News Ticker
221.png

কানাডায় সামরিক ঘাঁটিতে আগুনে ৪ সেনার মৃত্যু, আহত ৩৯

অনলাইন ডেস্ক

প্রকাশিত: ২৩ অক্টোবর, ২০২৬ ২১:০৪

শেয়ার

শেয়ার

কানাডায় সামরিক ঘাঁটিতে আগুনে ৪ সেনার মৃত্যু, আহত ৩৯
ছবি: সংগৃহীত

কানাডার একটি সামরিক প্রশিক্ষণ ঘাঁটিতে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে চার সেনা নিহত হয়েছেন। এ ঘটনায় আহত হয়েছেন আরও ৩৯ জন। আহতদের মধ্যে ২৭ জন এখনো হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন। বাকি ১২ জন চিকিৎসা শেষে হাসপাতাল থেকে ছাড়া পেয়েছেন। গত ১৭ অক্টোবর দেশটির আলবার্টা প্রদেশের ওয়েনরাইট সামরিক ঘাঁটিতে এ ঘটনা ঘটে।

প্রাথমিকভাবে ঘটনাটিকে গুরুতর অগ্নিকাণ্ড হিসেবে উল্লেখ করা হলেও, বৃহস্পতিবার (২২ অক্টোবর) সামরিক কর্মকর্তারা জানান, ঘাঁটির গ্রেনেড লঞ্চার প্রশিক্ষণ এলাকায় আগুনের সূত্রপাত হয়েছিল। প্রবল বাতাসের কারণে আগুন দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে এবং প্রশিক্ষণরত সেনাদের একটি দল এর কবলে পড়ে। 

কানাডার সামরিক কর্মকর্তাদের তথ্য অনুযায়ী, ১৭ অক্টোবর বিকেল প্রায় ৪টার দিকে ওয়েনরাইট সামরিক ঘাঁটিতে নিয়মিত সামরিক প্রশিক্ষণ চলছিল। এ সময় স্বয়ংক্রিয় গ্রেনেড লঞ্চার ব্যবহারের প্রশিক্ষণ এলাকায় আগুনের সূত্রপাত হয়।

কানাডীয় সামরিক পুলিশের প্রধান ব্রিগেডিয়ার জেনারেল ভেনেসা হ্যানরাহান জানান, আগুনটি প্রথমে প্রশিক্ষণ এলাকার নির্ধারিত বিপজ্জনক অঞ্চলের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল। ওই এলাকায় বিস্ফোরক ও সামরিক অস্ত্র ব্যবহারের ঝুঁকি থাকায় দমকলকর্মীরা সরাসরি আগুনের কাছে গিয়ে কাজ করতে পারেননি। ফলে আগুনের গতিবিধি পর্যবেক্ষণ করতে হচ্ছিল।

পরে বাতাসের দিক ও গতিবেগ পরিবর্তিত হলে আগুনের তীব্রতা এবং ছড়িয়ে পড়ার গতি উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে যায়। একপর্যায়ে আগুন প্রশিক্ষণরত সেনাদের অবস্থানের দিকে ছড়িয়ে পড়ে।

ঘটনার সময় প্রায় ৮৪ জন সেনা দুটি পৃথক স্থানে প্রশিক্ষণ নিচ্ছিলেন। তাঁদের একদল গ্রেনেড নিক্ষেপের প্রশিক্ষণে অংশ নিচ্ছিলেন। অন্য একটি দল কৃত্রিম শত্রু অবস্থানে আক্রমণের অনুশীলন করছিলেন।

সামরিক কর্মকর্তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, আগুনের সূত্রপাতের পর সেটিকে প্রথমে নিয়ন্ত্রণে রয়েছে বলে মনে করা হয়েছিল। কিন্তু বাতাসের আকস্মিক পরিবর্তনে পরিস্থিতি দ্রুত ভয়াবহ হয়ে ওঠে।

কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, আগুন প্রায় এক কিলোমিটার দূরত্ব অতিক্রম করে অল্প সময়ের মধ্যে সেনাদের প্রশিক্ষণ এলাকায় পৌঁছে যায়। আগুনের এই দ্রুত বিস্তারেই এত বেশি হতাহতের ঘটনা ঘটে।

ঘটনার পরপরই আহতদের উদ্ধার করে বিভিন্ন হাসপাতালে পাঠানো হয়। উদ্ধারকাজে সামরিক বাহিনীর পাশাপাশি বেসামরিক জরুরি সেবাকর্মীরাও অংশ নেন।

নিহত চার সেনার পরিচয় প্রকাশ

কানাডার প্রতিরক্ষা বিভাগ নিহত চার সেনার পরিচয় প্রকাশ করেছে। তাঁরা হলেন—

  • সার্জেন্ট মরগান ওং
  • প্রাইভেট শন ফ্যারেল
  • প্রাইভেট এইডান গোল্ডিং
  • প্রাইভেট হেইডেন লাইকেমার্ক

নিহত সেনারা কানাডার সামরিক বাহিনীর তৃতীয় ব্যাটালিয়ন, প্রিন্সেস প্যাট্রিসিয়া’স কানাডিয়ান লাইট ইনফ্যান্ট্রির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। তাঁদের মৃত্যুতে শোক প্রকাশ করেছে কানাডার সরকার ও সামরিক বাহিনী।

