কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) প্রযুক্তি খাতের অন্যতম আলোচিত প্রতিষ্ঠান অ্যানথ্রপিকের ২০২৬ সালের প্রথম ছয় মাসে নিট লোকসান দাঁড়িয়েছে ৮০ দশমিক ৭ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রতি ডলার ১২২ টাকা ধরে এর পরিমাণ প্রায় ৯ লাখ ৮৫ হাজার কোটি টাকা। তবে এই বিপুল লোকসানের বড় অংশই সরাসরি নগদ অর্থ খরচের কারণে নয়; বরং কোম্পানির ঋণ ও আর্থিক উপকরণের মূল্যায়ন পরিবর্তনের কারণে হিসাবের খাতায় যুক্ত হয়েছে।
মঙ্গলবার (২০ অক্টোবর) প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে দ্য ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল খসড়া আইপিও প্রসপেক্টাসের বরাতে এ তথ্য জানায়। পরবর্তী সময়ে রয়টার্সও প্রতিবেদনটি প্রকাশ করে। এতে দেখা যায়, ২০২৫ সালের একই সময়ে অ্যানথ্রপিকের নিট লোকসান ছিল ১৩ বিলিয়ন ডলার। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে ঘোষিত লোকসানের অঙ্ক উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। তবে এই সংখ্যা দিয়ে এককভাবে কোম্পানিটির প্রকৃত ব্যবসায়িক অবস্থার পূর্ণ চিত্র পাওয়া যায় না।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৬ সালের প্রথম ছয় মাসে অ্যানথ্রপিকের মোট ঘোষিত লোকসানের মধ্যে প্রায় ৭২ বিলিয়ন ডলার এসেছে হিসাবসংক্রান্ত চার্জ থেকে। কোম্পানির ইস্যু করা কনভার্টিবল নোটসহ বিভিন্ন আর্থিক উপকরণের আনুমানিক মূল্য বেড়ে যাওয়ায় এই চার্জ তৈরি হয়েছে।
কনভার্টিবল নোট হলো এমন একধরনের ঋণ, যা নির্দিষ্ট শর্তে ভবিষ্যতে কোম্পানির শেয়ারে রূপান্তর করা যায়। কোম্পানির মূল্যায়ন বাড়লে এসব ঋণ বা আর্থিক উপকরণের হিসাবি মূল্যও পরিবর্তিত হতে পারে। ফলে নগদ অর্থ একই পরিমাণে খরচ না হলেও আর্থিক বিবরণীতে বড় অঙ্কের লোকসান দেখা দিতে পারে।
এ কারণে অ্যানথ্রপিকের ৮০.৭ বিলিয়ন ডলারের নিট লোকসানকে সরাসরি ব্যবসা পরিচালনায় ওই পরিমাণ অর্থ হারানোর সমতুল্য মনে করা ঠিক হবে না। তবে এর অর্থ এই নয় যে কোম্পানিটির প্রকৃত ব্যয় বা আর্থিক ঝুঁকি নেই। এআই মডেল তৈরি, কম্পিউটিং অবকাঠামো এবং কর্মী নিয়োগে প্রতিষ্ঠানটির ব্যয়ও দ্রুত বাড়ছে।
অ্যানথ্রপিকের আর্থিক বিবরণীতে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব পাচ্ছে কম্পিউটিং সক্ষমতা বাড়ানোর ব্যয়। শক্তিশালী এআই মডেল তৈরি ও পরিচালনার জন্য বিপুল পরিমাণ কম্পিউটিং শক্তি, উন্নত চিপ, ডেটা সেন্টার এবং ক্লাউড অবকাঠামো প্রয়োজন হয়।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৬ সালের প্রথম ছয় মাসে কম্পিউটিং সক্ষমতা ও অবকাঠামোর পেছনে অ্যানথ্রপিকের ব্যয় হয়েছে প্রায় ৯ বিলিয়ন ডলার। ২০২৫ সালের একই সময়ে এই ব্যয় ছিল ২ দশমিক ৩ বিলিয়ন ডলার।
অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে এ খাতে ব্যয় প্রায় চার গুণ হয়েছে। এআই সেবার চাহিদা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে গ্রাহকদের দ্রুত ও উন্নত সেবা দিতে প্রতিষ্ঠানটি অবকাঠামো সম্প্রসারণে বড় অঙ্কের অর্থ ব্যয় করছে।
এ ছাড়া আগামী এক দশকে ক্লাউড সেবা, কম্পিউটিং সক্ষমতা ও অবকাঠামোর জন্য অন্তত ৫১৮ বিলিয়ন ডলার ব্যয়ের প্রতিশ্রুতির কথা প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। এসব দীর্ঘমেয়াদি চুক্তি কোম্পানিটির ভবিষ্যৎ আর্থিক পরিকল্পনায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
নিট লোকসানের অঙ্ক বড় হলেও অ্যানথ্রপিকের ব্যবসায়িক আয়ও দ্রুত বাড়ছে। রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৬ সালের তৃতীয় প্রান্তিকে কোম্পানিটির রাজস্ব আগের প্রান্তিকের তুলনায় ৪৫ শতাংশ বেড়ে ১৬ দশমিক ৮ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে।
প্রতিষ্ঠানটির জনপ্রিয় এআই সহকারী ক্লড (Claude) এবং সফটওয়্যার তৈরিতে সহায়তাকারী ক্লড কোড (Claude Code) সেবার চাহিদা এই প্রবৃদ্ধিতে ভূমিকা রাখছে।
অ্যানথ্রপিকের আয় বাড়লেও একই গতিতে লাভজনকতা অর্জন করা সম্ভব হচ্ছে কি না, সেটিই এখন বিনিয়োগকারীদের অন্যতম প্রধান প্রশ্ন। এআই মডেল তৈরি ও পরিচালনার ব্যয় অত্যন্ত বেশি হওয়ায় রাজস্ব বৃদ্ধির পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদি পরিচালন ব্যয়ও নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে।
অ্যানথ্রপিক সম্ভাব্য প্রাথমিক গণপ্রস্তাব বা আইপিওর (IPO) প্রস্তুতি নিচ্ছে। এর মাধ্যমে শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত হয়ে নতুন বিনিয়োগ সংগ্রহের সুযোগ তৈরি হতে পারে। সংগৃহীত অর্থ এআই গবেষণা, উন্নত চিপ, ডেটা সেন্টার এবং ব্যবসা সম্প্রসারণে কাজে লাগানো সম্ভব।
তবে আইপিওর আগে প্রকাশিত আর্থিক তথ্য বিনিয়োগকারীদের মূল্যায়নে প্রভাব ফেলতে পারে। বিশেষ করে ঘোষিত লোকসান, নগদ অর্থের ব্যবহার, দীর্ঘমেয়াদি ব্যয়ের প্রতিশ্রুতি এবং ভবিষ্যৎ আয়ের সম্ভাবনা বিবেচনায় নিয়ে বিনিয়োগকারীরা কোম্পানিটির মূল্য নির্ধারণ করতে পারেন।
রয়টার্সের প্রতিবেদন অনুযায়ী, নতুন আর্থিক তথ্য প্রকাশের পর কিছু বিনিয়োগকারী কোম্পানিটির সম্ভাব্য মূল্যায়ন নিয়ে নতুন করে হিসাব করছেন। তবে চূড়ান্ত আইপিও মূল্যায়ন নির্ভর করবে বাজার পরিস্থিতি, বিনিয়োগকারীদের আগ্রহ এবং আনুষ্ঠানিক আর্থিক তথ্যের ওপর।
অ্যানথ্রপিকের আর্থিক চিত্র এআই শিল্পের একটি বড় বাস্তবতা সামনে এনেছে। একদিকে এআই সেবার চাহিদা ও আয় বাড়ছে, অন্যদিকে উন্নত মডেল তৈরি এবং সেগুলো পরিচালনার জন্য অবকাঠামোতে বিপুল বিনিয়োগ প্রয়োজন হচ্ছে।
প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য মূল চ্যালেঞ্জ হচ্ছে—দ্রুত প্রবৃদ্ধি ধরে রাখার পাশাপাশি ব্যয় নিয়ন্ত্রণ করা এবং দীর্ঘমেয়াদে টেকসই মুনাফা অর্জন করা।
অ্যানথ্রপিকের ক্ষেত্রে ৮০.৭ বিলিয়ন ডলারের ঘোষিত নিট লোকসানের বড় অংশ হিসাবসংক্রান্ত হলেও কম্পিউটিং অবকাঠামোয় বাড়তে থাকা ব্যয় এবং দীর্ঘমেয়াদি আর্থিক দায় বিনিয়োগকারীদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে থাকবে।
আরও পড়ুন:







