News Ticker
221.png

আফগানিস্তানে শীতে তীব্র খাদ্যসংকটের মুখে পড়তে পারে ১ কোটি ৯২ লাখ মানুষ

অনলাইন ডেস্ক

প্রকাশিত: ২১ অক্টোবর, ২০২৬ ১৭:৩২

শেয়ার

শেয়ার

আফগানিস্তানে শীতে তীব্র খাদ্যসংকটের মুখে পড়তে পারে ১ কোটি ৯২ লাখ মানুষ
ছবি: সংগৃহীত

আফগানিস্তানে আসন্ন শীত মৌসুমে তীব্র খাদ্যসংকটের মুখে পড়তে পারেন প্রায় ১ কোটি ৯২ লাখ মানুষ। দেশটির মোট জনসংখ্যার প্রায় ৩৮ শতাংশ এই সংকটের ঝুঁকিতে রয়েছেন। তাঁদের মধ্যে প্রায় ৫০ লাখ মানুষ ক্ষুধার জরুরি পর্যায়ে পৌঁছাতে পারেন বলে সতর্ক করেছে জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থা (এফএও) এবং বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচি (ডব্লিউএফপি)।

মঙ্গলবার (২০ অক্টোবর) জাতিসংঘের মানবিক সহায়তা সমন্বয় দপ্তর (ওসিএইচএ) জানায়, শীত ঘনিয়ে আসার সঙ্গে সঙ্গে দেশটির খাদ্যনিরাপত্তা পরিস্থিতির আরও অবনতি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। খাদ্য ও পরিবহন ব্যয় বৃদ্ধি, কর্মসংস্থানের সংকট এবং আন্তর্জাতিক মানবিক সহায়তা কমে যাওয়ায় লাখো পরিবার প্রয়োজনীয় খাবার সংগ্রহ করতে পারছে না।

এফএও ও ডব্লিউএফপির যৌথ বিশ্লেষণ অনুযায়ী, ২০২৬ সালের নভেম্বর থেকে ২০২৭ সালের এপ্রিল পর্যন্ত আফগানিস্তানে প্রায় ১ কোটি ৯২ লাখ মানুষ তীব্র খাদ্যনিরাপত্তাহীনতায় পড়তে পারেন। আগের বছরের একই সময়ের পূর্বাভাসে এ সংখ্যা ছিল প্রায় ১ কোটি ৭৪ লাখ।

অর্থাৎ, এক বছরের ব্যবধানে খাদ্যসংকটের ঝুঁকিতে থাকা মানুষের সংখ্যা প্রায় ১৮ লাখ বাড়তে পারে।

বর্তমানে সেপ্টেম্বর ও অক্টোবরের হিসাব অনুযায়ী, দেশটিতে প্রায় ১ কোটি ৫৯ লাখ মানুষ খাদ্যনিরাপত্তাহীনতার সংকট বা তার চেয়েও খারাপ পরিস্থিতিতে রয়েছেন। তাঁদের মধ্যে প্রায় ৩৪ লাখ মানুষ ক্ষুধার জরুরি পর্যায়ে রয়েছেন।

বিশেষজ্ঞদের মতে, শীতকালে কৃষিকাজের সুযোগ কমে যাওয়া, আয় হ্রাস এবং দুর্গম এলাকায় খাদ্য ও মানবিক সহায়তা পৌঁছানোর জটিলতা পরিস্থিতিকে আরও কঠিন করে তুলতে পারে।

জাতিসংঘের পূর্বাভাস অনুযায়ী, আসন্ন শীত মৌসুমে প্রায় ৫০ লাখ মানুষ খাদ্যসংকটের জরুরি পর্যায়ে পড়তে পারেন। এ পর্যায়ে মানুষের জীবন ও জীবিকা রক্ষায় দ্রুত খাদ্যসহায়তা এবং জরুরি পদক্ষেপ প্রয়োজন হয়।

আফগানিস্তানের বাদাখশান, বাদঘিস, দাইকুন্দি, ঘোর, সামাঙ্গান, সার-ই-পুল এবং গজনির গ্রামীণ এলাকায় পরিস্থিতি বিশেষভাবে উদ্বেগজনক হতে পারে।

দীর্ঘদিনের সংঘাত, খরা, অর্থনৈতিক দুরবস্থা ও কর্মসংস্থানের অভাবে বহু পরিবার ইতিমধ্যে সঞ্চয় হারিয়েছে। অনেকের কাছে খাদ্য কেনার মতো পর্যাপ্ত অর্থ নেই। ফলে বাজারে খাবার পাওয়া গেলেও তা কেনার সামর্থ্য না থাকায় মানুষ অনাহার ও অপুষ্টির ঝুঁকিতে পড়ছে।

আফগানিস্তানে খাদ্যসংকটের পাশাপাশি তীব্র অপুষ্টির পরিস্থিতিও উদ্বেগজনক হয়ে উঠছে। জাতিসংঘের পূর্বাভাস অনুযায়ী, ২০২৭ সালে দেশটিতে প্রায় ৪০ লাখ মানুষের তীব্র অপুষ্টির চিকিৎসা প্রয়োজন হতে পারে। এ সংখ্যা ২০২৬ সালের তুলনায় প্রায় ১০ শতাংশ বেশি।

বিশেষ করে শিশু ও মায়েরা সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে রয়েছেন। অপুষ্টিতে আক্রান্তদের প্রায় এক-চতুর্থাংশের অবস্থা গুরুতর ও জীবনহানির আশঙ্কা তৈরি করতে পারে বলে সতর্ক করেছে সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলো।

ছয় মাস থেকে পাঁচ বছর বয়সী ৪০ লাখের বেশি শিশুর ২০২৭ সালে তীব্র অপুষ্টির চিকিৎসার প্রয়োজন হতে পারে। এর মধ্যে প্রায় ১১ লাখ শিশুর গুরুতর অপুষ্টির চিকিৎসা লাগতে পারে।

অর্থের অভাবে পুষ্টিসেবা কেন্দ্র বন্ধ হয়ে যাওয়া বা কার্যক্রম স্থগিত হওয়ায় ঝুঁকি আরও বাড়ছে। জাতিসংঘের তথ্য অনুযায়ী, দেশটির প্রায় এক-তৃতীয়াংশ পুষ্টিসেবা কেন্দ্র বন্ধ হয়ে গেছে অথবা সেবা স্থগিত করেছে। ফলে অপুষ্টিতে আক্রান্ত শিশুদের সময়মতো চিকিৎসা পাওয়া কঠিন হয়ে পড়ছে।

আফগানিস্তানের বর্তমান পরিস্থিতির পেছনে একাধিক কারণ কাজ করছে। এর মধ্যে রয়েছে উচ্চ খাদ্যমূল্য, পরিবহন ব্যয় বৃদ্ধি, বেকারত্ব, সীমান্ত ও বাণিজ্যপথে বিঘ্ন এবং মানবিক সহায়তার অর্থায়ন কমে যাওয়া।

এ বছর ইরান ও পাকিস্তান থেকে ১২ লাখের বেশি আফগান নাগরিক দেশে ফিরতে বাধ্য হয়েছেন। তাঁদের পুনর্বাসন ও খাদ্যের চাহিদা আগে থেকেই চাপে থাকা স্থানীয় জনগোষ্ঠীর ওপর বাড়তি চাপ সৃষ্টি করেছে।

অন্যদিকে, কয়েক বছরের খরা ও অর্থনৈতিক সংকটের পর ২০২৬ সালে অনুকূল বৃষ্টিপাতের কারণে কৃষি উৎপাদন কিছুটা উন্নত হয়েছে। তবে ভালো ফলন হলেও অনেক পরিবারের ক্রয়ক্ষমতা না থাকায় খাদ্যনিরাপত্তার উন্নতি হচ্ছে না।

জাতিসংঘের কর্মকর্তারা বলছেন, শুধু বাজারে খাদ্য থাকা যথেষ্ট নয়; মানুষের সেই খাদ্য কেনার সামর্থ্য, আয় এবং প্রয়োজনীয় সেবায় প্রবেশাধিকারও নিশ্চিত করতে হবে।

আসন্ন শীতের আগে ঝুঁকিপূর্ণ পরিবারগুলোর কাছে খাদ্যসহায়তা পৌঁছে দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছে এফএও ও ডব্লিউএফপি। পাশাপাশি কৃষকদের বীজ, সার ও অন্যান্য কৃষি উপকরণ সরবরাহ, জীবিকার সুযোগ তৈরি এবং অপুষ্টিতে আক্রান্ত শিশুদের চিকিৎসা নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।

শীতকালে তুষারপাত ও ভারী তুষারের কারণে দুর্গম এলাকায় যোগাযোগ ব্যাহত হতে পারে। এতে খাদ্য ও চিকিৎসাসামগ্রী পৌঁছানো আরও কঠিন হয়ে উঠবে। তাই আগেভাগে সহায়তা পৌঁছে দেওয়া জরুরি বলে মনে করছে মানবিক সংস্থাগুলো।

জাতিসংঘের কর্মকর্তাদের মতে, সময়মতো সহায়তা দেওয়া গেলে খাদ্যসংকটের তীব্রতা কমানো এবং বহু পরিবারের জীবন ও জীবিকা রক্ষা করা সম্ভব। তবে প্রয়োজনীয় অর্থায়ন ও সহায়তা নিশ্চিত করা না গেলে আগামী শীত আফগানিস্তানের লাখো মানুষের জন্য আরও কঠিন হয়ে উঠতে পারে।

ChannelNRB Footer