ফ্রান্সে সাম্প্রতিক বিক্ষোভ ও সহিংসতার সময় বিভিন্ন দোকান থেকে লুট হওয়া বলে সন্দেহ করা পণ্য অনলাইনে বিক্রির অভিযোগ উঠেছে। পোশাক, প্রসাধনী, সুগন্ধি ও ইলেকট্রনিকসসহ বিভিন্ন পণ্যের বিজ্ঞাপন দেখা যাওয়ার পর বিষয়টি নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। পরিস্থিতি মোকাবিলায় অনলাইন কেনাবেচার প্ল্যাটফর্মগুলোর বিরুদ্ধে নজরদারি জোরদার এবং সন্দেহজনক বিজ্ঞাপন দ্রুত সরানোর উদ্যোগ নিয়েছে দেশটির সরকার।
মঙ্গলবার (২০ অক্টোবর) ইউরোনিউজের এক প্রতিবেদনে বলা হয়, বিক্ষোভের সময় লুট হওয়া পণ্য অনলাইনে বিক্রির অভিযোগ সামনে আসার পর ফ্রান্সের কর্তৃপক্ষ বড় কয়েকটি ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের প্রতিনিধিদের সঙ্গে বৈঠক করেছে। এর আগে সোমবারও এ বিষয়ে আলোচনা হয়।
গত ১৭ অক্টোবর ফ্রান্সের বিভিন্ন শহরে বিক্ষোভ চলাকালে বহু দোকানে ভাঙচুর ও লুটপাটের ঘটনা ঘটে। এরপর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া বিভিন্ন স্ক্রিনশটে দেখা যায়, বিক্ষোভের সময় লুট হওয়া বলে সন্দেহ করা কিছু পণ্য অনলাইন মার্কেটপ্লেসে বিক্রির জন্য তোলা হয়েছে।
এসব পণ্যের মধ্যে পোশাক, মেকআপ, সুগন্ধি এবং বিভিন্ন ইলেকট্রনিক সামগ্রী রয়েছে বলে সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
তবে অনলাইনে বিজ্ঞাপন দেওয়া প্রতিটি পণ্য যে বিক্ষোভের সময় লুট করা হয়েছিল, তা নিশ্চিত নয়। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ ও প্ল্যাটফর্মগুলোকে সন্দেহজনক বিজ্ঞাপন যাচাই করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে বলা হয়েছে।
ব্যবহৃত ও নতুন পণ্য কেনাবেচার জনপ্রিয় অনলাইন প্ল্যাটফর্ম ভিন্টেড জানিয়েছে, লুট হওয়া পণ্য বিক্রির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট হতে পারে—এমন বিজ্ঞাপন শনাক্ত ও অপসারণে তারা তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নিয়েছে। পাশাপাশি সন্দেহজনক বিজ্ঞাপনের ওপর নজরদারি বাড়ানো হয়েছে।
প্রতিষ্ঠানটি জানিয়েছে, তাদের প্ল্যাটফর্মে চুরি করা পণ্য বিক্রি বা এ ধরনের পণ্য বিক্রির আহ্বান কঠোরভাবে নিষিদ্ধ। নিয়ম ভঙ্গের প্রমাণ পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্ট অ্যাকাউন্ট স্থায়ীভাবে বন্ধ করে দেওয়ার মতো ব্যবস্থাও নেওয়া হতে পারে।
ভিন্টেড আরও জানিয়েছে, সন্দেহজনক পণ্যের বিজ্ঞাপন শনাক্ত করতে তারা ফরাসি কর্তৃপক্ষ ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সঙ্গে সহযোগিতা করছে।
ফ্রান্সের ডিজিটালবিষয়ক মন্ত্রী অ্যান লে হেনাঁফ অনলাইনে চুরি করা পণ্য বিক্রির বিজ্ঞাপন দ্রুত সরিয়ে ফেলার আহ্বান জানিয়েছেন। তিনি সংশ্লিষ্ট প্ল্যাটফর্মগুলোকে আইন প্রয়োগকারী সংস্থার সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করারও নির্দেশনা দিয়েছেন।
সরকারি আলোচনায় ভিন্টেড, অ্যামাজন, ইবে, লেবনকোয়াঁ, মেটা ও টিকটকের প্রতিনিধিদের আমন্ত্রণ জানানো হয়। বৈঠকে সন্দেহজনক বিজ্ঞাপন শনাক্ত করা, অবৈধ পণ্য বিক্রি বন্ধ করা এবং অপরাধে জড়িত ব্যক্তিদের শনাক্ত করতে কর্তৃপক্ষকে সহযোগিতার বিষয় গুরুত্ব পায়।
ইবে জানিয়েছে, চুরি করা পণ্য বিক্রি শনাক্ত করতে তাদের নিজস্ব প্রযুক্তিগত ব্যবস্থা রয়েছে। তদন্তের প্রয়োজনে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অনুরোধ গ্রহণের জন্যও নির্দিষ্ট ব্যবস্থা রাখা হয়েছে।
ফ্রান্সে জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি ও সরকারি পরিষেবার অবনতি নিয়ে চলা বিক্ষোভ গত সপ্তাহান্তে সহিংসতায় রূপ নেয়। বিভিন্ন শহরে বিক্ষোভকারীদের সঙ্গে পুলিশের সংঘর্ষের পাশাপাশি দোকানপাটে ভাঙচুর, অগ্নিসংযোগ ও লুটপাটের ঘটনা ঘটে।
কর্তৃপক্ষের তথ্য অনুযায়ী, দেশজুড়ে তিন হাজারের বেশি ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ক্ষতিগ্রস্ত প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে পোশাকের দোকান, সুপারমার্কেট, প্রসাধনীর দোকান এবং বিলাসবহুল পণ্যের বিক্রয়কেন্দ্র রয়েছে।
লুটপাটের ফলে ব্যবসায়ীদের আর্থিক ক্ষতির পাশাপাশি অনলাইনে চুরি হওয়া পণ্য বিক্রির অভিযোগ নতুন উদ্বেগ তৈরি করেছে। কারণ, এসব পণ্যের উৎস শনাক্ত করা এবং বিক্রেতাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া অনেক ক্ষেত্রে কঠিন হতে পারে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, অনলাইন মার্কেটপ্লেসে ব্যবহৃত পণ্যের বিপুল সংখ্যক বিজ্ঞাপনের মধ্যে চুরি হওয়া পণ্য শনাক্ত করতে প্রযুক্তিগত নজরদারি, ব্যবহারকারীদের অভিযোগ এবং বিক্রেতাদের তথ্য যাচাই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
ফরাসি কর্তৃপক্ষের লক্ষ্য হলো, লুট হওয়া পণ্য বিক্রি বন্ধ করা এবং এ ধরনের কর্মকাণ্ডে জড়িত ব্যক্তিদের শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনা। একই সঙ্গে অনলাইন প্ল্যাটফর্মগুলোকে নিজেদের নীতিমালা আরও কার্যকরভাবে প্রয়োগ করতে বলা হয়েছে।
এদিকে ভিন্টেড সন্দেহজনক বিজ্ঞাপন সরানোর পাশাপাশি নজরদারি বাড়ানোর কথা জানিয়েছে। তবে মোট কতটি বিজ্ঞাপন সরানো হয়েছে বা কতজন বিক্রেতার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে, সে বিষয়ে নির্দিষ্ট সংখ্যা প্রকাশ করা হয়নি।
ফ্রান্সে বিক্ষোভ-পরবর্তী পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার পাশাপাশি এখন লুট হওয়া পণ্যের অনলাইন বেচাকেনা বন্ধ করাও সরকারের জন্য নতুন চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
আরও পড়ুন:







