ইয়েমেনের দক্ষিণাঞ্চলে সরকারি বাহিনীর একটি প্রশিক্ষণ শিবিরে হুথি বিদ্রোহীদের ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় অন্তত ৫৮ জন নিহত হয়েছেন। এ ঘটনায় আহত হয়েছেন দুই শতাধিক মানুষ। সোমবার (১৯ অক্টোবর) দেশটির শাবওয়া প্রদেশের আল-আলাম প্রশিক্ষণ শিবিরে এ হামলার ঘটনা ঘটে। তবে মঙ্গলবার প্রকাশিত সর্বশেষ প্রতিবেদনে নিহতের সংখ্যা বেড়ে ৭৩।
স্থানীয় কর্তৃপক্ষের বরাতে বার্তা সংস্থা রয়টার্স জানায়, হামলায় তিনটি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করা হয়। প্রশিক্ষণ কার্যক্রমের অংশ হিসেবে নতুন নিয়োগ পাওয়া সদস্যরা যখন মাঠে সারিবদ্ধ হচ্ছিলেন, তখন ক্ষেপণাস্ত্রগুলো শিবিরে আঘাত হানে। বিস্ফোরণে ঘটনাস্থলে ব্যাপক হতাহতের ঘটনা ঘটে।
শাবওয়া প্রদেশের গভর্নর আওয়াদ আল-ওয়াজির জানান, হামলার পর আহতদের বিভিন্ন হাসপাতালে নেওয়া হয়। তাঁদের মধ্যে কয়েকজনের অবস্থা গুরুতর। হামলার পর অন্তত ১৪ জন নিখোঁজ থাকার কথাও প্রাথমিকভাবে জানিয়েছিল স্থানীয় প্রশাসন।
স্থানীয় প্রশাসনের তথ্য অনুযায়ী, নিহতদের অধিকাংশই নতুন নিয়োগ পাওয়া তরুণ সদস্য। তাঁদের বয়স ১৮ থেকে ২০ বছরের মধ্যে বলে জানিয়েছেন গভর্নর আওয়াদ আল-ওয়াজির।
কর্তৃপক্ষের দাবি, এসব সদস্যকে সম্মুখযুদ্ধে অংশ নেওয়ার জন্য নয়, বরং শাবওয়া প্রদেশের স্থানীয় নিরাপত্তা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছিল। প্রশিক্ষণ চলাকালে হামলা হওয়ায় তাঁরা আত্মরক্ষার পর্যাপ্ত সুযোগ পাননি।
হামলার পর আহতদের দ্রুত হাসপাতালে নেওয়া হয়। গুরুতর আহত কয়েকজনকে উন্নত চিকিৎসার জন্য অন্য প্রদেশের হাসপাতালে স্থানান্তর করা হয়েছে বলে কর্মকর্তারা জানিয়েছেন। হতাহতের সংখ্যা আরও বাড়তে পারে বলে প্রাথমিকভাবে আশঙ্কা করা হয়েছিল।
ইয়েমেনের হুথি আন্দোলনের সামরিক মুখপাত্র ইয়াহিয়া সারি হামলার দায় স্বীকার করেছেন। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, শিবিরটি সৌদি বাহিনী পরিচালিত একটি সামরিক স্থাপনা ছিল। তবে হুথিদের এই দাবির বিষয়ে সৌদি কর্তৃপক্ষ তাৎক্ষণিকভাবে কোনো মন্তব্য করেনি।
অন্যদিকে, আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত ইয়েমেন সরকার ও স্থানীয় কর্তৃপক্ষের বক্তব্য, শিবিরটিতে প্রাদেশিক নিরাপত্তার দায়িত্ব পালনের জন্য নতুন সদস্যদের প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছিল।
হামলাটি এমন এক সময়ে ঘটল, যখন ইয়েমেনের বিভিন্ন এলাকায় সরকারি বাহিনী ও হুথিদের মধ্যে সংঘর্ষ নতুন করে তীব্র হয়েছে। ফলে এই হামলা দেশটির নিরাপত্তা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
ইয়েমেনের দক্ষিণাঞ্চলে অবস্থিত শাবওয়া জ্বালানি সম্পদসমৃদ্ধ একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রদেশ। এখানে দেশটির উল্লেখযোগ্য তেল ও গ্যাসসম্পদ এবং বালহাফ তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস স্থাপনা অবস্থিত।
প্রদেশটির অবস্থান এবং বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ সরবরাহপথের কারণে সরকারি বাহিনী ও হুথিদের সংঘাতে এলাকাটি কৌশলগত গুরুত্ব বহন করে। সাম্প্রতিক সময়ে বাব আল-মান্দেব প্রণালির আশপাশের এলাকাগুলো নিয়েও উত্তেজনা বেড়েছে। লোহিত সাগর ও এডেন উপসাগরের সংযোগস্থলে অবস্থিত এই প্রণালি আন্তর্জাতিক নৌবাণিজ্যের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
২০১৪ সালে রাজধানী সানা দখলের মধ্য দিয়ে ইয়েমেনে হুথিদের উত্থান এবং গৃহযুদ্ধের নতুন পর্যায় শুরু হয়। পরের বছর সৌদি নেতৃত্বাধীন সামরিক জোট ইয়েমেনের আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত সরকারকে সমর্থন দিতে সামরিক হস্তক্ষেপ করে।
২০২২ সালে জাতিসংঘের মধ্যস্থতায় যুদ্ধবিরতি কার্যকর হওয়ার পর সংঘাতের তীব্রতা অনেকটা কমেছিল। তবে চলতি বছর নতুন করে সংঘর্ষ বেড়েছে। সরকারি বাহিনী ও হুথিদের পাল্টাপাল্টি সামরিক অভিযান দেশটির বিভিন্ন অঞ্চলে নিরাপত্তা পরিস্থিতির অবনতি ঘটিয়েছে।
দীর্ঘস্থায়ী সংঘাতের কারণে ইয়েমেনে খাদ্যসংকট, বাস্তুচ্যুতি, স্বাস্থ্যসেবার ঘাটতি এবং মানবিক সহায়তার প্রয়োজন বেড়েই চলেছে। নতুন করে বড় ধরনের সামরিক সংঘর্ষ শুরু হলে সাধারণ মানুষের দুর্ভোগ আরও বাড়তে পারে।
আল-আলাম প্রশিক্ষণ শিবিরে হামলার ঘটনায় বিপুলসংখ্যক মানুষের প্রাণহানি ইয়েমেনের সংঘাতের ভয়াবহতা আবারও সামনে এনেছে। বিশেষ করে প্রশিক্ষণরত তরুণদের ব্যাপক প্রাণহানি এবং দুই শতাধিক মানুষের আহত হওয়ার ঘটনা পরিস্থিতির গুরুত্ব বাড়িয়েছে।
আরও পড়ুন:







