ইয়েমেনের হুথি বিদ্রোহীদের ধারাবাহিক হামলা এবং সৌদি আরবে নিরাপত্তাঝুঁকি বৃদ্ধির প্রেক্ষাপটে দেশটিতে কর্মরত জরুরি নয় এমন মার্কিন সরকারি কর্মকর্তা ও তাঁদের পরিবারের সদস্যদের সৌদি আরব ছাড়ার নির্দেশ দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। সৌদি আরবের বিমানবন্দর ও গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি অবকাঠামোতে প্রাণঘাতী হামলার পর ওয়াশিংটনের এই সিদ্ধান্ত মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সংঘাত নিয়ে নতুন উদ্বেগ তৈরি করেছে।
বুধবার (২১ অক্টোবর) মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের মুখপাত্র টমি পিগট এ সিদ্ধান্তের কথা জানান। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, ইয়েমেনের ইরান-সমর্থিত হুথিরা সৌদি আরবের বেসামরিক বিমানবন্দর ও গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো লক্ষ্য করে হামলা চালাচ্ছে। এতে প্রাণহানি ঘটেছে এবং বিমান চলাচলে উল্লেখযোগ্য বিঘ্ন সৃষ্টি হয়েছে। পরিস্থিতির আরও অবনতি হওয়ার আশঙ্কায় মার্কিন কর্মকর্তা ও তাঁদের পরিবারের নিরাপত্তাকে অগ্রাধিকার দিয়ে এ পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে।
সাম্প্রতিক সময়ে সৌদি আরবের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনায় ড্রোন হামলা এবং নিরাপত্তা পরিস্থিতির অবনতির কারণে উদ্বেগ বেড়েছে। বিশেষ করে বিমানবন্দর ও তেল স্থাপনাকে লক্ষ্য করে হামলার ঘটনা যুক্তরাষ্ট্রের কূটনৈতিক মিশনের নিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি করেছে।
মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের ভাষ্য অনুযায়ী, হুথিদের হামলা শুধু নির্দিষ্ট কোনো এলাকায় সীমাবদ্ধ থাকার নিশ্চয়তা নেই; পরিস্থিতি দ্রুত আরও বিস্তৃত হতে পারে। এ কারণে জরুরি দায়িত্বে নিয়োজিত নন—এমন সরকারি কর্মী এবং তাঁদের পরিবারের সদস্যদের সরিয়ে নেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
তবে এই নির্দেশের অর্থ এই নয় যে সৌদি আরবে অবস্থিত সব মার্কিন কূটনৈতিক স্থাপনা বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে কিংবা সব মার্কিন নাগরিককে দেশ ছাড়তে বলা হয়েছে। নির্দেশটি মূলত নির্দিষ্ট শ্রেণির মার্কিন সরকারি কর্মী ও তাঁদের পরিবারের জন্য প্রযোজ্য।
মার্কিন নির্দেশের সময় সৌদি আরবের পূর্বাঞ্চলে অবস্থিত কিং ফাহদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে হামলার ঘটনায় অন্তত একজন নিহত এবং আটজন আহত হওয়ার খবর পাওয়া গেছে।
সৌদি আরবের বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের তথ্য অনুযায়ী, হামলার ঘটনায় বিমানবন্দরকেন্দ্রিক নিরাপত্তা পরিস্থিতি আরও উদ্বেগজনক হয়ে ওঠে। সাম্প্রতিক সময়ে দেশটির বিভিন্ন বিমানবন্দরকে লক্ষ্য করে হামলার আশঙ্কা তৈরি হওয়ায় বিমান চলাচলেও বিঘ্ন দেখা দিয়েছে।
এর আগে রিয়াদের কিং খালিদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরেও হামলার ঘটনা ঘটেছিল। নিরাপত্তাঝুঁকির কারণে বিমানবন্দরটির কার্যক্রমে সীমাবদ্ধতা আরোপ করা হয়। পরে সীমিত পরিসরে কিছু ফ্লাইট চলাচল শুরু হলেও সব আন্তর্জাতিক উড়োজাহাজ সংস্থার স্বাভাবিক কার্যক্রম ফিরেছে—এমন তথ্য পাওয়া যায়নি।
সৌদি আরবের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলে অবস্থিত শায়বাহ তেলক্ষেত্রকে লক্ষ্য করে চালানো ড্রোন হামলার ঘটনায়ও প্রাণহানি ঘটেছে।
সৌদি জ্বালানি মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, তেল স্থাপনা লক্ষ্য করে আসা একটি ড্রোন প্রতিহত করার পর এর ধ্বংসাবশেষ পড়ে দুইজন নিহত হন এবং আরও দুজন আহত হন। নিহত ব্যক্তিরা ছিলেন ফিলিপাইন ও নেপালের নাগরিক। আহতদের মধ্যে পাকিস্তান ও ভারতের নাগরিক রয়েছেন বলে সংশ্লিষ্ট প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে।
শায়বাহ তেলক্ষেত্র সৌদি আরবের গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি স্থাপনাগুলোর একটি। ফলে এ ধরনের হামলা দেশটির জ্বালানি অবকাঠামোর নিরাপত্তার পাশাপাশি আঞ্চলিক জ্বালানি সরবরাহ নিয়েও উদ্বেগ সৃষ্টি করছে।
তবে হামলাগুলোর প্রতিটি ঘটনার দায় কার, তা নির্ধারণে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের আনুষ্ঠানিক বক্তব্য ও তদন্তের ফল আলাদাভাবে বিবেচনা করা প্রয়োজন।
ইয়েমেনের হুথি আন্দোলন দেশটির দীর্ঘদিনের সংঘাতের অন্যতম প্রধান পক্ষ। ইরানের সঙ্গে গোষ্ঠীটির সম্পর্ক রয়েছে এবং যুক্তরাষ্ট্র হুথিদের ইরান-সমর্থিত হিসেবে উল্লেখ করে।
২০১৪ সালে ইয়েমেনে সংঘাত তীব্র হওয়ার পর সৌদি আরব আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত ইয়েমেনি সরকারকে সমর্থন দিয়ে আসছে। ২০১৫ সাল থেকে সৌদি নেতৃত্বাধীন জোট ইয়েমেনের যুদ্ধে অংশ নেয়। দীর্ঘ সংঘাতের পর যুদ্ধবিরতির মাধ্যমে উত্তেজনা কিছুটা কমলেও সাম্প্রতিক সময়ে নতুন করে সংঘর্ষ বেড়েছে।
হুথিদের হামলা এবং সৌদি আরবের নিরাপত্তা ব্যবস্থার পাল্টা পদক্ষেপের ফলে পরিস্থিতি আবারও অস্থিতিশীল হয়ে উঠেছে। এই সংঘাত বৃহত্তর মধ্যপ্রাচ্যের উত্তেজনার সঙ্গেও যুক্ত হয়ে পড়েছে, যেখানে যুক্তরাষ্ট্র, ইসরায়েল ও ইরানের মধ্যে চলমান সংঘাত আঞ্চলিক নিরাপত্তাকে আরও জটিল করেছে।
আরও পড়ুন:







