলসংখ্যক মানুষ অংশ নেন। ফ্রান্সের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের হিসাবে, বিক্ষোভকারীর সংখ্যা ছিল প্রায় ৫ লাখ ৫০ হাজার। অন্যদিকে শ্রমিক সংগঠন সিজিটি (CGT) দাবি করেছে, অংশগ্রহণকারীর সংখ্যা ৮ লাখের কাছাকাছি। বিভিন্ন শহরে অধিকাংশ মিছিল শান্তিপূর্ণভাবে শুরু হলেও কিছু এলাকায় পরিস্থিতি দ্রুত সহিংস হয়ে ওঠে।

বার্তা সংস্থা রয়টার্সের প্রতিবেদন অনুযায়ী, বিক্ষোভ ঘিরে প্রায় ১ হাজার ২০০ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষে শতাধিক পুলিশ সদস্য আহত হয়েছেন বলেও কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে।

ফ্রান্সের সাম্প্রতিক আন্দোলনের সূত্রপাত হয় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের দুরবস্থা নিয়ে শিক্ষার্থীদের ক্ষোভ থেকে। শ্রেণিকক্ষে শিক্ষকসংকট, অতিরিক্ত শিক্ষার্থী, জরাজীর্ণ ভবন, অপর্যাপ্ত সুযোগ-সুবিধা এবং পাঠদানের অনুকূল পরিবেশের অভাব নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই অভিযোগ জানিয়ে আসছিল শিক্ষার্থীরা।

গত সেপ্টেম্বরের শেষ দিকে প্যারিসের উপকণ্ঠে একটি উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষার্থীদের বিক্ষোভ শুরু হয়। অল্প সময়ের মধ্যে তা রাজধানী অঞ্চল ছাড়িয়ে দেশের বিভিন্ন এলাকায় ছড়িয়ে পড়ে। পরবর্তী সময়ে আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত হয় শিক্ষক, শ্রমিক সংগঠন ও অন্যান্য সামাজিক গোষ্ঠী।

তরুণদের অভিযোগ, শিক্ষাব্যবস্থায় প্রয়োজনীয় বিনিয়োগের অভাব তাদের ভবিষ্যৎকে অনিশ্চিত করে তুলছে। একই সঙ্গে মূল্যস্ফীতি, আবাসন ব্যয়, কর্মসংস্থানের অনিশ্চয়তা এবং ক্রমবর্ধমান বৈষম্য তাদের ক্ষোভ আরও বাড়িয়ে দিয়েছে।

রাজধানী প্যারিসে বিক্ষোভকারীদের সঙ্গে পুলিশের একাধিক দফায় সংঘর্ষ হয়েছে। কয়েকটি এলাকায় বিক্ষোভকারীরা পুলিশের দিকে বিভিন্ন বস্তু নিক্ষেপ করেন। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে পুলিশ কাঁদানে গ্যাস ও জলকামান ব্যবহার করে।

কিছু এলাকায় দোকানের জানালা ভাঙচুর, যানবাহনে আগুন এবং বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানে লুটপাটের ঘটনা ঘটেছে। সংঘর্ষের কারণে শহরের কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় স্বাভাবিক চলাচল ব্যাহত হয়।

দক্ষিণাঞ্চলীয় মার্সেই শহরে বিক্ষোভকারীদের একটি দল সিটি হলের ভবনে প্রবেশ করে এবং সেখানে ভাঙচুর চালায় বলে বিভিন্ন সংবাদমাধ্যম জানিয়েছে। অন্যদিকে লিমোজ শহরে সিটি হল এবং লিওঁ শহরে পর্যটন কার্যালয়ে অগ্নিসংযোগের খবর পাওয়া গেছে।

তবে আন্দোলনে অংশ নেওয়া অনেকেই দাবি করেছেন, অধিকাংশ মানুষ শান্তিপূর্ণভাবে নিজেদের দাবি জানাচ্ছিলেন। তাঁদের অভিযোগ, কিছু উচ্ছৃঙ্খল গোষ্ঠীর সহিংস কর্মকাণ্ডের কারণে পুরো আন্দোলনকে সহিংস হিসেবে দেখা হচ্ছে।

শিক্ষার্থীদের আন্দোলন আরও বিস্তৃত হওয়ার পেছনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে ফ্রান্সের ‘ইয়েলো ভেস্ট’ আন্দোলনের সমর্থকদের অংশগ্রহণ। ২০১৮ সালে জ্বালানির মূল্য ও জীবনযাত্রার ব্যয় নিয়ে শুরু হওয়া সেই আন্দোলন একসময় প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল মাখোঁর সরকারের বিরুদ্ধে ব্যাপক অসন্তোষের প্রতীক হয়ে উঠেছিল।

এবারের আন্দোলনেও সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতা, জ্বালানির ব্যয়, অর্থনৈতিক বৈষম্য এবং সরকারি নীতির বিরুদ্ধে ক্ষোভ প্রকাশ পাচ্ছে। শিক্ষার্থীদের দাবির সঙ্গে শ্রমিক সংগঠন ও অন্যান্য গোষ্ঠীর দাবি যুক্ত হওয়ায় আন্দোলনের পরিধি আরও বড় হয়েছে।

বিশ্লেষকদের মতে, বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের অসন্তোষ একই আন্দোলনে মিলিত হওয়ায় সরকারের জন্য পরিস্থিতি সামাল দেওয়া আরও কঠিন হয়ে উঠতে পারে।

বিক্ষোভের কারণে প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল মাখোঁর সরকার নতুন করে রাজনৈতিক চাপের মুখে পড়েছে। ২০২৭ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচন সামনে রেখে দেশের অর্থনীতি, সরকারি ব্যয় এবং জনসেবার মান নিয়ে বিতর্ক আরও তীব্র হচ্ছে।

প্রধানমন্ত্রী সেবাস্তিয়ান লেকর্নু সহিংসতার নিন্দা জানিয়ে বলেছেন, সহিংসতার মাধ্যমে সরকারকে চাপে ফেলা যাবে না। অন্যদিকে প্রেসিডেন্ট মাখোঁও সহিংস কর্মকাণ্ডে জড়িতদের বিচারের আওতায় আনার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন।

সরকারের বক্তব্য, শান্তিপূর্ণভাবে প্রতিবাদ করার অধিকার থাকলেও সরকারি স্থাপনায় হামলা, অগ্নিসংযোগ ও লুটপাট কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। তবে বিক্ষোভকারীদের একাংশের অভিযোগ, তাঁদের মৌলিক দাবি পূরণে সরকার যথেষ্ট উদ্যোগ নিচ্ছে না।

বিক্ষোভ দমনে পুলিশের ব্যবহৃত শক্তি নিয়েও বিতর্ক তৈরি হয়েছে। বিভিন্ন প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, নিরাপত্তা বাহিনীর ব্যবহৃত বিস্ফোরক ও নিয়ন্ত্রণমূলক সরঞ্জামের কারণে কয়েকজন বিক্ষোভকারী গুরুতর আহত হয়েছেন। এর মধ্যে এক কিশোরের হাত গুরুতরভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার ঘটনাও আলোচনায় এসেছে।

পুলিশি বলপ্রয়োগের অভিযোগ তদন্তের দাবি জানিয়েছেন অধিকারকর্মী ও আন্দোলনকারীরা। অন্যদিকে পুলিশ সদস্যদের ওপর হামলা এবং নিরাপত্তা বাহিনীর আহত হওয়ার ঘটনাও পরিস্থিতির জটিলতা বাড়িয়েছে।

মানবাধিকার ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষার মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখা এখন ফরাসি কর্তৃপক্ষের জন্য অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ।

ChannelNRB Footer