News Ticker
221.png

সমুদ্রের তলদেশে ডাকবাক্স, বছরে জমা পড়ে দেড় হাজারের বেশি চিঠি!

অনলাইন ডেস্ক

প্রকাশিত: ২৩ অক্টোবর, ২০২৬ ২০:৫৪

শেয়ার

শেয়ার

সমুদ্রের তলদেশে ডাকবাক্স, বছরে জমা পড়ে দেড় হাজারের বেশি চিঠি!
ছবি: সংগৃহীত

রাস্তার পাশে, ডাকঘরের সামনে কিংবা জনবহুল কোনো স্থানে ডাকবাক্স দেখা খুবই স্বাভাবিক। কিন্তু সমুদ্রের তলদেশে যদি ডাকবাক্সের দেখা মেলে, তাহলে বিষয়টি নিঃসন্দেহে অবাক করার মতো। এমনই এক ব্যতিক্রমী ডাকবাক্স রয়েছে জাপানের ওয়াকায়ামা প্রিফেকচারের সুসামি উপসাগরে। সমুদ্রের প্রায় ১০ মিটার গভীরে স্থাপন করা এই ডাকবাক্সে চিঠি পাঠাতে হলে ডুব দিতে হয় পানির নিচে। আর এই অভিনব ব্যবস্থার আকর্ষণে প্রতিবছর সেখানে জমা পড়ে প্রায় দেড় হাজার চিঠি ও পোস্টকার্ড।

জাপানের সুসামি শহরের উপকূলীয় এলাকায় অবস্থিত এই পানির নিচের ডাকবাক্সটি পর্যটকদের কাছে বেশ জনপ্রিয়। সমুদ্রের তলদেশে লাল রঙের একটি ধাতব ডাকবাক্স স্থাপন করা হয়েছে, যা জাপানের প্রচলিত ডাকব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত।

গিনেস ওয়ার্ল্ড রেকর্ডসের তথ্য অনুযায়ী, ১৯৯৯ সালের ২৩ এপ্রিল সুসামিতে ডাকবাক্সটি স্থাপন করা হয়। এটি সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে প্রায় ১০ মিটার বা ৩২ ফুট ৯ ইঞ্চি গভীরে অবস্থিত। ২০০২ সালে এটি বিশ্বের গভীরতম পানির নিচের ডাকবাক্স হিসেবে গিনেস ওয়ার্ল্ড রেকর্ডসে স্বীকৃতি পায়।

এই ব্যতিক্রমী উদ্যোগের পেছনে রয়েছে পর্যটন আকর্ষণ তৈরির পরিকল্পনা। ১৯৯৯ সালে সুসামি এলাকার পর্যটন সম্ভাবনা বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়। সে সময় স্থানীয় পোস্টমাস্টার তোশিহিকো মাতসুমোতো পানির নিচে ডাকবাক্স স্থাপনের ধারণা দেন।

তাঁর ভাবনা ছিল, সমুদ্রের নিচে চিঠি পাঠানোর মতো অভিনব অভিজ্ঞতা পর্যটকদের আকৃষ্ট করবে। একই সঙ্গে স্থানীয় ব্যবসা ও পর্যটন খাতও উপকৃত হবে।

পরিকল্পনাটি বাস্তবায়নের পর ধীরে ধীরে এই ডাকবাক্স আন্তর্জাতিক পর্যটকদের কাছেও পরিচিত হয়ে ওঠে। বর্তমানে এটি শুধু চিঠি পাঠানোর জায়গা নয়, বরং সুসামির অন্যতম ব্যতিক্রমী পর্যটন আকর্ষণ।

সাধারণ কাগজের চিঠি পানিতে ভিজে নষ্ট হয়ে যেতে পারে। তাই এই ডাকবাক্সে চিঠি পাঠানোর জন্য ব্যবহার করা হয় বিশেষ ধরনের পানিরোধী পোস্টকার্ড। স্থানীয় ডাইভিং সেন্টার থেকে এসব পোস্টকার্ড সংগ্রহ করা যায়। বার্তা লেখার জন্য ব্যবহার করা হয় তেলভিত্তিক মার্কার পেন, যাতে পানির সংস্পর্শে লেখা সহজে মুছে না যায়।

পোস্টকার্ডে নিজের বার্তা লেখার পর পর্যটকেরা ডাইভিংয়ের মাধ্যমে সমুদ্রের তলদেশে নেমে ডাকবাক্সে সেটি জমা দেন। এভাবেই সমুদ্রের নিচ থেকে শুরু হয় একটি চিঠির যাত্রা।

যাঁরা নিজেরা পানির নিচে ডুব দিতে পারেন না, তাঁদের জন্যও কিছু ক্ষেত্রে স্থানীয় ডাইভিং সেন্টারের কর্মীদের সহায়তা নেওয়ার সুযোগ রয়েছে।

ডিজিটাল যোগাযোগের এই যুগেও সুসামির পানির নিচের ডাকবাক্সে চিঠি পাঠানোর আগ্রহ কমেনি। বিভিন্ন প্রকাশিত প্রতিবেদন অনুযায়ী, এখানে বছরে প্রায় ১ হাজার থেকে ১ হাজার ৫০০টি পোস্টকার্ড জমা পড়ে। গ্রীষ্মকাল ও পর্যটনের ব্যস্ত মৌসুমে চিঠির সংখ্যা আরও বেড়ে যায়।

২০১৮ সাল নাগাদ এই ডাকবাক্সের মাধ্যমে পাঠানো চিঠি ও পোস্টকার্ডের সংখ্যা ৩৮ হাজার ছাড়িয়েছিল বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

অনেকে ছুটি কাটানোর স্মৃতি ধরে রাখতে, কেউ প্রিয়জনকে বিশেষ বার্তা পাঠাতে, আবার কেউ নিছক ব্যতিক্রমী অভিজ্ঞতার অংশ হতে এই ডাকবাক্স ব্যবহার করেন। ফলে এটি পর্যটকদের কাছে এক ধরনের স্মারক-অভিজ্ঞতায় পরিণত হয়েছে।

সমুদ্রের তলদেশে ডাকবাক্স স্থাপন করাই এই উদ্যোগের একমাত্র চ্যালেঞ্জ নয়। নিয়মিত চিঠি সংগ্রহ এবং সেগুলোকে প্রচলিত ডাকব্যবস্থায় পৌঁছে দেওয়াও গুরুত্বপূর্ণ কাজ।

স্থানীয় ডাইভিং সেন্টারের কর্মীরা পানির নিচে গিয়ে ডাকবাক্স থেকে পোস্টকার্ড সংগ্রহ করেন। এরপর সেগুলো স্থানীয় ডাকঘরে পৌঁছে দেওয়া হয়। সেখান থেকে প্রচলিত ডাকব্যবস্থার মাধ্যমে চিঠি গন্তব্যে পাঠানো হয়।

সমুদ্রের লবণাক্ত পানির কারণে ধাতব ডাকবাক্সে মরিচা ধরার ঝুঁকি থাকে। তাই বাক্সটি নিয়মিত পরিষ্কার, রক্ষণাবেক্ষণ ও মেরামত করতে হয়। এ কারণে নির্দিষ্ট বিরতিতে ডাকবাক্সটি তুলে এনে প্রয়োজনীয় সংস্কার করা হয়।

ই-মেইল, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও তাৎক্ষণিক বার্তার যুগে হাতে লেখা চিঠির ব্যবহার আগের তুলনায় কমেছে। তবু বিশেষ কোনো মুহূর্তকে স্মরণীয় করে রাখতে চিঠির আবেদন এখনো রয়েছে।

সুসামির এই পানির নিচের ডাকবাক্স সেই আবেগের সঙ্গে যুক্ত করেছে রোমাঞ্চকর এক অভিজ্ঞতা। এখানে চিঠি পাঠানোর মূল আকর্ষণ শুধু বার্তা পৌঁছে দেওয়া নয়; বরং সমুদ্রের গভীরে নেমে নিজের হাতে ডাকবাক্সে পোস্টকার্ড জমা দেওয়ার স্মৃতিও।

একটি অভিনব ধারণা কীভাবে একটি এলাকার পর্যটন পরিচিতি বাড়াতে পারে, সুসামির এই ডাকবাক্স তারই উদাহরণ। সমুদ্রের গভীরে স্থাপন করা লাল রঙের ছোট্ট বাক্সটি তাই আজও কৌতূহল জাগায় বিশ্বজুড়ে।

ChannelNRB Footer