অনলাইনে পরিচয়, এরপর প্রেমের সম্পর্ক। সেই সম্পর্কের টানেই যুক্তরাজ্য থেকে রাশিয়ার কৃষ্ণসাগরীয় অঞ্চলে গিয়েছিলেন ২৩ বছর বয়সী ডেভিড-অ্যাড্রিয়ান কেরচো। কিন্তু সেই সফরই শেষ পর্যন্ত তাঁকে নিয়ে যায় কারাগারে। ইউক্রেনের হয়ে গুপ্তচরবৃত্তির অভিযোগে রাশিয়ার একটি আদালত তাঁকে ১৫ বছরের কারাদণ্ড দিয়েছে। তবে কেরচো অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। তাঁর পরিবারের দাবি, প্রেমের সম্পর্কের সূত্র ধরে বিদেশে যাওয়ার পর তিনি এক জটিল নিরাপত্তা ও বিচারিক পরিস্থিতির মধ্যে আটকা পড়েন।
বার্তা সংস্থা রয়টার্সের অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে উঠে এসেছে এই ঘটনার নানা দিক। বিশেষ করে রুশ নিরাপত্তা সংস্থা এফএসবি প্রকাশিত তাঁর গ্রেপ্তারের ভিডিওর সময় ও স্থান নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। আদালতের নথি ও ভিডিও বিশ্লেষণ করে রয়টার্স বলেছে, ভিডিওটি ধারণের সময় কেরচো ইতোমধ্যে কয়েক মাস ধরে রুশ হেফাজতে ছিলেন বলে প্রমাণ মেলে।
ডেভিড-অ্যাড্রিয়ান কেরচো রোমানিয়ার নাগরিক হলেও বেড়ে উঠেছেন যুক্তরাজ্যে। তিনি ইংল্যান্ডের রিডিং শহরে বসবাস করতেন এবং একটি ইলেকট্রনিকস পুনর্ব্যবহারকারী প্রতিষ্ঠানে কাজ করতেন।
২০২৩ সালের শেষ দিকে অনলাইনে ভ্যালেরিয়া নামের এক নারীর সঙ্গে তাঁর পরিচয় হয়। ওই নারী জর্জিয়ার বিচ্ছিন্নতাবাদী নিয়ন্ত্রণাধীন অঞ্চল আবখাজিয়ার বাসিন্দা বলে জানা গেছে। ধীরে ধীরে তাঁদের মধ্যে প্রেমের সম্পর্ক গড়ে ওঠে।
পরিবারের ভাষ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালের আগস্টে কেরচো তুরস্ক হয়ে কৃষ্ণসাগরীয় অঞ্চলে যান। প্রথমে রাশিয়ার সোচি শহরে ভ্যালেরিয়ার সঙ্গে দেখা করেন তিনি। পরে দুজন আবখাজিয়ায় যান, যেখানে কেরচো কয়েক মাস অবস্থান করেন।
কিন্তু সময়ের সঙ্গে তাঁদের সম্পর্কের অবনতি ঘটে। অর্থসংকট দেখা দেওয়ায় কেরচো দেশে ফেরার পরিকল্পনা করেন। পরিবারের কাছে তিনি জানান, ২০২৪ সালের ২৮ নভেম্বর তাঁর ফেরার কথা ছিল।
কিন্তু নির্ধারিত দিনে পরিবারের সদস্যরা তাঁর সঙ্গে যোগাযোগ করতে ব্যর্থ হন। পরে কারাগার থেকে লেখা চিঠিতে কেরচো জানান, ওই দিনই আবখাজিয়ায় তাঁকে আটক করা হয়েছিল।
আবখাজিয়ার রুশপন্থি বিচ্ছিন্নতাবাদী কর্তৃপক্ষ ২০২৪ সালের ডিসেম্বরে কেরচোর আটকের খবর প্রকাশ করে। তাঁদের অভিযোগ ছিল, তিনি ইউক্রেনের গোয়েন্দা সংস্থার সঙ্গে যোগাযোগ করেছিলেন এবং সামরিক স্থাপনার অবস্থান সম্পর্কে তথ্য সংগ্রহের দায়িত্ব পেয়েছিলেন।
পরবর্তী সময়ে রাশিয়ার নিরাপত্তা সংস্থা এফএসবি অভিযোগ করে, ২০২৪ সালের গ্রীষ্মে কেরচো সোচি অঞ্চলে রুশ আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থার অবস্থানসংক্রান্ত তথ্য ইউক্রেনের একটি গোয়েন্দা সংস্থাকে সরবরাহ করেছিলেন।
রুশ কর্তৃপক্ষের দাবি, শত্রুপক্ষের কাজে লাগে এমন তথ্য সরবরাহের মাধ্যমে তিনি রাশিয়ার নিরাপত্তার ক্ষতি করার চেষ্টা করেন। এই অভিযোগে তাঁকে দোষী সাব্যস্ত করে ১৫ বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়।
তবে কেরচো এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। তাঁর বক্তব্য, স্বীকারোক্তিমূলক ভিডিওতে যা বলা হয়েছে, তা সত্য নয় এবং তাঁর বিরুদ্ধে অভিযোগ সাজানো হয়েছে।
এই মামলার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো কেরচোর গ্রেপ্তারের ভিডিও। রাশিয়ার এফএসবি প্রকাশিত ভিডিওতে দেখা যায়, সোচির একটি পার্কে নিরাপত্তা কর্মকর্তারা তাঁকে আটক করছেন।
ভিডিওটি এমনভাবে প্রকাশ করা হয়েছিল, যেন ঘটনাস্থলেই তাঁর গ্রেপ্তার হয়েছে। কিন্তু রয়টার্স আদালতের নথি, ভিডিওর দৃশ্য এবং স্থানসংক্রান্ত তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখতে পায়, ভিডিও ধারণের সময় কেরচো ইতোমধ্যে কয়েক মাস ধরে রুশ হেফাজতে ছিলেন।
আদালতের নথি অনুযায়ী, আবখাজিয়ায় আটক হওয়ার পর তাঁকে রাশিয়ার হেফাজতে নেওয়া হয় এবং ২০২৪ সালের ১৪ ডিসেম্বর সোচির একটি আদালতে হাজির করা হয়েছিল। পরবর্তী কয়েক মাসে তাঁর আটকাদেশ বাড়ানোর জন্য একাধিকবার আদালতে হাজিরা হয়।
অন্যদিকে, ভিডিওর দৃশ্য বিশ্লেষণে বসন্তকালের পরিবেশের ইঙ্গিত পাওয়া যায়। রয়টার্সের অনুসন্ধান অনুযায়ী, ভিডিওটি ২০২৫ সালের এপ্রিলের দিকে ধারণ করা হয়ে থাকতে পারে। কেরচোও পরিবারের কাছে লেখা চিঠিতে দাবি করেন, কারাগার থেকে তাঁকে বের করে এনে গ্রেপ্তারের দৃশ্য ধারণ করা হয়েছিল।
রাশিয়ার একজন আইনজীবী রয়টার্সকে জানিয়েছেন, নিরাপত্তা সংস্থার হাতে আগে থেকেই আটক ব্যক্তিদের নিয়ে পরে গ্রেপ্তারের দৃশ্য ধারণের ঘটনা তাঁর পরিচিত। তবে ভিডিও ধারণের সঠিক তারিখ স্বাধীনভাবে নিশ্চিত করা যায়নি।
কারাগার থেকে লেখা চিঠিতে কেরচো অভিযোগ করেছেন, আটকের পর তাঁকে মারধর করা হয়েছে, বিচ্ছিন্ন অবস্থায় রাখা হয়েছে এবং নির্যাতন করা হয়েছে। তাঁর দাবি, স্বীকারোক্তিমূলক বক্তব্যও চাপ প্রয়োগ করে আদায় করা হয়েছিল।
তবে এসব নির্যাতনের অভিযোগ রয়টার্স স্বাধীনভাবে যাচাই করতে পারেনি। রুশ নিরাপত্তা সংস্থার পক্ষ থেকেও এসব অভিযোগের বিষয়ে বিস্তারিত জবাব পাওয়া যায়নি।
কেরচোর পরিবার শুরু থেকেই তাঁর নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বিগ্ন ছিল। তাঁর মা জুলিয়া কেরচো ছেলেকে ওই অঞ্চলে না যাওয়ার পরামর্শ দিয়েছিলেন বলে জানিয়েছেন। কিন্তু প্রেমের সম্পর্কের কারণে তিনি সেখানে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন।
কারাগারে থাকা অবস্থায় কেরচো রুশ ভাষা শিখেছেন এবং পরিবারের কাছে চিঠি লিখেছেন। তাঁর প্রত্যাশা, আপিলের মাধ্যমে তিনি দণ্ডের বিরুদ্ধে আইনি লড়াই চালিয়ে যেতে পারবেন।
কেরচোর ঘটনা আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমে আলোচনার জন্ম দিয়েছে মূলত প্রেমের সম্পর্ক, বিদেশযাত্রা এবং রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা মামলার অস্বাভাবিক সংযোগের কারণে। পরিবারের বক্তব্য অনুযায়ী, তিনি প্রেমের সম্পর্কের টানেই ওই অঞ্চলে গিয়েছিলেন। কিন্তু সেখানে যাওয়ার পর তাঁর জীবন সম্পূর্ণ বদলে যায়।
কেরচো কারাগার থেকে লেখা চিঠিতে নিজের সিদ্ধান্তের জন্য অনুশোচনা প্রকাশ করেছেন। তাঁর বক্তব্যের সারকথা, প্রেমের মোহে তিনি সম্ভাব্য বিপদের লক্ষণগুলো বুঝতে পারেননি।
তবে তাঁকে পরিকল্পিতভাবে ফাঁদে ফেলা হয়েছিল কি না, তা নিশ্চিতভাবে প্রমাণিত হয়নি। ভ্যালেরিয়ার ভূমিকা সম্পর্কেও স্বাধীনভাবে যাচাই করা পর্যাপ্ত তথ্য প্রকাশিত হয়নি।
বর্তমানে কেরচোর সামনে প্রধান চ্যালেঞ্জ হলো দণ্ডের বিরুদ্ধে আইনি লড়াই চালানো এবং পরিবারের কাছে ফিরে যাওয়ার সুযোগ তৈরি করা। অন্যদিকে, গ্রেপ্তারের ভিডিও নিয়ে ওঠা প্রশ্ন এবং মামলার প্রমাণসংক্রান্ত অস্পষ্টতা ঘটনাটিকে আরও আলোচনায় রেখেছে।
আরও পড়ুন:







