ফিলিস্তিনের অবরুদ্ধ গাজা উপত্যকায় তীব্র খাদ্যসংকটে রয়েছেন প্রায় ১৪ লাখ মানুষ। দীর্ঘ সংঘাত, কর্মসংস্থানের অভাব, জীবিকা ধ্বংস এবং পর্যাপ্ত খাদ্য সরবরাহের সীমাবদ্ধতায় উপত্যকাটিতে মানবিক পরিস্থিতি এখনো অত্যন্ত নাজুক। এর মধ্যেই অর্থসংকটের কারণে খাদ্যসহায়তা কমানোর ঘোষণা দিয়েছে জাতিসংঘের বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচি (ডব্লিউএফপি)।
সংস্থাটির তথ্য অনুযায়ী, গাজার প্রায় ১৪ লাখ মানুষ—মোট জনসংখ্যার প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ—তীব্র খাদ্যনিরাপত্তাহীনতার সংকট বা তার চেয়েও গুরুতর পরিস্থিতিতে রয়েছেন। চলতি বছরের জুলাইয়ে প্রকাশিত জাতিসংঘ-সমর্থিত সমন্বিত খাদ্যনিরাপত্তা পর্যবেক্ষণ কাঠামোর (আইপিসি) বিশ্লেষণে এ তথ্য উঠে আসে।
সোমবার (১৯ অক্টোবর) প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, তহবিলের ঘাটতির কারণে গাজায় খাদ্যসহায়তার পরিধি কমিয়েছে ডব্লিউএফপি। এর ফলে প্রায় পাঁচ লাখ মানুষ নিয়মিত মাসিক খাদ্যসহায়তা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, বর্তমানে সংস্থাটি গাজায় প্রায় ১১ লাখ মানুষকে সহায়তা দিচ্ছে, যা গত মাসে ছিল প্রায় ১৬ লাখ। পাশাপাশি খাদ্যসহায়তার পরিমাণও কমানো হয়েছে। আগে পরিবারগুলোকে দুটি খাদ্যপ্যাকেট দেওয়া হলেও এখন দেওয়া হচ্ছে একটি। গমের আটার পরিমাণও কমানো হয়েছে।
এ ছাড়া প্রায় ৭৫ হাজার পরিবারের নগদ সহায়তা বন্ধ করা হয়েছে। কমিউনিটি রান্নাঘরের মাধ্যমে প্রতিদিন গরম খাবার বিতরণের পরিমাণও আড়াই লাখ থেকে কমিয়ে দেড় লাখে নামানো হয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
ডব্লিউএফপি জানিয়েছে, গাজা ও পশ্চিম তীরে কার্যক্রম অব্যাহত রাখতে আগামী ছয় মাসে তাদের প্রায় ৪৫০ মিলিয়ন ডলার প্রয়োজন।
জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থা (এফএও), শিশু তহবিল (ইউনিসেফ) এবং ডব্লিউএফপির জুলাই মাসের যৌথ বিশ্লেষণে বলা হয়, মানবিক সহায়তা বৃদ্ধি পাওয়ায় গাজার খাদ্যনিরাপত্তা পরিস্থিতিতে কিছুটা উন্নতি হয়েছে। তবে এ অগ্রগতি অত্যন্ত ভঙ্গুর।
আইপিসির পূর্বাভাস অনুযায়ী, ২০২৬ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত গাজার প্রায় ১৪ লাখ মানুষ তীব্র খাদ্যনিরাপত্তাহীনতার সংকট বা তার চেয়েও খারাপ পরিস্থিতিতে থাকতে পারেন। এর মধ্যে প্রায় ২ লাখ ১২ হাজার মানুষ জরুরি পর্যায়ের খাদ্যসংকটে রয়েছেন বলে জুলাইয়ে প্রকাশিত বিশ্লেষণে উল্লেখ করা হয়।
বিশেষজ্ঞদের মতে, নিয়মিত খাদ্য সরবরাহ, পুষ্টিসেবা এবং মানবিক সহায়তা অব্যাহত না থাকলে পরিস্থিতির আবারও অবনতি হতে পারে।
দীর্ঘ সংঘাতে গাজার ঘরবাড়ি, কৃষিজমি, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ও গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোর ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। বহু মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়ে অস্থায়ী আশ্রয়কেন্দ্র ও তাঁবুতে বসবাস করছেন। কর্মসংস্থান ও আয়ের সুযোগ সীমিত হয়ে পড়ায় অনেক পরিবারের পক্ষে বাজার থেকে প্রয়োজনীয় খাবার কেনাও কঠিন হয়ে উঠেছে।
জাতিসংঘের মানবিক বিষয়ক সমন্বয় দপ্তরের (ওসিএইচএ) ১৫ অক্টোবরের পরিস্থিতি প্রতিবেদনে বলা হয়, গাজায় খাদ্যসহায়তা এখনো পরিবারের ন্যূনতম চাহিদা পূরণের জন্য যথেষ্ট নয়। অর্থের অভাব, সীমিত প্রবেশপথ এবং সরবরাহসংক্রান্ত জটিলতা খাদ্য বিতরণে বাধা সৃষ্টি করছে। প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, গাজার প্রায় ৯০ শতাংশ মানুষ মানবিক খাদ্যসহায়তার ওপর নির্ভরশীল।
মানবিক সংস্থাগুলোর মতে, গাজার খাদ্যসংকট মোকাবিলায় পর্যাপ্ত অর্থায়ন নিশ্চিত করা, খাদ্য ও অন্যান্য জরুরি পণ্যের প্রবেশাধিকার বাড়ানো এবং নিয়মিত সহায়তা কার্যক্রম চালু রাখা জরুরি।
বিশেষ করে শিশু, নারী, বয়স্ক ব্যক্তি ও বাস্তুচ্যুত পরিবারগুলো খাদ্যসংকটের কারণে বেশি ঝুঁকিতে রয়েছেন। পর্যাপ্ত পুষ্টিকর খাবারের অভাব শিশুদের শারীরিক বিকাশ ও স্বাস্থ্যের ওপর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব ফেলতে পারে।
মানবিক সংস্থাগুলোর আশঙ্কা, প্রয়োজনীয় সহায়তা অব্যাহত রাখা না গেলে গাজায় সাম্প্রতিক খাদ্যনিরাপত্তা পরিস্থিতির উন্নতি দ্রুত হারিয়ে যেতে পারে। তাই জরুরি খাদ্যসহায়তার পাশাপাশি স্থানীয় বাজার, কৃষি ও জীবিকা পুনরুদ্ধারেও কার্যকর উদ্যোগ প্রয়োজন।
আরও পড়ুন:







