তুরস্ক থেকে গ্রিসে যাওয়ার পথে এজিয়ান সাগরে দুটি পৃথক নৌদুর্ঘটনায় অন্তত ১২ জন অভিবাসনপ্রত্যাশীর মৃত্যু হয়েছে। নিহতদের মধ্যে নারী ও একটি শিশুও রয়েছে। এ ঘটনায় আরও অন্তত ২২ জনকে জীবিত উদ্ধার করা হয়েছে। নিখোঁজ ব্যক্তিদের সন্ধানে উদ্ধার অভিযান চালানো হচ্ছে।
সোমবার (১৯ অক্টোবর) গ্রিসের লেসবস ও সামোস দ্বীপের কাছে এসব দুর্ঘটনা ঘটে বলে জানিয়েছে দেশটির কোস্টগার্ড। ইউরোপে প্রবেশের আশায় বিপজ্জনক সমুদ্রপথ পাড়ি দিতে গিয়ে এসব মানুষের প্রাণহানি ঘটে।
গ্রিসের লেসবস দ্বীপের দক্ষিণে একটি দ্রুতগতির নৌযানে করে অভিবাসনপ্রত্যাশীরা যাচ্ছিলেন। এ সময় গ্রিক কোস্টগার্ডের একটি টহলযানের সঙ্গে নৌযানটির সংঘর্ষ হয়। এতে নৌযানটি উল্টে গিয়ে যাত্রীরা সাগরে পড়ে যান।
কোস্টগার্ডের তথ্য অনুযায়ী, এ ঘটনায় চারজন পুরুষ, একজন নারী ও একটি শিশুর মৃত্যু হয়েছে। জীবিত উদ্ধার করা হয়েছে আরও আটজনকে। তাঁদের মধ্যে সিরীয় ও ফিলিস্তিনি নাগরিক রয়েছেন বলে প্রাথমিক প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে।
উদ্ধার হওয়া ব্যক্তিদের মধ্যে একজন ৩৭ বছর বয়সী তুর্কি নাগরিককে মানবপাচারের সন্দেহে আটক করা হয়েছে। তিনি নৌযানটির চালক ছিলেন বলে কর্তৃপক্ষের ধারণা।
গ্রিক কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, টহলযান দেখতে পেয়ে দ্রুতগতির নৌযানটি দিক পরিবর্তনের চেষ্টা করলে সংঘর্ষ ঘটে। তবে দুর্ঘটনার পূর্ণাঙ্গ পরিস্থিতি তদন্ত করে দেখা হচ্ছে।
একই দিন সামোস দ্বীপের উত্তরে আরেকটি নৌযান উল্টে ছয়জন অভিবাসনপ্রত্যাশীর মৃত্যু হয়। নিহতদের মধ্যে পাঁচজন পুরুষ ও একজন নারী রয়েছেন।
এ ঘটনায় ১৪ জনকে জীবিত উদ্ধার করা হয়েছে। উদ্ধার হওয়া ব্যক্তিদের মধ্যে একজন ইরানি নাগরিককে মানবপাচার বা যাত্রা সংগঠিত করার সন্দেহে আটক করা হয়েছে বলে সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
দ্বিতীয় দুর্ঘটনায় আরও কেউ নিখোঁজ রয়েছেন কি না, তা নিশ্চিত করতে উদ্ধার অভিযান চালানো হয়। প্রাথমিকভাবে নৌযানটিতে থাকা মানুষের সংখ্যা সম্পর্কে বেঁচে ফেরা ব্যক্তিদের দেওয়া তথ্যে অসংগতি থাকায় পরিস্থিতি যাচাই করা হচ্ছিল।
দুটি দুর্ঘটনার পর গ্রিসের সামুদ্রিক বিষয়ক মন্ত্রী ভাসিলিস কিকিলিয়াস শোক প্রকাশ করেছেন। তিনি মানবপাচারকারীদের কর্মকাণ্ডের সমালোচনা করে এ ধরনের অপরাধের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার কথা জানিয়েছেন।
গ্রিক কর্তৃপক্ষের অভিযোগ, মানবপাচারকারীরা অতিরিক্ত যাত্রীবোঝাই এবং অনিরাপদ নৌযানে করে অভিবাসনপ্রত্যাশীদের সমুদ্রপথে নিয়ে যায়। এতে যাত্রীদের জীবন মারাত্মক ঝুঁকির মুখে পড়ে।
তবে দুটি দুর্ঘটনার সুনির্দিষ্ট কারণ ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের ভূমিকা নিয়ে তদন্ত চলছে।
গ্রিস ইউরোপীয় ইউনিয়নে প্রবেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রবেশপথ। মধ্যপ্রাচ্য, এশিয়া ও আফ্রিকার বিভিন্ন দেশ থেকে সংঘাত, দারিদ্র্য ও অনিশ্চয়তা থেকে বাঁচতে বহু মানুষ তুরস্ক হয়ে গ্রিসে পৌঁছানোর চেষ্টা করেন।
এজিয়ান সাগরে তুরস্কের উপকূল থেকে গ্রিসের কাছাকাছি দ্বীপগুলোতে পৌঁছানোর পথ তুলনামূলক ছোট হলেও উত্তাল সমুদ্র, অনিরাপদ নৌযান এবং মানবপাচারকারীদের ওপর নির্ভরতার কারণে এ যাত্রা প্রাণঘাতী হয়ে উঠতে পারে।
ইউরোপীয় সীমান্ত ও উপকূলরক্ষী সংস্থা ফ্রন্টেক্সের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের প্রথম নয় মাসে ইউরোপীয় ইউনিয়নের ২৭টি দেশে অনিয়মিত সীমান্ত অতিক্রমের ঘটনা আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় প্রায় এক-তৃতীয়াংশ কমেছে। তবে পূর্ব ভূমধ্যসাগরীয় পথটি এখনো অভিবাসনপ্রত্যাশীদের অন্যতম ব্যস্ত রুট।
অন্যদিকে, আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থার (আইওএম) তথ্য উদ্ধৃত করে ইউরোনিউজ জানিয়েছে, ২০২৬ সালের শুরু থেকে ভূমধ্যসাগরে অন্তত ১ হাজার ২০৯ জন অভিবাসনপ্রত্যাশী মারা গেছেন বা নিখোঁজ হয়েছেন।
মানবাধিকার ও অভিবাসনবিষয়ক সংস্থাগুলো দীর্ঘদিন ধরে নিরাপদ অভিবাসনপথ নিশ্চিত করা এবং মানবপাচার প্রতিরোধের ওপর গুরুত্ব দিয়ে আসছে। সাম্প্রতিক এই দুই দুর্ঘটনা আবারও বিপজ্জনক সমুদ্রপথে অভিবাসনপ্রত্যাশীদের জীবনহানির ঝুঁকিকে সামনে নিয়ে এসেছে।
আরও পড়ুন:







