News Ticker
221.png

কিশোরের চোখের ওপরে গজালো দাঁত!

অনলাইন ডেস্ক

প্রকাশিত: ২২ অক্টোবর, ২০২৬ ২২:৪৫

শেয়ার

শেয়ার

কিশোরের চোখের ওপরে গজালো দাঁত!
ছবি: সংগৃহীত

সাধারণত মানুষের দাঁত মুখের ভেতরে, মাড়ির মধ্য দিয়ে বের হয়। কিন্তু ভারতের এক কিশোরের বাঁ চোখের ওপরের অংশে গজিয়ে উঠেছে পূর্ণবিকশিত একটি দাঁত! প্রথমে চোখের পাতায় দেখা দিয়েছিল ব্যথাহীন ফোলা। পরে চোখের পাতা ও ভ্রুর মাঝখান দিয়ে বেরিয়ে আসে শক্ত, সাদা রঙের দুটি সূচালো অংশ। পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর চিকিৎসকেরা জানতে পারেন, সেগুলো কোনো সাধারণ গুটি নয়, বরং একটি দাঁতের অংশ।

চিকিৎসাবিজ্ঞানের এই বিরল ঘটনাটি ঘটেছে ভারতের তামিলনাড়ু রাজ্যের মাদুরাইয়ে। ১৬ বছর বয়সী ওই কিশোরের চিকিৎসা করেন আরবিন্দ আই হাসপাতালের বিশেষজ্ঞরা। সিটি স্ক্যানের মাধ্যমে তাঁর চোখের কোটরের ওপরের অংশে দাঁতের অস্তিত্ব নিশ্চিত হওয়ার পর অস্ত্রোপচার করে সেটি অপসারণ করা হয়। চিকিৎসকদের মতে, চোখের কোটরের এই নির্দিষ্ট স্থানে দাঁত গজানোর ঘটনা এর আগে চিকিৎসাবিজ্ঞানের নথিতে পাওয়া যায়নি।

ঘটনাটি নিয়ে প্রকাশিত গবেষণাপত্রটি আন্তর্জাতিক চিকিৎসা সাময়িকী Ophthalmology-তে প্রকাশিত হয়েছে। খবরটি নতুন করে আলোচনায় আসে ২০২৬ সালের সেপ্টেম্বর ও অক্টোবরে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমে প্রতিবেদন প্রকাশের পর।

চিকিৎসকদের প্রকাশিত বিবরণ অনুযায়ী, কিশোরটির বাঁ চোখের ওপরের পাতায় প্রায় এক মাস ধরে ফোলা ছিল। তবে শুরুতে কোনো ব্যথা অনুভব করেননি তিনি। চোখের আশপাশে আঘাত পাওয়ারও কোনো ইতিহাস ছিল না।

কিছুদিন পর চোখের পাতা ও ভ্রুর মাঝামাঝি জায়গায় শক্ত, সাদা রঙের দুটি অংশ বাইরে বেরিয়ে আসতে দেখা যায়। অস্বাভাবিক এই পরিবর্তনের কারণে তাঁকে হাসপাতালে নেওয়া হয়।

চিকিৎসকেরা প্রথমে পরীক্ষা করে বুঝতে পারেননি, সাদা অংশ দুটি ঠিক কী। চোখের পাতায় এমন অস্বাভাবিক গঠন কোনো বহিরাগত বস্তু, অস্বাভাবিক টিস্যু কিংবা বিরল ধরনের টিউমারের কারণে হতে পারে বলে তাঁরা বিবেচনা করেন।

পরিস্থিতির প্রকৃত কারণ জানতে তাঁরা সিটি স্ক্যান করার সিদ্ধান্ত নেন।

সিটি স্ক্যানের ফলাফল চিকিৎসকদের সামনে সম্পূর্ণ ভিন্ন একটি চিত্র তুলে ধরে। পরীক্ষায় দেখা যায়, কিশোরটির বাঁ চোখের কোটরের ওপরের হাড়সংলগ্ন অংশ থেকে একটি দাঁতের মতো গঠন সামনের দিকে বিস্তৃত হয়েছে।

গঠনটির মধ্যে দাঁতের মুকুট বা ক্রাউন এবং শিকড়ের বৈশিষ্ট্য স্পষ্ট ছিল। বাইরে বেরিয়ে থাকা দুটি সাদা অংশও ওই দাঁতেরই অংশ।

অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে গঠনটি অপসারণের পর চিকিৎসকেরা নিশ্চিত হন, এটি একটি পূর্ণবিকশিত ক্যানাইন দাঁত। ক্যানাইন হলো মানুষের সামনের দাঁতগুলোর পাশের অপেক্ষাকৃত সূচালো দাঁত, যা খাবার ছিঁড়তে সাহায্য করে।

পরীক্ষায় দাঁতটি টেরাটোমা নামের বিরল টিউমারের অংশ—এমন কোনো বৈশিষ্ট্য পাওয়া যায়নি। টেরাটোমা এমন এক ধরনের টিউমার, যাতে দাঁত, হাড় বা অন্যান্য ধরনের টিস্যু থাকতে পারে।

চিকিৎসাবিজ্ঞানে স্বাভাবিক অবস্থান থেকে সরে গিয়ে শরীরের অস্বাভাবিক স্থানে দাঁত তৈরি হওয়া বা বেরিয়ে আসার ঘটনাকে বলা হয় ‘একটোপিক টুথ’ (Ectopic tooth)।

সাধারণত দাঁত চোয়ালের নির্দিষ্ট স্থানে গড়ে ওঠে। কিন্তু বিরল ক্ষেত্রে দাঁত নাকের ভেতর, নাসারন্ধ্রের আশপাশে, মুখের তালু কিংবা গালের হাড়ের ভেতরে থাকা ম্যাক্সিলারি সাইনাসে পাওয়া যেতে পারে।

কিশোরটির ক্ষেত্রে দাঁতটি মুখের স্বাভাবিক দাঁতের সারির বাইরে, চোখের কোটরের ওপরের অংশে তৈরি হয়েছিল। এই অবস্থানই ঘটনাটিকে বিশেষভাবে বিরল করে তুলেছে।

তবে কেন দাঁতটি সেখানে তৈরি হয়েছিল, তা চিকিৎসকেরা নির্দিষ্টভাবে শনাক্ত করতে পারেননি। দাঁতের বিকাশের সময় অস্বাভাবিকতা, জিনগত কারণ, সংক্রমণ কিংবা আঘাতের মতো বিষয় একটোপিক দাঁতের সম্ভাব্য কারণ হিসেবে বিবেচিত হয়। কিন্তু এই কিশোরের ক্ষেত্রে এসবের কোনো নির্দিষ্ট কারণ নিশ্চিত করা যায়নি।

পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর চিকিৎসকেরা অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে কিশোরটির চোখের কোটরের ওপরের অংশে থাকা দাঁতটি অপসারণ করেন। অপসারিত দাঁতটি পরীক্ষা করে সেটিকে পূর্ণবিকশিত ক্যানাইন হিসেবে শনাক্ত করা হয়।

ইমেজিং পরীক্ষায় শরীরের অন্য কোথাও এ ধরনের অতিরিক্ত অস্বাভাবিক দাঁত থাকার প্রমাণ পাওয়া যায়নি। চিকিৎসকদের মতে, তাই ভবিষ্যতে আরেকটি একটোপিক দাঁত দেখা দেওয়ার আশঙ্কা কম বলে মনে করা হচ্ছে।

তবে দাঁতটি ঠিক কী কারণে চোখের ওপরের অংশে তৈরি হয়েছিল, সে বিষয়ে নিশ্চিত ব্যাখ্যা পাওয়া যায়নি।

একটোপিক দাঁতের ঘটনা চিকিৎসাবিজ্ঞানে একেবারে নতুন নয়। এর আগে নাকের গহ্বর, মুখের তালু, ম্যাক্সিলারি সাইনাস এবং চোখের কোটরের নিচের অংশে দাঁত পাওয়ার ঘটনা নথিভুক্ত হয়েছে।

কিন্তু চোখের কোটরের ওপরের অংশে, ভ্রু ও চোখের পাতার মধ্যবর্তী স্থান দিয়ে দাঁত বাইরে বেরিয়ে আসার ঘটনা চিকিৎসকদের পর্যালোচিত গবেষণায় আগে পাওয়া যায়নি। এ কারণেই ঘটনাটিকে বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট গবেষকেরা।

এই ঘটনা আরও একবার দেখিয়েছে, শরীরের কোনো স্থানে অস্বাভাবিক ফোলা বা গঠন দেখা দিলে শুধু বাহ্যিক লক্ষণ দেখে সিদ্ধান্ত নেওয়া ঠিক নয়। সঠিক রোগ নির্ণয়ের জন্য প্রয়োজন অনুযায়ী শারীরিক পরীক্ষা ও ইমেজিং পরীক্ষা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

ChannelNRB Footer