ফ্রান্সজুড়ে জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি, শিক্ষাব্যবস্থার সংকট ও সরকারি সেবার মান নিয়ে বিক্ষোভকে কেন্দ্র করে ব্যাপক সহিংসতা ছড়িয়ে পড়েছে। শনিবার (১৭ অক্টোবর) দেশটির বিভিন্ন শহরে বিক্ষোভকারীদের সঙ্গে পুলিশের সংঘর্ষ, দোকানপাটে লুটপাট ও সরকারি স্থাপনায় অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটে। এসব ঘটনায় প্রাথমিক হিসাবে ১ হাজার ৮০০ জনের বেশি মানুষকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। পরবর্তী হালনাগাদ তথ্যে গ্রেপ্তারের সংখ্যা ২ হাজার ছাড়িয়েছে বলে জানিয়েছে দেশটির কর্তৃপক্ষ।
শনিবারের বিক্ষোভে ফ্রান্সের বিভিন্ন শহরে পাঁচ লাখের বেশি মানুষ অংশ নেন। বিক্ষোভের অনেক কর্মসূচি শান্তিপূর্ণ থাকলেও কিছু স্থানে সহিংস গোষ্ঠীর তাণ্ডবে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়। প্যারিস, মার্সেই, লিয়ঁ, বোর্দো ও লিমোজ শহরে সংঘর্ষ, ভাঙচুর এবং অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটে।
রাজধানী প্যারিসে বিক্ষোভ চলাকালে পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়েন একদল বিক্ষোভকারী। বিভিন্ন স্থানে দোকানের কাচ ভাঙচুর, যানবাহনে আগুন এবং ব্যারিকেড তৈরির ঘটনা ঘটে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পুলিশ কাঁদানে গ্যাস ব্যবহার করে।
প্যারিস পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, রাজধানী ও আশপাশের এলাকায় ৮৫৫ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। দেশটির বিভিন্ন অঞ্চলেও ব্যাপক ধরপাকড় চালানো হয়।
মার্সেই, লিয়ঁ ও বোর্দো শহরেও দোকানপাটে লুটপাট এবং সরকারি স্থাপনায় ভাঙচুরের খবর পাওয়া গেছে। সংঘর্ষের কারণে বেশ কয়েকটি এলাকায় স্বাভাবিক জীবনযাত্রা ব্যাহত হয়। ক্ষতিগ্রস্ত ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলোর আর্থিক ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ নিরূপণের কাজ চলছে।
ফ্রান্সের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলীয় লিমোজ শহরে অগ্নিসংযোগের ঘটনায় ঐতিহাসিক সিটি হলের ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। ১৯ শতকে নির্মিত ভবনটিতে আগুন লাগার পর ভবনটির একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ ধ্বংস হয়ে যায়।
শহরটির মেয়র গিয়োম গেরাঁ এ ঘটনায় ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন। তাঁর অভিযোগ, ভবনটিতে পরিকল্পিতভাবে আগুন দেওয়া হয়েছে এবং ভেতরে থাকা ব্যক্তিরা প্রাণহানির আশঙ্কায় পড়েছিলেন।
এ ছাড়া লিয়ঁ শহরে পর্যটন দপ্তরের একটি ভবনেও আগুন দেওয়ার ঘটনা ঘটেছে বলে সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে।
কর্তৃপক্ষ বলছে, সহিংসতার সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের শনাক্ত করতে তদন্ত চলছে। সরকারি সম্পত্তি ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে হামলার ঘটনায় দায়ীদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
ফ্রান্সে চলমান আন্দোলনের সূচনা হয়েছিল শিক্ষাব্যবস্থার দুরবস্থা, শিক্ষকসংকট এবং বিদ্যালয়ের পরিবেশ নিয়ে শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের অসন্তোষ থেকে। পরে আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত হয় মূল্যস্ফীতি, জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি, অর্থনৈতিক বৈষম্য এবং সরকারি সেবার মান নিয়ে জনঅসন্তোষ।
বিক্ষোভকারীদের অভিযোগ, নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য ও জ্বালানির বাড়তি দাম সাধারণ মানুষের ওপর চাপ তৈরি করছে। একই সঙ্গে শিক্ষা ও অন্যান্য জনসেবায় পর্যাপ্ত বিনিয়োগ না থাকায় পরিস্থিতি আরও কঠিন হয়ে উঠেছে।
শ্রমিক সংগঠন এবং বিভিন্ন নাগরিক গোষ্ঠীও আন্দোলনে অংশ নেয়। ২০১৮ সালে ফ্রান্সে জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধির প্রতিবাদে শুরু হওয়া ‘ইয়েলো ভেস্ট’ আন্দোলনের স্মৃতিও এবারের বিক্ষোভে ফিরে এসেছে।
তবে বিক্ষোভে অংশ নেওয়া অধিকাংশ মানুষ শান্তিপূর্ণভাবে প্রতিবাদ করলেও কিছু সহিংস গোষ্ঠী লুটপাট ও অগ্নিসংযোগে জড়িত ছিল বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
সহিংসতা নিয়ন্ত্রণে দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে পুলিশ, জেন্ডারমেরি ও অগ্নিনির্বাপণ বিভাগের শত শত সদস্য আহত হয়েছেন। ১৮ অক্টোবর প্রকাশিত হালনাগাদ তথ্যে আহতের সংখ্যা ৬০০ ছাড়ানোর কথা জানানো হয়েছে। হতাহতের সংখ্যা ও ক্ষয়ক্ষতির হিসাব এখনো পরিবর্তিত হতে পারে।
এদিকে, দক্ষিণাঞ্চলীয় সাঁত-এতিয়েন শহরে সংঘর্ষের সময় জনতা নিয়ন্ত্রণে ব্যবহৃত একটি গ্রেনেডে ১৭ বছর বয়সী এক কিশোরের ডান হাত গুরুতরভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার খবর পাওয়া গেছে। ঘটনাটি ঘিরে পুলিশের ব্যবহৃত সরঞ্জাম ও জনতা নিয়ন্ত্রণের কৌশল নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।
কর্তৃপক্ষ সহিংসতার জন্য উগ্র বামপন্থী গোষ্ঠী ও লুটপাটে অংশ নেওয়া ব্যক্তিদের দায়ী করেছে। তবে আন্দোলনকারীদের বক্তব্য, সহিংসতার ঘটনাকে কেন্দ্র করে শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদকারীদের দাবিগুলো উপেক্ষা করা উচিত নয়।
২০২৭ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচন সামনে রেখে ফ্রান্সে রাজনৈতিক উত্তেজনার মধ্যে এই সহিংসতা নতুন করে চাপ তৈরি করেছে। অর্থনৈতিক সংকট, সরকারি ঋণ, জীবনযাত্রার ব্যয় এবং জনসেবার মান নিয়ে সরকারের ওপর আগে থেকেই চাপ ছিল।
বিরোধী রাজনৈতিক নেতারা পরিস্থিতি মোকাবিলায় সরকারের ভূমিকা নিয়ে সমালোচনা করেছেন। অন্যদিকে, সরকার বলছে, সহিংসতার মাধ্যমে রাজনৈতিক দাবি আদায়ের চেষ্টা গ্রহণযোগ্য নয় এবং আইন ভঙ্গকারীদের বিচারের মুখোমুখি করা হবে।
আরও পড়ুন:







