News Ticker
221.png

জ্বালানির দামে ক্ষোভ, ইউরোপে বাড়ছে কট্টর ডানপন্থীদের সমর্থন

অনলাইন ডেস্ক

প্রকাশিত: ২০ অক্টোবর, ২০২৬ ১৮:১৩

আপডেট: ২০ অক্টোবর, ২০২৬ ২১:৪৭

শেয়ার

শেয়ার

জ্বালানির দামে ক্ষোভ, ইউরোপে বাড়ছে কট্টর ডানপন্থীদের সমর্থন
ছবি: সংগৃহীত

ইউরোপজুড়ে জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি ও জীবনযাত্রার ব্যয় নিয়ে সাধারণ মানুষের ক্ষোভ ক্রমেই বাড়ছে। এই অসন্তোষকে কেন্দ্র করে ফ্রান্স, জার্মানি, ইতালি ও পোল্যান্ডসহ বিভিন্ন দেশে কট্টর ডানপন্থী রাজনৈতিক দলগুলো নতুন করে সমর্থন বাড়ানোর সুযোগ পাচ্ছে। আগামী বছরের গুরুত্বপূর্ণ নির্বাচন সামনে রেখে অর্থনৈতিক সংকট ইউরোপের রাজনৈতিক সমীকরণেও প্রভাব ফেলতে শুরু করেছে।

জ্বালানি তেলের উচ্চমূল্য পরিবার ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের ব্যয় বাড়িয়ে দিয়েছে। মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি বজায় রাখা এবং সরকারি ব্যয় সামলানোর চাপে থাকা ইউরোপীয় সরকারগুলোর জন্য পরিস্থিতি আরও কঠিন হয়ে উঠেছে। এর মধ্যে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের যুদ্ধের কারণে জ্বালানি বাজারে সৃষ্ট অস্থিরতা সংকটকে আরও গভীর করেছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

ইউরোপের বিভিন্ন দেশে পেট্রল, ডিজেল ও অন্যান্য জ্বালানির বাড়তি দাম সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবনকে প্রভাবিত করছে। বিশেষ করে গ্রামীণ অঞ্চলের বাসিন্দা, কৃষক, পরিবহনকর্মী এবং ব্যক্তিগত গাড়ির ওপর নির্ভরশীল মানুষের ব্যয় বেড়েছে।

জ্বালানির খরচ বাড়ার প্রভাব পড়ছে পণ্য পরিবহন, কৃষি উৎপাদন এবং নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দামেও। ফলে শুধু গাড়িচালক বা কৃষকরাই নন, সামগ্রিকভাবে নিম্ন ও মধ্য আয়ের পরিবারগুলোও আর্থিক চাপের মুখে পড়ছে।

এই পরিস্থিতিতে সরকারের অর্থনৈতিক নীতি, করব্যবস্থা এবং জ্বালানির দাম নিয়ন্ত্রণে নেওয়া পদক্ষেপ নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন অনেক নাগরিক। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, অর্থনৈতিক নিরাপত্তাহীনতা ও প্রচলিত রাজনৈতিক নেতৃত্বের প্রতি অনাস্থা বিকল্প রাজনৈতিক শক্তির জন্য সমর্থন তৈরির ক্ষেত্র তৈরি করছে।

ফ্রান্সে জীবনযাত্রার ব্যয়, জ্বালানির মূল্য এবং সরকারি সেবার মান নিয়ে অসন্তোষের মধ্যে বিক্ষোভ তীব্র হয়েছে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের অবকাঠামো ও সুযোগ-সুবিধা নিয়ে শুরু হওয়া আন্দোলনে শিক্ষার্থী, শ্রমিক, কৃষক ও অন্যান্য শ্রেণি-পেশার মানুষও যুক্ত হয়েছেন।

বিক্ষোভের কিছু অংশে সহিংসতা, অগ্নিসংযোগ ও লুটপাটের ঘটনা ঘটেছে। এতে নিরাপত্তা পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ বাড়ার পাশাপাশি সরকারের ওপর চাপও বৃদ্ধি পেয়েছে।

এই পরিস্থিতিতে ফ্রান্সের কট্টর ডানপন্থী দল ন্যাশনাল র‍্যালি এবং দলটির নেত্রী মেরিন লে পেন অর্থনৈতিক অসন্তোষ ও আইনশৃঙ্খলা নিয়ে উদ্বেগকে রাজনৈতিক আলোচনার কেন্দ্রে নিয়ে আসছেন। জ্বালানির দাম কমানো এবং সরকারের নীতির সমালোচনাকে গুরুত্ব দিয়ে তাঁরা ভোটারদের সমর্থন আদায়ের চেষ্টা করছেন।

তবে বিক্ষোভে অংশ নেওয়া সবাই যে কট্টর ডানপন্থী দলগুলোর সমর্থক, এমন কোনো প্রমাণ নেই। জীবনযাত্রার ব্যয়, শিক্ষাব্যবস্থা ও সরকারি সেবা নিয়ে আন্দোলনকারীদের দাবিও এক নয়।

জার্মানিতে কট্টর ডানপন্থী দল অল্টারনেটিভ ফর জার্মানি (এএফডি) জ্বালানি সংকট ও জীবনযাত্রার ব্যয়কে রাজনৈতিক প্রচারের গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হিসেবে তুলে ধরছে।

দলটি উচ্চ জ্বালানিমূল্য ও সরকারের অর্থনৈতিক নীতির সমালোচনা করছে। পাশাপাশি রাশিয়া থেকে আবারও গ্যাস আমদানির পক্ষে অবস্থান নিয়ে দেশটির জ্বালানি নিরাপত্তা ও সরবরাহব্যবস্থা নিয়ে বিতর্ককে সামনে এনেছে।

ইউরোপীয় সংবাদমাধ্যম ইউরোনিউজের সেপ্টেম্বরের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছিল, জ্বালানি সংকটের মধ্যে জার্মানির কয়েকটি আঞ্চলিক নির্বাচনে এএফডির অগ্রগতি দেশটির প্রচলিত রাজনৈতিক দলগুলোর জন্য নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে।

জ্বালানির দাম, অভিবাসন, অর্থনৈতিক নীতি এবং ইউরোপীয় ইউনিয়নের বিভিন্ন সিদ্ধান্ত নিয়ে অসন্তোষকে একত্র করে দলটি সমর্থন বাড়ানোর চেষ্টা করছে। তবে জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধিই দলটির সমর্থন বৃদ্ধির একমাত্র কারণ নয়।

ইতালিতে জ্বালানি ও উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধির কারণে কৃষকসহ বিভিন্ন পেশার মানুষ প্রতিবাদে অংশ নিচ্ছেন। রয়টার্সের প্রতিবেদনে দক্ষিণ ইতালির সিসিলি অঞ্চলের গেলা শহরে কৃষকদের ট্র্যাক্টর নিয়ে প্রতিবাদের কথা উল্লেখ করা হয়েছে।

কৃষকদের উদ্বেগের মধ্যে রয়েছে উৎপাদন খরচ, পরিবহন ব্যয় এবং পণ্যের বাজারমূল্য। এসব সমস্যার সমাধানে সরকারের পদক্ষেপ নিয়ে অসন্তোষ রাজনৈতিক আলোচনাতেও প্রভাব ফেলছে।

অন্যদিকে পোল্যান্ডেও আগামী বছরের নির্বাচন সামনে রেখে জ্বালানি ব্যয় ও অর্থনৈতিক নীতি গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক ইস্যু হয়ে উঠতে পারে। কট্টর ডানপন্থী ও জাতীয়তাবাদী দলগুলো জ্বালানি নিরাপত্তা, কর এবং ইউরোপীয় নীতির সমালোচনাকে নিজেদের রাজনৈতিক অবস্থান জোরদার করার উপায় হিসেবে ব্যবহার করছে।

তবে দেশভেদে রাজনৈতিক পরিস্থিতি, নির্বাচনী প্রতিযোগিতা এবং ভোটারদের উদ্বেগের ধরন আলাদা। ফলে ইউরোপের সব দেশে একই ধরনের রাজনৈতিক পরিবর্তন ঘটছে—এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর সুযোগ নেই।

বিশ্লেষকদের মতে, ইউরোপে কট্টর ডানপন্থী রাজনীতির প্রতি সমর্থন বাড়ার পেছনে কয়েকটি বিষয় একসঙ্গে কাজ করছে।

প্রথমত, জ্বালানি ও নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের মূল্যবৃদ্ধি সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতা কমিয়ে দিচ্ছে। দ্বিতীয়ত, অনেক ভোটারের মধ্যে প্রচলিত রাজনৈতিক দলগুলোর প্রতি অনাস্থা রয়েছে। তৃতীয়ত, অভিবাসন, জাতীয় পরিচয়, নিরাপত্তা এবং ইউরোপীয় ইউনিয়নের নীতি নিয়ে বিতর্ক রাজনৈতিক বিভাজনকে আরও তীব্র করছে।

কট্টর ডানপন্থী দলগুলো সাধারণত জাতীয় স্বার্থ, সীমান্ত নিয়ন্ত্রণ, কঠোর অভিবাসননীতি এবং প্রচলিত রাজনৈতিক ব্যবস্থার পরিবর্তনের প্রতিশ্রুতি দিয়ে থাকে। অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তার সময়ে এসব বার্তা কিছু ভোটারের কাছে আকর্ষণীয় হয়ে উঠতে পারে।

যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান গ্যালাপের ২০২৬ সালের জুনে প্রকাশিত বিশ্লেষণেও ইউরোপে অর্থনৈতিক দুরবস্থা ও রাজনৈতিক মেরুকরণের মধ্যে সম্পর্কের ইঙ্গিত পাওয়া যায়। ইউরোপীয় ইউনিয়নের ২২টি সদস্যদেশ ও যুক্তরাজ্যের তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, আর্থিক কষ্টের অভিজ্ঞতা রাজনৈতিক বাম ও ডান—উভয় প্রান্তের দলের সমর্থকদের মধ্যে তুলনামূলক বেশি। বিশেষ করে কট্টর ডানপন্থী সমর্থকদের মধ্যে এ ধরনের কষ্টের অভিজ্ঞতা উল্লেখযোগ্য।

তবে অর্থনৈতিক দুরবস্থা থেকে সরাসরি কোনো নির্দিষ্ট রাজনৈতিক দলের প্রতি সমর্থন তৈরি হয়—এমন সরল সম্পর্ক প্রতিষ্ঠা করা যায় না।

জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি মোকাবিলায় ইউরোপের বিভিন্ন সরকার করছাড়, আর্থিক সহায়তা এবং জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করার মতো পদক্ষেপ বিবেচনা করছে বা বাস্তবায়ন করছে। কিন্তু দীর্ঘমেয়াদি ভর্তুকির ব্যয়, সরকারি বাজেটের সীমাবদ্ধতা এবং জ্বালানি বাজারের অনিশ্চয়তার কারণে সব দেশের পক্ষে সমানভাবে সহায়তা দেওয়া কঠিন।

জার্মানিতে জ্বালানির ওপর কর কমানোর পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। ফ্রান্সেও জ্বালানি সরবরাহ ও মূল্য পরিস্থিতি নিয়ে সরকারের তৎপরতা বেড়েছে। তারপরও সাধারণ মানুষের ব্যয়ের চাপ কতটা কমবে, তা নির্ভর করছে আন্তর্জাতিক বাজার, সরবরাহব্যবস্থা এবং সরকারি পদক্ষেপের কার্যকারিতার ওপর।

একই সঙ্গে সরকারগুলোকে শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভের অধিকার নিশ্চিত করা এবং সহিংসতা নিয়ন্ত্রণের মধ্যে ভারসাম্য রাখতে হচ্ছে।

আগামী বছরের নির্বাচনগুলোতে জ্বালানির দাম, মূল্যস্ফীতি, কর্মসংস্থান এবং জীবনযাত্রার ব্যয় গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু হয়ে উঠতে পারে। এসব বিষয়ে সরকারগুলোর সাফল্য বা ব্যর্থতা ভোটারদের সিদ্ধান্তে প্রভাব ফেলতে পারে।

কট্টর ডানপন্থী দলগুলো বর্তমান অসন্তোষকে নির্বাচনী সমর্থনে রূপান্তর করতে পারবে কি না, তা নির্ভর করবে তাদের অর্থনৈতিক প্রস্তাব, রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বীদের অবস্থান এবং ভোটারদের অগ্রাধিকারের ওপর।

একই সঙ্গে জ্বালানির দাম স্থিতিশীল করা, পরিবারের ক্রয়ক্ষমতা রক্ষা এবং সরকারি সেবার মান উন্নত করতে পারলে প্রচলিত রাজনৈতিক দলগুলোও জনসমর্থন পুনরুদ্ধারের সুযোগ পেতে পারে।

সব মিলিয়ে ইউরোপে জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি এখন আর কেবল অর্থনৈতিক সমস্যা নয়; এটি সামাজিক অসন্তোষ ও রাজনৈতিক প্রতিযোগিতারও গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে উঠেছে। এই সংকট আগামী দিনের ইউরোপীয় রাজনীতিতে কতটা পরিবর্তন আনবে, তা নির্ধারণে আসন্ন নির্বাচনগুলো গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।

ChannelNRB Footer