News Ticker
221.png

তিউনিসিয়ায় পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষ, বিক্ষোভে উত্তাল রাজধানী

অনলাইন ডেস্ক

প্রকাশিত: ২৩ অক্টোবর, ২০২৬ ১৮:২৫

শেয়ার

শেয়ার

তিউনিসিয়ায় পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষ, বিক্ষোভে উত্তাল রাজধানী
ছবি: সংগৃহীত

উত্তর আফ্রিকার দেশ তিউনিসিয়ায় পুলিশের সঙ্গে বিক্ষোভকারীদের সংঘর্ষে উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে রাজধানী তিউনিসের আশপাশের এলাকা। আটক এক ব্যক্তির মৃত্যুকে কেন্দ্র করে বৃহস্পতিবার (২২ অক্টোবর) বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে পুলিশ কাঁদানে গ্যাস নিক্ষেপ করলে বিক্ষোভকারীদের সঙ্গে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সংঘর্ষ হয়। একই দিনে দেশটির দক্ষিণাঞ্চলের কয়েকটি শহরেও বিক্ষোভ ও সংঘর্ষের খবর পাওয়া গেছে।

জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি, জনসেবার মানের অবনতি, নিরাপত্তা বাহিনীর ভূমিকা এবং রাজনৈতিক স্বাধীনতা নিয়ে ক্রমবর্ধমান অসন্তোষের মধ্যে নতুন করে এই উত্তেজনা দেখা দিয়েছে।

রাজধানী তিউনিসের উপকণ্ঠে ইত্তাদামেন এলাকায় মাদক ব্যবসার সন্দেহে আটক এক ব্যক্তির মৃত্যুর পর বিক্ষোভ শুরু হয়। নিহত ব্যক্তির পরিবারের অভিযোগ, আটকের পর পুলিশের নির্যাতনের কারণে তাঁর মৃত্যু হয়েছে। তাঁরা ঘটনার নিরপেক্ষ তদন্ত এবং দায়ীদের বিচারের দাবি জানিয়েছেন।

তবে স্থানীয় গণমাধ্যমের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ওই ব্যক্তি মাদকদ্রব্য গিলে ফেলার পর মারা যান। ফলে তাঁর মৃত্যুর প্রকৃত কারণ নিয়ে পরস্পরবিরোধী বক্তব্য পাওয়া যাচ্ছে।

বিক্ষোভকারীরা সড়ক অবরোধ করেন, টায়ারে আগুন জ্বালান এবং পুলিশের দিকে পাথর নিক্ষেপ করেন। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পুলিশ কাঁদানে গ্যাস ব্যবহার করে। একই সঙ্গে ওই এলাকায় জাতীয় নিরাপত্তা বাহিনীর একটি স্থাপনার নিরাপত্তা জোরদারের চেষ্টা চালানো হয়।

নিহত ব্যক্তির মৃত্যুর প্রকৃত কারণ নিয়ে স্বাধীন তদন্তের দাবি উঠলেও এ বিষয়ে কর্তৃপক্ষের পূর্ণাঙ্গ বক্তব্য তাৎক্ষণিকভাবে পাওয়া যায়নি।

রাজধানীর বাইরে দক্ষিণাঞ্চলীয় স্ফাক্স গভর্নরেটের জেবিনিয়ানা ও আগারেব শহরেও পুলিশের সঙ্গে বিক্ষোভকারীদের সংঘর্ষ হয়েছে।

জেবিনিয়ানায় নিরাপত্তা বাহিনীর ধাওয়া চলাকালে এক ব্যক্তির মৃত্যুর অভিযোগ তুলে তাঁর স্বজনেরা প্রতিবাদ জানান। এ ঘটনাকে কেন্দ্র করে বিক্ষোভকারীদের সঙ্গে পুলিশের সংঘর্ষ বাধে। স্থানীয় সংবাদমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী, বিক্ষোভের সময় একটি গাড়িতে আগুন দেওয়া হয় এবং বিভিন্ন স্থানে টায়ার জ্বালানো হয়। পুলিশ পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে কাঁদানে গ্যাস ব্যবহার করে।

একই অঞ্চলের আগারেব শহরেও উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। একাধিক স্থানে এ ধরনের সংঘর্ষের ঘটনা দেশটির আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে নতুন উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে।

স্ফাক্স শহরে এক শিক্ষার্থীর মৃত্যুকে কেন্দ্র করেও প্রতিবাদ হয়েছে। হৃদ্‌যন্ত্রের সমস্যায় আক্রান্ত ওই নারী শিক্ষার্থীর কাছে অ্যাম্বুলেন্স পৌঁছাতে দেরি হয়েছিল বলে তাঁর সহপাঠীদের অভিযোগ।

তাঁদের দাবি, পর্যাপ্ত চিকিৎসা অবকাঠামোর অভাব এবং জরুরি সেবার দুর্বলতার কারণে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়েছে। এ ঘটনার প্রতিবাদে শুক্রবার বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন অনুষদে ধর্মঘটের ডাক দেন শিক্ষার্থীরা।

চিকিৎসাসেবা, পরিবহন, বিদ্যুৎ ও পানির মতো মৌলিক পরিষেবার ঘাটতি নিয়ে তিউনিসিয়ার বিভিন্ন এলাকায় দীর্ঘদিন ধরে অসন্তোষ রয়েছে। নতুন ঘটনাগুলো সেই ক্ষোভকে আরও বাড়িয়ে তুলেছে।

তিউনিসিয়ায় সাম্প্রতিক অস্থিরতা শুধু আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে গভীর অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক সংকট।

গত শনিবার রাজধানীতে প্রেসিডেন্ট কাইস সাঈদের বিরুদ্ধে সাম্প্রতিক বছরগুলোর অন্যতম বড় বিক্ষোভ অনুষ্ঠিত হয়। আয়োজক ও সংবাদমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী, হাজারো মানুষ ওই কর্মসূচিতে অংশ নেন। তাঁরা জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি, রাজনৈতিক স্বাধীনতা সংকুচিত হওয়া এবং গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোর দুর্বলতার প্রতিবাদ জানান।

বিক্ষোভকারীদের অভিযোগ, প্রেসিডেন্ট সাঈদের অধীনে ক্ষমতা ক্রমেই রাষ্ট্রপতির হাতে কেন্দ্রীভূত হয়েছে এবং বিরোধী মত প্রকাশের সুযোগ সীমিত হয়েছে। একই সঙ্গে অর্থনৈতিক দুরবস্থা ও সরকারি সেবার মান নিয়ে জনঅসন্তোষ বেড়েছে।

উল্লেখ্য, ২০২১ সালে কাইস সাঈদ পার্লামেন্ট স্থগিত ও সরকার বরখাস্ত করার পর দেশটির রাজনৈতিক ব্যবস্থায় বড় পরিবর্তন আসে। পরবর্তী সময়ে নতুন সংবিধানের মাধ্যমে প্রেসিডেন্টের ক্ষমতা আরও বৃদ্ধি পায়। এ নিয়ে বিরোধী দল ও নাগরিক সমাজের বিভিন্ন অংশের মধ্যে উদ্বেগ রয়েছে।

বিশ্লেষণধর্মী পর্যবেক্ষণে দেখা যাচ্ছে, তিউনিসিয়ায় সাম্প্রতিক বিক্ষোভের পেছনে একাধিক কারণ কাজ করছে। একদিকে জীবনযাত্রার ব্যয় ও কর্মসংস্থান নিয়ে উদ্বেগ, অন্যদিকে জনসেবার ঘাটতি এবং রাজনৈতিক স্বাধীনতা নিয়ে অসন্তোষ—সব মিলিয়ে পরিস্থিতি জটিল হয়ে উঠছে।

আটক ব্যক্তির মৃত্যুর ঘটনা নিয়ে নিরপেক্ষ তদন্ত না হলে জনঅসন্তোষ আরও বাড়তে পারে। একই সঙ্গে শিক্ষার্থীদের প্রতিবাদ এবং দক্ষিণাঞ্চলে সংঘর্ষের বিস্তার সরকারকে নতুন চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলেছে।

তিউনিসিয়া ২০১১ সালের গণ-অভ্যুত্থানের মাধ্যমে দীর্ঘদিনের শাসক জিন আল-আবিদিন বেন আলিকে ক্ষমতাচ্যুত করেছিল। সেই অভিজ্ঞতার পর দেশটিতে গণতান্ত্রিক অধিকার ও রাজনৈতিক স্বাধীনতা নিয়ে মানুষের প্রত্যাশা এখনও গুরুত্বপূর্ণ। বর্তমান অস্থিরতা তাই দেশটির রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নিয়েও নতুন প্রশ্ন তুলছে।

ChannelNRB Footer