কানাডার প্রধানমন্ত্রী মার্ক কার্নি ঘটনাটিকে শান্তিকালীন সময়ে দেশের ভূখণ্ডে সামরিক বাহিনীর জন্য সবচেয়ে মর্মান্তিক ঘটনাগুলোর একটি হিসেবে বর্ণনা করেছেন। নিহতদের পরিবারের প্রতি সমবেদনা জানানোর পাশাপাশি আহত সেনাদের চিকিৎসা ও পুনর্বাসনে সহায়তার আশ্বাস দিয়েছেন তিনি।

কানাডার সশস্ত্র বাহিনীর ২২ অক্টোবরের হালনাগাদ তথ্য অনুযায়ী, আহত ৩৯ জনের মধ্যে ২৭ জন হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন। বাকি ১২ জন চিকিৎসা শেষে হাসপাতাল থেকে ছাড়া পেয়েছেন।

আহতদের উন্নত চিকিৎসা নিশ্চিত করতে আলবার্টা প্রদেশের বিভিন্ন স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠান ও চিকিৎসাকর্মীদের পাশাপাশি বিশেষায়িত চিকিৎসা সহায়তা নেওয়া হচ্ছে। দগ্ধ রোগীদের চিকিৎসায় অভিজ্ঞ প্রায় ২৮ জন বেসামরিক চিকিৎসাকর্মীকে টরন্টো থেকে এডমন্টনে নেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছে কানাডার প্রতিরক্ষা বিভাগ।

সামরিক বাহিনী জানিয়েছে, আহতদের চিকিৎসা, তাঁদের পরিবারের পাশে থাকা এবং সংশ্লিষ্ট সদস্যদের প্রয়োজনীয় সহায়তা দেওয়া এখন অগ্রাধিকার।

কীভাবে আগুনের সূত্রপাত হলো এবং কেন তা এত দ্রুত সেনাদের অবস্থানে ছড়িয়ে পড়ল, তা জানতে তদন্ত চলছে। কানাডার সামরিক পুলিশ স্বাধীনভাবে ঘটনাটি তদন্ত করছে। প্রয়োজনে অন্যান্য আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী সংস্থাও তদন্তে সহায়তা করছে।

তদন্তে আগুনের গতিপথ, আবহাওয়ার পরিস্থিতি, প্রশিক্ষণ এলাকার নিরাপত্তাব্যবস্থা এবং জরুরি পরিস্থিতিতে নেওয়া পদক্ষেপগুলো খতিয়ে দেখা হবে। আগুন ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি সম্পর্কে আগে থেকে কী তথ্য ছিল এবং তা মোকাবিলায় যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছিল কি না, সেসব বিষয়ও তদন্তের আওতায় আসতে পারে।

কানাডার কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, প্রাথমিক তথ্যের ভিত্তিতে ঘটনাটির কারণ সম্পর্কে আরও স্পষ্ট ধারণা পাওয়া গেলেও পূর্ণাঙ্গ তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত সব প্রশ্নের চূড়ান্ত উত্তর পাওয়া যাবে না।

ঘটনার সময় সংশ্লিষ্ট সেনারা ভবিষ্যতে লাটভিয়ায় দায়িত্ব পালনের প্রস্তুতির অংশ হিসেবে প্রশিক্ষণ নিচ্ছিলেন। ন্যাটোর সঙ্গে সমন্বিত নিরাপত্তা কার্যক্রমের আওতায় সেখানে কানাডীয় সেনাদের মোতায়েনের পরিকল্পনা রয়েছে।

ওয়েনরাইট সামরিক ঘাঁটি কানাডার অন্যতম বড় প্রশিক্ষণকেন্দ্র। সেখানে দেশটির সেনাবাহিনী নিয়মিত যুদ্ধকৌশল, অস্ত্র পরিচালনা এবং বিভিন্ন সামরিক অভিযানের অনুশীলন করে। ন্যাটোভুক্ত বিভিন্ন দেশের সামরিক সদস্যরাও এই ঘাঁটিতে প্রশিক্ষণ নিয়ে থাকেন।

প্রশিক্ষণ চলাকালে এমন প্রাণহানির ঘটনায় সামরিক নিরাপত্তাব্যবস্থা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে। তবে প্রশিক্ষণ কার্যক্রমে কোনো নির্দিষ্ট নিয়মের ব্যত্যয় ঘটেছিল কি না, তা তদন্তের আগে নিশ্চিত করে বলা যাচ্ছে না।

কানাডার এই দুর্ঘটনা দেশটির সামরিক বাহিনীতে শোকের ছায়া ফেলেছে। 

একই সঙ্গে প্রশিক্ষণ এলাকায় আগুন শনাক্তকরণ, দ্রুত সতর্কতা জারি, বাতাসের পরিবর্তনে ঝুঁকি মূল্যায়ন এবং সেনাদের নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়ার ব্যবস্থাগুলোও তদন্তে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।

কর্তৃপক্ষের তদন্ত শেষ হলে দুর্ঘটনার প্রকৃত কারণ এবং ভবিষ্যতে এ ধরনের ঘটনা প্রতিরোধে কী পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন, সে বিষয়ে আরও বিস্তারিত তথ্য জানা যাবে।

ChannelNRB Footer