দক্ষিণ কোরিয়াকে লক্ষ্য করে সীমান্তজুড়ে প্রচারণামূলক লাউডস্পিকার বা উচ্চ শব্দের মাইক আবারও চালুর ঘোষণা দিয়েছে উত্তর কোরিয়া। আগামী কয়েক দিনের মধ্যে এসব লাউডস্পিকার প্রস্তুত অবস্থায় রাখা হবে বলে জানিয়েছেন উত্তর কোরিয়ার নেতা কিম জং উনের প্রভাবশালী বোন কিম ইয়ো জং। একই সঙ্গে দক্ষিণ কোরিয়ার বিরুদ্ধে কঠোর হুঁশিয়ারি দিয়ে তিনি বলেছেন, পিয়ংইয়ংয়ের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ অব্যাহত থাকলে ভয়াবহ পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে পারে সিউল।
বৃহস্পতিবার (২২ অক্টোবর) উত্তর কোরিয়ার রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যমের বরাতে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমগুলো এ তথ্য জানিয়েছে। এর আগে বুধবার কিম ইয়ো জং চলতি অক্টোবর মাসের মধ্যেই সীমান্তজুড়ে লাউডস্পিকার চালু করার ঘোষণা দিয়েছিলেন। নতুন বক্তব্যে সেই পরিকল্পনা বাস্তবায়নের প্রস্তুতি আরও এগিয়ে নেওয়ার ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছে।
উত্তর কোরিয়ার ক্ষমতাসীন ওয়ার্কার্স পার্টির গুরুত্বপূর্ণ কর্মকর্তা কিম ইয়ো জং জানান, দক্ষিণ কোরিয়াকে লক্ষ্য করে মনস্তাত্ত্বিক প্রচারণা চালানোর জন্য সীমান্তের বিভিন্ন স্থানে লাউডস্পিকার প্রস্তুত করা হচ্ছে। পাশাপাশি দেশটির কৌশলগত সামরিক ইউনিটগুলোও নতুন অবস্থানে যাচ্ছে বলে দাবি করেন তিনি।
উত্তর কোরিয়ার রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যম কেসিএনএর (KCNA) প্রকাশিত বিবৃতিতে কিম ইয়ো জং এ পদক্ষেপকে দক্ষিণ কোরিয়ার কর্মকাণ্ডের উপযুক্ত জবাব হিসেবে তুলে ধরেন।
তার বক্তব্য অনুযায়ী, সীমান্তের পুরো এলাকায় লাউডস্পিকার চালুর প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে। তবে বৃহস্পতিবার পর্যন্ত সব স্থানে সম্প্রচার কার্যক্রম শুরু হয়ে গেছে—এমন নিশ্চিত তথ্য পাওয়া যায়নি।
সাম্প্রতিক সময়ে দুই কোরিয়ার সীমান্তে কয়েকটি ঘটনা নিয়ে উত্তেজনা বেড়েছে। উত্তর কোরিয়ার অভিযোগ, দক্ষিণ কোরিয়ার সেনারা সীমান্ত এলাকায় সতর্কতামূলক সম্প্রচার ও গুলিবর্ষণের মাধ্যমে উসকানিমূলক আচরণ করছে। এসব পদক্ষেপকে নিজেদের নিরাপত্তার জন্য হুমকি হিসেবে দেখছে পিয়ংইয়ং।
অন্যদিকে, দক্ষিণ কোরিয়ার সামরিক কর্তৃপক্ষের বক্তব্য, সীমান্ত এলাকায় নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে তাদের পদক্ষেপ ছিল বৈধ ও আত্মরক্ষামূলক।
গত ২১ সেপ্টেম্বর সীমান্ত এলাকায় স্থলমাইন বিস্ফোরণে দক্ষিণ কোরিয়ার তিন সেনা আহত হওয়ার ঘটনাও দুই দেশের মধ্যে উত্তেজনা বাড়িয়েছে। দক্ষিণ কোরিয়া এ ঘটনার জন্য উত্তর কোরিয়াকে দায়ী করলেও পিয়ংইয়ং অভিযোগ অস্বীকার করেছে।
এ অবস্থায় লাউডস্পিকার চালুর ঘোষণা দুই দেশের মধ্যে বিদ্যমান অবিশ্বাস ও বৈরিতা আরও বাড়াতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
দুই কোরিয়ার মধ্যে মনস্তাত্ত্বিক প্রচারণার অংশ হিসেবে সীমান্তে লাউডস্পিকার ব্যবহার নতুন ঘটনা নয়। অতীতে এসব যন্ত্রের মাধ্যমে একে অপরের বিরুদ্ধে প্রচারণা, সংবাদ, রাজনৈতিক বক্তব্য এবং বিভিন্ন ধরনের শব্দ সম্প্রচার করা হয়েছে।
দক্ষিণ কোরিয়ার লাউডস্পিকারে অতীতে উত্তর কোরিয়ার শাসনব্যবস্থার সমালোচনা, আন্তর্জাতিক সংবাদ ও কে-পপ সংগীত প্রচার করা হয়েছে। অন্যদিকে, উত্তর কোরিয়া দক্ষিণ কোরিয়াকে লক্ষ্য করে পাল্টা প্রচারণা ও উচ্চ শব্দ সম্প্রচার করেছে।
সীমান্তের কাছাকাছি বসবাসকারী মানুষের জন্য এ ধরনের সম্প্রচার বিরক্তি, মানসিক চাপ ও দৈনন্দিন জীবনে বিঘ্ন সৃষ্টি করতে পারে। একই সঙ্গে দুই দেশের মধ্যে সামরিক উত্তেজনা বাড়ানোর ঝুঁকিও রয়েছে।
২০২৫ সালের জুনে দক্ষিণ কোরিয়া উত্তেজনা কমানোর উদ্যোগের অংশ হিসেবে উত্তরমুখী লাউডস্পিকার সম্প্রচার বন্ধ করে দেয়। এরপর উত্তর কোরিয়াও দক্ষিণ কোরিয়াকে লক্ষ্য করে নিজস্ব সম্প্রচার বন্ধ করেছিল। নতুন ঘোষণা বাস্তবায়িত হলে প্রায় ১৬ মাস পর আবারও উত্তর কোরিয়ার লাউডস্পিকার সম্প্রচার শুরু হতে পারে।
উত্তর কোরিয়ার ঘোষণার পর দক্ষিণ কোরিয়ার প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, পিয়ংইয়ং লাউডস্পিকার সম্প্রচার পুনরায় শুরু করলে পরিস্থিতি অনুযায়ী আনুপাতিক পাল্টা পদক্ষেপ বিবেচনা করা হতে পারে।
তবে উত্তর কোরিয়ার বিরুদ্ধে দক্ষিণ কোরিয়াও লাউডস্পিকার চালু করবে কি না, সে বিষয়ে এখনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়নি বলে দেশটির প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে।
দক্ষিণ কোরিয়ার সামরিক কর্তৃপক্ষ সীমান্ত পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছে। উত্তর কোরিয়ার নতুন সামরিক অবস্থান গ্রহণ এবং লাউডস্পিকার স্থাপনের কার্যক্রম সম্পর্কেও নজর রাখা হচ্ছে।
দক্ষিণ কোরিয়ার প্রেসিডেন্ট লি জে মিয়ং দুই কোরিয়ার মধ্যে উত্তেজনা কমানো এবং যোগাযোগ পুনরায় প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নিয়েছেন। তবে উত্তর কোরিয়ার নতুন হুঁশিয়ারি সেই প্রচেষ্টার সামনে নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে।
বিশ্লেষকদের মতে, লাউডস্পিকার চালুর মতো পদক্ষেপ সরাসরি বড় ধরনের সামরিক সংঘাতের সূচনা না করলেও সীমান্তে উত্তেজনা বাড়াতে পারে। এর সঙ্গে যদি সতর্কতামূলক গুলিবর্ষণ, সামরিক ইউনিটের অবস্থান পরিবর্তন কিংবা পাল্টাপাল্টি প্রচারণা যুক্ত হয়, তাহলে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠতে পারে।
এখন নজর রয়েছে উত্তর কোরিয়া ঘোষিত সময়ের মধ্যে সীমান্তজুড়ে লাউডস্পিকার চালু করে কি না এবং এর জবাবে দক্ষিণ কোরিয়া কী পদক্ষেপ নেয়, তার ওপর। দুই দেশের মধ্যে উত্তেজনা প্রশমনে কূটনৈতিক যোগাযোগ পুনরায় শুরু করা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
আরও পড়ুন:







