সুদানে চলমান গৃহযুদ্ধের মধ্যে ড্রোন হামলা ভয়াবহ রূপ নিয়েছে। গত কয়েক দিনে দেশটির বিভিন্ন এলাকায় ধারাবাহিক ড্রোন হামলায় ১৬০ জনের বেশি মানুষ নিহত হয়েছেন। নিহতদের মধ্যে নারী, শিশু ও বাস্তুচ্যুত বেসামরিক মানুষ রয়েছেন। সংঘাতের দুই পক্ষের পাল্টাপাল্টি হামলায় সাধারণ মানুষের প্রাণহানি বাড়তে থাকায় দেশটির মানবিক পরিস্থিতি নিয়ে গভীর উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
১৯ অক্টোবরের প্রতিবেদন অনুযায়ী, সুদানের পশ্চিমাঞ্চলসহ বিভিন্ন এলাকায় সাম্প্রতিক হামলায় ১৬০ জনের বেশি মানুষের মৃত্যু হয়েছে। দেশটির সেনাবাহিনী ও আধাসামরিক বাহিনী র্যাপিড সাপোর্ট ফোর্সেসের (আরএসএফ) মধ্যে চলমান সংঘাতের প্রেক্ষাপটে এসব হামলার ঘটনা ঘটেছে। উভয় পক্ষের বিরুদ্ধে বেসামরিক মানুষের প্রাণহানির অভিযোগ উঠেছে।
সাম্প্রতিক হামলাগুলোর মধ্যে সবচেয়ে প্রাণঘাতী ঘটনাটি ঘটে পশ্চিম কোরদোফান অঞ্চলের আল-দিবাব এলাকায়। রোববার সন্ধ্যায় বাজার থেকে বাড়ি ফেরার জন্য পরিবহনের অপেক্ষায় থাকা মানুষের জমায়েতে ড্রোন হামলা চালানো হয়। স্থানীয় বাসিন্দা ও চিকিৎসাকর্মীদের বরাতে এ ঘটনায় অন্তত ৮০ জন নিহত হওয়ার খবর পাওয়া গেছে।
হামলায় আহত ৪৭ জনকে পাশের আল-মুজলাদ শহরে নেওয়া হয়। চিকিৎসাসংশ্লিষ্ট একটি সূত্রের বরাতে জানা গেছে, আহতদের মধ্যে আরও ৩০ জন পরে মারা যান। হামলার জন্য সুদানের সেনাবাহিনীকে দায়ী করেছে আরএসএফ-নিয়ন্ত্রিত প্রশাসন ও অধিকারকর্মীরা। তবে ঘটনার দায় স্বাধীনভাবে নিশ্চিত করা যায়নি।
সুদানের রাজধানী খার্তুমেও ড্রোন হামলায় প্রাণহানির ঘটনা ঘটেছে। সোমবার বিমানবন্দরের পূর্বদিকে ইমতিদাদ নাসের এলাকায় একটি হামলায় দুই, চার ও ছয় বছর বয়সী তিন শিশু নিহত হয় বলে জানিয়েছে বেসামরিক মানুষের ওপর সহিংসতা পর্যবেক্ষণকারী সংগঠন ইমার্জেন্সি লইয়ার্স।
এ ছাড়া দক্ষিণ দারফুরের রাজধানী নিয়ালায় ড্রোন হামলায় ১৭ জন নিহত হওয়ার খবর পাওয়া গেছে। চিকিৎসা ও আরএসএফ-সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, নিহতদের মধ্যে সাতজন আরএসএফ কর্মকর্তা রয়েছেন। হামলায় আরও ২৩ জন আহত হন।
সুদানের নীল নদের নীলাভ অঞ্চলে বাস্তুচ্যুত মানুষের একটি জমায়েতে শুক্রবারের ড্রোন হামলায় ৪১ জন নিহত হয়েছেন বলে জানিয়েছে ইমার্জেন্সি লইয়ার্স। এসব ঘটনায় সংঘাতকবলিত মানুষের নিরাপত্তা, আশ্রয় ও জরুরি চিকিৎসাসেবা নিয়ে উদ্বেগ আরও বেড়েছে।
জাতিসংঘও সাম্প্রতিক প্রাণঘাতী ড্রোন হামলার ঘটনায় উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। সংস্থাটি বলেছে, এসব হামলায় শিশুদেরসহ বেসামরিক মানুষ নিহত হচ্ছেন এবং গুরুত্বপূর্ণ পরিষেবা ব্যাহত হচ্ছে।
সুদানের সেনাবাহিনী ও আধাসামরিক বাহিনী আরএসএফের মধ্যে ২০২৩ সালের এপ্রিল থেকে সংঘাত চলছে। সেনাপ্রধান আবদেল ফাত্তাহ আল-বুরহান ও আরএসএফ নেতা মোহাম্মদ হামদান দাগালোর মধ্যে ক্ষমতার দ্বন্দ্ব এবং আরএসএফকে সেনাবাহিনীতে অন্তর্ভুক্ত করার পরিকল্পনা নিয়ে বিরোধ থেকে এ সংঘাতের সূত্রপাত হয়।
দীর্ঘস্থায়ী এ যুদ্ধে হাজার হাজার মানুষ নিহত হয়েছেন এবং লাখ লাখ মানুষ ঘরবাড়ি ছেড়ে পালাতে বাধ্য হয়েছেন। জাতিসংঘের হিসাব অনুযায়ী, দেশটিতে প্রায় ১ কোটি ৩০ লাখ মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছেন। এ ছাড়া ২০২৬ সালে প্রায় ৩ কোটি ৩৭ লাখ মানুষের জরুরি মানবিক সহায়তা প্রয়োজন বলে জানিয়েছে জাতিসংঘ।
সুদানে ড্রোনের ক্রমবর্ধমান ব্যবহার বেসামরিক মানুষের জন্য নতুন বিপদ তৈরি করেছে। চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসেই দেশটিতে ড্রোন হামলায় এক হাজারের বেশি বেসামরিক মানুষের মৃত্যুর তথ্য জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদে তুলে ধরা হয়েছে বলে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, সংঘাতের পক্ষগুলো সামরিকভাবে নিজেদের অবস্থান শক্তিশালী করার চেষ্টা চালিয়ে গেলে সাধারণ মানুষের দুর্ভোগ আরও বাড়তে পারে। বেসামরিক মানুষের সুরক্ষা নিশ্চিত করা, মানবিক সহায়তা পৌঁছানোর সুযোগ তৈরি করা এবং কার্যকর যুদ্ধবিরতি প্রতিষ্ঠা এখন সুদানের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ।
আরও পড়ুন:







