News Ticker
221.png

সকালে শুধু চা আর রুটি খেয়ে দিন পার করছে গাজার শিশুরা

অনলাইন ডেস্ক

প্রকাশিত: ২১ অক্টোবর, ২০২৬ ১৬:৩৩

শেয়ার

শেয়ার

সকালে শুধু চা আর রুটি খেয়ে দিন পার করছে গাজার শিশুরা
ছবি: সংগৃহীত

ফিলিস্তিনের অবরুদ্ধ গাজা উপত্যকায় খাদ্যসংকট আরও তীব্র হয়ে উঠেছে। খাদ্যপণ্যের দাম বৃদ্ধি, বাজারে প্রয়োজনীয় পণ্যের ঘাটতি এবং মানবিক সহায়তা কমে যাওয়ায় শিশুদের পুষ্টিকর খাবার জোগাতে হিমশিম খাচ্ছেন অভিভাবকেরা। অনেক পরিবারে সকালের নাশতায় শিশুদের জন্য থাকছে শুধু চা আর রুটি। দুধ, ডিম, মাংস ও তাজা শাকসবজির মতো প্রয়োজনীয় খাবার নিয়মিত জোগাড় করতে পারছেন না তাঁরা।

বুধবার (২১ অক্টোবর) প্রকাশিত আল-জাজিরার এক প্রতিবেদনে গাজার কয়েকটি পরিবারের এমন দুরবস্থার চিত্র উঠে এসেছে। দীর্ঘ সংঘাত, বাস্তুচ্যুতি ও অর্থনৈতিক বিপর্যয়ের মধ্যে নতুন করে খাদ্য সরবরাহে বিঘ্ন দেখা দেওয়ায় পরিবারগুলোর সংকট আরও বেড়েছে।

গাজা সিটির পশ্চিমাঞ্চলে তাঁবুতে বসবাস করছেন ৩০ বছর বয়সী হুদা আবু লায়লা। তাঁর পাঁচ মেয়ের বয়স ১৮ মাস থেকে ১০ বছরের মধ্যে। পরিবারের উপার্জন সীমিত হওয়ায় সন্তানদের জন্য পুষ্টিকর খাবার সংগ্রহ করা তাঁর জন্য ক্রমেই কঠিন হয়ে পড়ছে।

হুদার স্বামী যুদ্ধের সময় আহত হওয়ার পর আর কাজ করতে পারছেন না। অন্যের জন্য রুটি তৈরি করে সামান্য আয় করেন তিনি। সেই অর্থ দিয়ে পরিবারের প্রয়োজনীয় খাবার কেনার চেষ্টা করেন। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে বাজারে পণ্যের ঘাটতি ও মূল্যবৃদ্ধির কারণে ডিম ও দুধের মতো খাবার কেনা কঠিন হয়ে পড়েছে।

পরিস্থিতির চাপে চলতি সপ্তাহে মেয়েদের সকালের নাশতায় শুধু চা আর রুটি দিতে হয়েছে তাঁকে। কখনো পরিবারের খাবারে থাকে টিনজাত শিম, স্থানীয় মসলা কিংবা জায়তার নামের একটি মসলা-মিশ্রণ। কিন্তু প্রতিদিন পর্যাপ্ত ও সুষম খাবার নিশ্চিত করা সম্ভব হচ্ছে না।

হুদার উদ্বেগ, দীর্ঘদিন পুষ্টিকর খাবারের অভাবে তাঁর সন্তানদের শারীরিক বৃদ্ধি ও স্বাস্থ্যের ক্ষতি হতে পারে। ইতিমধ্যে মেয়েদের মধ্যে ক্লান্তি, মাথা ঘোরা ও মনোযোগের ঘাটতি দেখা দেওয়ার কথাও জানিয়েছেন তিনি।

গাজার আরেক বাস্তুচ্যুত বাসিন্দা ৪০ বছর বয়সী রাইদা সোবোহ তাঁর নয় সদস্যের পরিবারের খাবার জোগাড় করতে দীর্ঘদিন ধরে হিমশিম খাচ্ছেন। তাঁর পরিবার বেশ কয়েক মাস ধরে কমিউনিটি রান্নাঘর বা স্থানীয়ভাবে পরিচিত ‘তাকিয়া’র খাবারের ওপর নির্ভর করছে।

পরিবারের শিশুরা সাধারণত সকালে চা পান করে। দুপুরে রান্নাঘর থেকে খাবার পেলে তা খায়। রাতে কখনো ফালাফেল, ভাত, ডাল কিংবা পাস্তা জোটে। তবে তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, প্রায় আট মাস ধরে পরিবারের খাদ্যতালিকা থেকে দুধ, মাংস, ডিম ও পনির প্রায় পুরোপুরি বাদ পড়েছে। প্রায় এক মাস ধরে সবজিও কেনা হয়নি।

পরিবারগুলোর এমন অভিজ্ঞতা গাজায় শিশুদের পুষ্টি ও স্বাস্থ্যের অবনতি নিয়ে উদ্বেগ বাড়াচ্ছে। শুধু খাবারের পরিমাণ নয়, খাবারের বৈচিত্র্য ও পুষ্টিমানও শিশুদের স্বাভাবিক বেড়ে ওঠার জন্য গুরুত্বপূর্ণ।

আল-জাজিরার প্রতিবেদন অনুযায়ী, চলতি মাসের ১৪ অক্টোবর ইসরায়েল গাজায় বাণিজ্যিক পণ্য প্রবেশ বন্ধ করে দেয়। স্থানীয় ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে অর্থ আদায় নিয়ে বিরোধের কারণে এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়। এতে আগে থেকেই সংকটে থাকা বাজারে খাদ্যসহ প্রয়োজনীয় পণ্যের সরবরাহ ব্যাহত হয়।

পরে ১৯ অক্টোবর ইসরায়েলি কর্তৃপক্ষ বাণিজ্যিক পণ্য প্রবেশ ধীরে ধীরে পুনরায় চালুর ঘোষণা দেয়। তবে সরবরাহ স্বাভাবিক হতে সময় লাগতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন স্থানীয় বাসিন্দারা।

বাজারে পণ্য পাওয়া গেলেও অনেক পরিবারের ক্রয়ক্ষমতা নেই। আল-জাজিরার প্রতিবেদনে হুদা জানান, গাজায় প্রতি কেজি পেঁয়াজের দাম প্রায় ১০ ইসরায়েলি শেকেল এবং টমেটোর দাম ১০ থেকে ১৫ শেকেলের মধ্যে। ফলে সীমিত আয়ের পরিবারগুলো প্রয়োজনীয় সবজি কেনার ক্ষেত্রেও হিসাব করে চলতে বাধ্য হচ্ছে।

গাজার খাদ্যসংকটের মধ্যে জাতিসংঘের বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচি (ডব্লিউএফপি) অর্থের ঘাটতির কারণে সহায়তা কমানোর ঘোষণা দিয়েছে।

সংস্থাটির ১৯ অক্টোবরের তথ্য অনুযায়ী, গাজায় মাসিক খাদ্যসহায়তা পাওয়া মানুষের সংখ্যা ১৬ লাখ থেকে কমিয়ে ১১ লাখ করা হয়েছে। অর্থাৎ প্রায় পাঁচ লাখ মানুষ এই মাসে আগের মতো নিয়মিত মাসিক খাদ্যসহায়তা পাচ্ছেন না।

এ ছাড়া খাদ্যসামগ্রীর রেশন অর্ধেক করা হয়েছে। ৭৫ হাজার পরিবারের নগদ সহায়তা বন্ধ করা হয়েছে এবং প্রতিদিন গরম খাবার সরবরাহের সংখ্যা আড়াই লাখ থেকে কমিয়ে দেড় লাখে নামানো হয়েছে। কিছু দুর্গম এলাকায় পরিবারগুলোকে এখন এক দিন পরপর গরম খাবার দেওয়া হচ্ছে।

ডব্লিউএফপি জানিয়েছে, কার্যক্রম চালু রাখতে আগামী ছয় মাসে গাজা ও পশ্চিম তীরে তাদের প্রায় ৪৫ কোটি মার্কিন ডলার প্রয়োজন। অর্থের সংকট অব্যাহত থাকলে খাদ্যসহায়তা কার্যক্রম আরও চাপে পড়তে পারে।

জাতিসংঘের মানবিক সহায়তা সমন্বয় দপ্তরের (ওসিএইচএ) তথ্যের বরাত দিয়ে আল-জাজিরা জানিয়েছে, সেপ্টেম্বর মাসে গাজায় দুই হাজার ৮০০-এর বেশি শিশুকে অপুষ্টির চিকিৎসার জন্য ভর্তি করা হয়েছিল। তাদের মধ্যে ৩৬০ জনের বেশি শিশু তীব্র অপুষ্টিতে ভুগছিল।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, ছয় মাস থেকে পাঁচ বছর বয়সী প্রায় তিন হাজার শিশুকে প্রতি মাসে অপুষ্টির চিকিৎসার জন্য ভর্তি করা হচ্ছে।

এদিকে ইউনিসেফ-সমর্থিত ২০২৬ সালের আগস্টে প্রকাশিত একটি পুষ্টি জরিপে দেখা গেছে, জরিপের আওতাভুক্ত এলাকায় পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশুদের ১২ দশমিক ২ শতাংশ খর্বকায়তার সমস্যায় ভুগছে। দীর্ঘমেয়াদি অপুষ্টি ও স্বাস্থ্যগত সমস্যার কারণে শিশুর স্বাভাবিক শারীরিক বৃদ্ধি ব্যাহত হলে এ ধরনের সমস্যা দেখা দিতে পারে।

ইউনিসেফের তথ্য অনুযায়ী, দুই বছরের কম বয়সী শিশুদের মধ্যে মাত্র এক-তৃতীয়াংশ ন্যূনতম খাদ্যবৈচিত্র্য পাচ্ছে। ফলে শিশুদের খাদ্যতালিকায় প্রয়োজনীয় পুষ্টি নিশ্চিত করা নিয়ে উদ্বেগ রয়ে গেছে।

গাজায় দীর্ঘ সংঘাত ও বাস্তুচ্যুতির কারণে বহু পরিবার নিরাপদ বাসস্থান, বিশুদ্ধ পানি, স্বাস্থ্যসেবা ও পর্যাপ্ত খাবার থেকে বঞ্চিত। শিশুদের জন্য নিয়মিত পুষ্টিকর খাবার নিশ্চিত করা না গেলে অপুষ্টি, রোগব্যাধি এবং দীর্ঘমেয়াদি শারীরিক বিকাশের সমস্যা আরও বাড়তে পারে।

মানবিক সংস্থাগুলো খাদ্য ও পুষ্টিসামগ্রীর নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ নিশ্চিত করা, প্রয়োজনীয় সীমান্তপথগুলো দিয়ে সহায়তা প্রবেশের সুযোগ বাড়ানো এবং ঝুঁকিতে থাকা শিশুদের চিকিৎসা ও পুষ্টিসেবা অব্যাহত রাখার ওপর গুরুত্ব দিচ্ছে।

গাজার পরিবারগুলোর কাছে এখন প্রতিদিনের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো সন্তানদের মুখে অন্তত দুবেলা খাবার তুলে দেওয়া। যে বয়সে শিশুদের সুস্থভাবে বেড়ে ওঠার জন্য দুধ, ডিম, শাকসবজি ও অন্যান্য পুষ্টিকর খাবার প্রয়োজন, সেই বয়সেই অনেক শিশুকে সীমিত খাবারের ওপর নির্ভর করে দিন কাটাতে হচ্ছে।

ChannelNRB Footer