News Ticker
221.png

ইউরোপে তীব্র গরমে ৫০ হাজার মানুষের মৃত্যু, বিজ্ঞানীদের সতর্কবার্তা

অনলাইন ডেস্ক

প্রকাশিত: ২৩ অক্টোবর, ২০২৬ ১৯:২৭

শেয়ার

শেয়ার

ইউরোপে তীব্র গরমে ৫০ হাজার মানুষের মৃত্যু, বিজ্ঞানীদের সতর্কবার্তা
ছবি: সংগৃহীত

ইউরোপে চলতি বছরের গ্রীষ্মে তীব্র দাবদাহে প্রাণহানির সংখ্যা ৫০ হাজার ছাড়িয়েছে বলে জানিয়েছেন বিজ্ঞানীরা। রেকর্ড ভাঙা তাপমাত্রা, দীর্ঘস্থায়ী তাপপ্রবাহ এবং জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে ২০২৬ সালের গ্রীষ্ম ইউরোপের শহরাঞ্চলে সাম্প্রতিক সময়ের সবচেয়ে প্রাণঘাতী গ্রীষ্মে পরিণত হয়েছে। নতুন এক গবেষণায় এমন উদ্বেগজনক তথ্য উঠে এসেছে।

গবেষকদের হিসাবে, ২০২৬ সালের জুন থেকে আগস্ট পর্যন্ত ইউরোপের ৩০টি দেশের ৮৫৪টি শহরে তাপজনিত আনুমানিক ৫০ হাজার ৩৯১টি মৃত্যু ঘটেছে। এর মধ্যে প্রায় ৩২ হাজার ৬১৯টি মৃত্যুর জন্য মানবসৃষ্ট জলবায়ু পরিবর্তনকে দায়ী করা হয়েছে। অর্থাৎ, তাপজনিত মৃত্যুর প্রায় ৬৫ শতাংশের পেছনে মানুষের কর্মকাণ্ডের ফলে সৃষ্ট বৈশ্বিক উষ্ণায়নের ভূমিকা রয়েছে বলে গবেষণায় অনুমান করা হয়েছে।

২৩ অক্টোবর প্রকাশিত এই গবেষণা Nature Health সাময়িকীতে প্রকাশিত হয়েছে। গবেষণাটি পরিচালনা করেছেন লন্ডন স্কুল অব হাইজিন অ্যান্ড ট্রপিক্যাল মেডিসিন (LSHTM) এবং ইম্পেরিয়াল কলেজ লন্ডনের গবেষকেরা। 

গবেষণায় দেখা গেছে, ইউরোপের শহরাঞ্চলে ২০২৬ সালের গ্রীষ্মে তাপজনিত মৃত্যুর আনুমানিক সংখ্যা আগের কয়েকটি ভয়াবহ গ্রীষ্মের তুলনায় অনেক বেশি।

২০২২ সালের গ্রীষ্মে ইউরোপের সংশ্লিষ্ট শহরগুলোতে তাপজনিত মৃত্যুর আনুমানিক সংখ্যা ছিল ২৯ হাজার ৪৮০। ২০০৩ সালে এই সংখ্যা ছিল প্রায় ২৮ হাজার ৪৬২। কিন্তু ২০২৬ সালের গ্রীষ্মে তা বেড়ে ৫০ হাজার ৩৯১-এ পৌঁছেছে।

গবেষকদের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, ২০২২ সালের তুলনায় চলতি বছরের গ্রীষ্মে তাপজনিত মৃত্যুর সংখ্যা প্রায় ৭১ শতাংশ বেশি। ধারাবাহিক তাপপ্রবাহ, অস্বাভাবিক উচ্চ তাপমাত্রা এবং জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে এই পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হয়েছে বলে গবেষকেরা মনে করছেন।

তবে এই সংখ্যা সরাসরি নথিভুক্ত মৃত্যুর হিসাব নয়; তাপমাত্রা ও মৃত্যুহারের সম্পর্ক বিশ্লেষণ করে তৈরি করা পরিসংখ্যানভিত্তিক অনুমান।

গবেষণার সবচেয়ে উদ্বেগজনক দিক হলো, তীব্র গরমের কারণে ঘটে যাওয়া মৃত্যুর বড় অংশের সঙ্গে মানবসৃষ্ট জলবায়ু পরিবর্তনের সম্পর্ক পাওয়া গেছে।

গবেষকেরা বাস্তবে পর্যবেক্ষণ করা তাপমাত্রার সঙ্গে এমন একটি কাল্পনিক পরিস্থিতির তুলনা করেছেন, যেখানে মানুষের কর্মকাণ্ডের ফলে সৃষ্ট বৈশ্বিক উষ্ণায়ন ঘটেনি। এরপর তাপমাত্রার পার্থক্যের ভিত্তিতে সম্ভাব্য মৃত্যুহারের পরিবর্তন হিসাব করা হয়েছে।

এই বিশ্লেষণে দেখা গেছে, আনুমানিক ৩২ হাজার ৬১৯টি মৃত্যু বর্তমান জলবায়ু পরিবর্তনজনিত অতিরিক্ত তাপের সঙ্গে সম্পর্কিত। জীবাশ্ম জ্বালানি পোড়ানোসহ মানুষের বিভিন্ন কর্মকাণ্ড থেকে নির্গত গ্রিনহাউস গ্যাস বৈশ্বিক তাপমাত্রা বৃদ্ধির অন্যতম প্রধান কারণ।

গবেষকদের মতে, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব এখন শুধু দীর্ঘমেয়াদি পরিবেশগত সংকটের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই; এটি মানুষের জীবন ও জনস্বাস্থ্যের ওপর সরাসরি প্রভাব ফেলছে।

গবেষণায় ১৭ জুন থেকে ১ জুলাইয়ের মধ্যবর্তী সময়কে বিশেষভাবে বিপজ্জনক হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। এ সময়ে ইউরোপের বিভিন্ন অঞ্চলে তাপমাত্রা স্বাভাবিকের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে যায়।

গবেষকদের হিসাবে, পুরো গ্রীষ্মে অনুমান করা তাপজনিত মৃত্যুর প্রায় এক-তৃতীয়াংশ এই সময়ের মধ্যেই ঘটেছে।

দীর্ঘ সময় ধরে উচ্চ তাপমাত্রা বজায় থাকা এবং রাতেও পর্যাপ্ত শীতলতা না পাওয়া মানুষের শরীরের ওপর বাড়তি চাপ সৃষ্টি করে। বিশেষ করে বয়স্ক ব্যক্তি, দীর্ঘমেয়াদি রোগে আক্রান্ত মানুষ এবং পর্যাপ্ত শীতাতপ নিয়ন্ত্রণের ব্যবস্থা নেই—এমন বাসিন্দারা বেশি ঝুঁকিতে থাকেন।

বিশেষজ্ঞদের মতে, গ্রীষ্মের শুরুতেই হঠাৎ তাপমাত্রা বেড়ে গেলে মানুষের শরীর নতুন পরিস্থিতির সঙ্গে খাপ খাইয়ে নেওয়ার পর্যাপ্ত সময় পায় না। ফলে তাপজনিত অসুস্থতা ও মৃত্যুর ঝুঁকি বেড়ে যেতে পারে।

গবেষণায় ইউরোপের কয়েকটি দেশে তাপজনিত মৃত্যুর সংখ্যা বিশেষভাবে বেশি পাওয়া গেছে। দেশভিত্তিক হিসাবে ইতালি, ফ্রান্স, স্পেন, জার্মানি ও যুক্তরাজ্য সবচেয়ে বেশি প্রাণহানির শিকার হওয়া দেশগুলোর মধ্যে রয়েছে।

গবেষণার অনুমান অনুযায়ী, ২০২৬ সালের গ্রীষ্মে ইতালিতে তাপজনিত মৃত্যুর সংখ্যা ছিল প্রায় ১৩ হাজার ৩০৩। ফ্রান্সে এ সংখ্যা ৭ হাজার ২৬৮ এবং স্পেনে ৬ হাজার ৮২৪।

শুধু মোট মৃত্যুর সংখ্যা নয়, জনসংখ্যার অনুপাতে তাপজনিত মৃত্যুহারও বিভিন্ন অঞ্চলে উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি ছিল। ভূমধ্যসাগরীয় অঞ্চলের পাশাপাশি পশ্চিম ইউরোপের বিভিন্ন শহর তীব্র তাপপ্রবাহের কারণে ব্যাপক স্বাস্থ্যঝুঁকির মুখে পড়ে।

গবেষকেরা জানিয়েছেন, ঐতিহাসিকভাবে তুলনামূলক শীতল আবহাওয়ার জন্য পরিচিত উত্তর ইউরোপের কিছু এলাকাতেও চরম গরমের প্রভাব স্পষ্ট হয়েছে। ফলে তাপপ্রবাহকে আর শুধু দক্ষিণ ইউরোপের সমস্যা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই।

গবেষণায় দেখা গেছে, তাপজনিত মৃত্যুর সবচেয়ে বড় অংশ বয়স্ক জনগোষ্ঠীর মধ্যে ঘটেছে। বিশেষ করে ৮৫ বছর বা তার বেশি বয়সীদের মৃত্যুহার ছিল উল্লেখযোগ্য।

তবে তীব্র গরমের প্রভাব শুধু বয়স্কদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল না। গবেষণায় ৬৫ বছরের কম বয়সী মানুষের মধ্যেও আনুমানিক ৬ হাজার তাপজনিত মৃত্যুর হিসাব পাওয়া গেছে।

চিকিৎসাবিশেষজ্ঞদের মতে, অতিরিক্ত গরমে শরীরের তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণের স্বাভাবিক প্রক্রিয়া ব্যাহত হতে পারে। এতে পানিশূন্যতা, হিট এক্সহশন, হিটস্ট্রোক এবং হৃদ্‌যন্ত্র ও কিডনিসহ বিভিন্ন অঙ্গের ওপর চাপ বাড়ে।

আগে থেকে হৃদ্‌রোগ, শ্বাসতন্ত্রের রোগ কিংবা অন্যান্য দীর্ঘমেয়াদি স্বাস্থ্যসমস্যা থাকলে ঝুঁকি আরও বাড়তে পারে। পর্যাপ্ত বিশ্রাম, পানি, শীতল পরিবেশ এবং সময়মতো চিকিৎসা না পেলে পরিস্থিতি প্রাণঘাতী হয়ে উঠতে পারে।

গবেষকদের মতে, ইউরোপের অনেক শহর ক্রমবর্ধমান তাপমাত্রার সঙ্গে খাপ খাইয়ে নেওয়ার ক্ষেত্রে এখনো পর্যাপ্ত প্রস্তুত নয়। কংক্রিটের ভবন, পিচঢালা রাস্তা, কম সবুজ এলাকা এবং ঘনবসতিপূর্ণ নগরায়ণের কারণে শহরে তাপ জমে থাকার প্রবণতা বাড়ে। এর ফলে আশপাশের এলাকার তুলনায় শহরের তাপমাত্রা অনেক সময় বেশি অনুভূত হয়।

বিশেষ করে নিম্ন আয়ের মানুষ, একা বসবাসকারী বয়স্ক ব্যক্তি এবং যাদের ঘরে শীতল থাকার ব্যবস্থা নেই, তারা বেশি বিপদের মুখে পড়েন।

বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, শহরে গাছপালা ও সবুজ এলাকা বাড়ানো, ছায়াযুক্ত জনপরিসর তৈরি, ভবনকে তাপসহনশীল করে গড়ে তোলা এবং স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থাকে প্রস্তুত রাখার মাধ্যমে ঝুঁকি কমানো সম্ভব।

ChannelNRB Footer