ভেনেজুয়েলায় অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচনের দাবিতে রাজপথে নেমেছেন হাজারো মানুষ। সাবেক প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোকে ক্ষমতাচ্যুত করে যুক্তরাষ্ট্রের বাহিনীর হাতে আটক হওয়ার কয়েক মাস পর দেশটির বিভিন্ন শহরে বড় ধরনের বিক্ষোভ করেছেন বিরোধী রাজনৈতিক দলের সমর্থকরা। তাঁদের প্রধান দাবি, দ্রুত প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের তারিখ ঘোষণা, রাজনৈতিক বন্দিদের মুক্তি এবং বিরোধী নেত্রী মারিয়া কোরিনা মাচাদোর দেশে ফেরার সুযোগ নিশ্চিত করা।
বৃহস্পতিবার (২২ অক্টোবর) রাজধানী কারাকাসসহ ভেনেজুয়েলার বিভিন্ন শহরে এ বিক্ষোভ অনুষ্ঠিত হয়। প্রায় দুই বছরের মধ্যে এটিকে দেশটিতে বিরোধীদের প্রথম দেশব্যাপী বড় বিক্ষোভ হিসেবে উল্লেখ করেছে।
বিক্ষোভকারীদের প্রধান দাবি, ২০২৭ সালের মধ্যে প্রেসিডেন্ট নির্বাচন আয়োজনের বিষয়ে সুস্পষ্ট সময়সূচি ঘোষণা করতে হবে। বিরোধী নেত্রী মারিয়া কোরিনা মাচাদো আগামী বছরের জুলাইয়ের মধ্যে নির্বাচন আয়োজনের পক্ষে অবস্থান জানিয়েছেন। বিরোধীদের একটি অংশ ২০২৭ সালের ২৪ জুলাই নির্বাচনের সম্ভাব্য তারিখ হিসেবেও প্রস্তাব করেছে।
তবে এখন পর্যন্ত প্রেসিডেন্ট নির্বাচন কিংবা আইনসভা নির্বাচনের নির্দিষ্ট তারিখ ঘোষণা করা হয়নি। অন্তর্বর্তী প্রেসিডেন্ট দেলসি রদ্রিগেজ এবং যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প নির্বাচন আয়োজনের কথা বললেও ভোটের সময়সূচি নিয়ে অনিশ্চয়তা রয়ে গেছে।
বিক্ষোভকারীদের মতে, শুধু নির্বাচনের প্রতিশ্রুতি যথেষ্ট নয়; ভোটের তারিখ, নির্বাচনী ব্যবস্থার নিরপেক্ষতা এবং রাজনৈতিক অংশগ্রহণের নিশ্চয়তাও প্রয়োজন।
বিক্ষোভের অন্যতম প্রধান বিষয় ছিল বিরোধী নেত্রী ও ২০২৫ সালের নোবেল শান্তি পুরস্কার বিজয়ী মারিয়া কোরিনা মাচাদোর দেশে ফেরার দাবি। তাঁর নেতৃত্বাধীন রাজনৈতিক আন্দোলন ভেন্তে ভেনেজুয়েলা (Vente Venezuela) বিক্ষোভের আয়োজন করে।
কারাকাস ছাড়াও ভ্যালেন্সিয়া, মারাকাই, সান ক্রিস্তোবাল ও মারাকাইবোসহ বিভিন্ন শহরে বিরোধী সমর্থকেরা সমাবেশ করেন। তাঁদের হাতে ভেনেজুয়েলার জাতীয় পতাকা ও মাচাদোর সমর্থনে বিভিন্ন ব্যানার দেখা যায়।
বিরোধীদের দাবি, রাজনৈতিক নেতাদের অবাধে দেশে ফেরা, নির্বাচনে অংশগ্রহণ এবং রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড পরিচালনার অধিকার নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে রাজনৈতিক কারণে আটক ব্যক্তিদের মুক্তির দাবিও তোলেন বিক্ষোভকারীরা।
চলতি বছরের জানুয়ারিতে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক অভিযানে নিকোলাস মাদুরো আটক হওয়ার পর ভেনেজুয়েলার রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে বড় পরিবর্তন আসে। এরপর দেশটির অন্তর্বর্তী সরকারের নেতৃত্বে রয়েছেন দেলসি রদ্রিগেজ, যিনি মাদুরোর সরকারের ভাইস প্রেসিডেন্ট ছিলেন।
মাদুরো ও তাঁর পূর্বসূরি হুগো চাভেজের আমলে বিরোধী রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড, নির্বাচন এবং নাগরিক স্বাধীনতা নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে বিতর্ক চলে আসছিল। ২০২৪ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচন ঘিরেও তীব্র বিরোধ দেখা দেয়।
বিরোধী পক্ষ প্রকাশিত ভোটের হিসাবের ভিত্তিতে দাবি করে, তাদের সমর্থিত প্রার্থী জয়ী হয়েছিলেন। অন্যদিকে, সরকার ও দেশটির নির্বাচনী কর্তৃপক্ষ মাদুরোর বিজয়কে স্বীকৃতি দিয়েছিল। পূর্ণাঙ্গ ভোটের হিসাব প্রকাশ না করা নিয়ে বিরোধীদের আপত্তিও রয়েছে।
মাদুরোর আটক হওয়ার পর নির্বাচন আয়োজনের প্রত্যাশা তৈরি হলেও অন্তর্বর্তী সরকারের অধীনে রাজনৈতিক রূপান্তরের গতি ও নির্বাচনের সময়সূচি নিয়ে বিরোধীদের মধ্যে অসন্তোষ বাড়ছে।
বিক্ষোভে রাজনৈতিক বন্দিদের মুক্তির দাবিও সামনে আসে। মানবাধিকার সংগঠন ফোরো পেনাল (Foro Penal)-এর হিসাব অনুযায়ী, সাধারণ ক্ষমা আইনের আওতায় কিছু বন্দি মুক্তি পেলেও দেশটিতে ৩২০ জনের বেশি রাজনৈতিক বন্দি তখনো কারাগারে ছিলেন বলে সংগঠনটি জানিয়েছে।
তবে ভেনেজুয়েলার সরকার রাজনৈতিক বন্দি রাখার অভিযোগ অস্বীকার করে আসছে। সরকার সাধারণ ক্ষমা আইনকে বন্দিদের মুক্তির ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবেও তুলে ধরেছে।
বিরোধী সমর্থক ও মানবাধিকারকর্মীদের মতে, রাজনৈতিক বন্দিদের মুক্তি এবং নাগরিক স্বাধীনতা নিশ্চিত করা ছাড়া গ্রহণযোগ্য রাজনৈতিক রূপান্তর কঠিন হবে।
ভেনেজুয়েলার সামনে এখন বড় প্রশ্ন—কবে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে এবং সেই নির্বাচনে সব রাজনৈতিক পক্ষ কতটা স্বাধীনভাবে অংশ নিতে পারবে। নির্বাচন আয়োজনের প্রতিশ্রুতি থাকলেও নির্দিষ্ট সময়সূচি ঘোষণা না হওয়ায় রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা অব্যাহত রয়েছে।
বৃহস্পতিবারের বিক্ষোভে হাজারো মানুষের অংশগ্রহণ নির্বাচনের দাবি এবং রাজনৈতিক পরিবর্তন নিয়ে বিরোধী সমর্থকদের চাপের প্রতিফলন। তবে এই আন্দোলন অন্তর্বর্তী সরকারের নীতিতে কী পরিবর্তন আনবে, তা এখনো স্পষ্ট নয়।
নির্বাচনের তারিখ নির্ধারণ, রাজনৈতিক বন্দিদের মুক্তি, বিরোধী নেতাদের অংশগ্রহণের সুযোগ এবং নিরপেক্ষ নির্বাচনী প্রতিষ্ঠান গঠনের অগ্রগতির ওপরই ভেনেজুয়েলার পরবর্তী রাজনৈতিক পরিস্থিতি অনেকাংশে নির্ভর করবে।
আরও পড়ুন:







