News Ticker
221.png

মালয়েশিয়ায় ধরপাকড়, আতঙ্কে প্রবাসীরা

অনলাইন ডেস্ক

প্রকাশিত: ২৩ অক্টোবর, ২০২৬ ২২:৪৯

শেয়ার

শেয়ার

মালয়েশিয়ায় ধরপাকড়, আতঙ্কে প্রবাসীরা
ছবি: সংগৃহীত

মালয়েশিয়ায় অবৈধ অভিবাসনবিরোধী অভিযান জোরদার করেছে দেশটির অভিবাসন বিভাগ। কলকারখানা, নির্মাণস্থল, রেস্তোরাঁ, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ও আবাসিক এলাকায় ধারাবাহিক অভিযান চালানো হচ্ছে। এসব অভিযানে বিপুলসংখ্যক বিদেশি নাগরিককে আটক করা হয়েছে। আটক ব্যক্তিদের মধ্যে বাংলাদেশিরাও রয়েছেন। ফলে দেশটিতে কর্মরত বাংলাদেশি প্রবাসীদের একাংশের মধ্যে উদ্বেগ ও অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।

মালয়েশিয়ার অভিবাসন বিভাগের তথ্যের বরাতে প্রকাশিত সংবাদ অনুযায়ী, ২০২৬ সালের ১ জানুয়ারি থেকে ১৬ অক্টোবর পর্যন্ত দেশজুড়ে ১১ হাজারের বেশি অভিযানে ৬৫ হাজার ৬৯৯ জন অনিয়মিত অভিবাসীকে আটক করা হয়েছে। একই সময়ে ১ লাখ ৪৮ হাজারের বেশি বিদেশি নাগরিকের কাগজপত্র যাচাই করা হয়েছে। এ ছাড়া অভিবাসন আইন লঙ্ঘনের অভিযোগে ১ হাজার ৯৬৬ জন নিয়োগকর্তাকে আটক করা হয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

সাম্প্রতিক কয়েকটি অভিযানে বাংলাদেশি কর্মীদের আটকের ঘটনাও সামনে এসেছে। এতে বৈধ ভিসা, ওয়ার্ক পারমিট, নিয়োগকর্তার দায়িত্ব এবং বিদেশে কর্মসংস্থানের জন্য নেওয়া ঋণ পরিশোধ নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে প্রবাসী পরিবারগুলোর মধ্যে। তবে আটক হওয়া প্রত্যেক ব্যক্তির অপরাধের ধরন ও পরিস্থিতি এক নয়। কারও বিরুদ্ধে অভিযোগ থাকলেই তাঁকে দোষী সাব্যস্ত করা যায় না।

মালয়েশিয়ার জোহর রাজ্যের তেবরাউ শিল্পাঞ্চলে ১২ অক্টোবর একটি গাড়ির যন্ত্রাংশ ও ইলেকট্রনিক পণ্য উৎপাদনকারী কারখানায় অভিযান চালায় অভিবাসন বিভাগ ও মালয়েশিয়ান বর্ডার কন্ট্রোল অ্যান্ড প্রোটেকশন এজেন্সি (একেপিএস)।

১৩ অক্টোবর প্রকাশিত প্রতিবেদনে জানানো হয়, ওই অভিযানে মোট ৪৯২ জন বিদেশি কর্মীকে আটক করা হয়েছে। তাঁদের মধ্যে ১৭২ জন বাংলাদেশি—১৭০ জন পুরুষ ও দুজন নারী।

অভিযানে মিয়ানমার, নেপাল, ভারত, পাকিস্তান, ইন্দোনেশিয়া ও কম্বোডিয়ার নাগরিকদেরও আটক করা হয়। তাঁদের বয়স ছিল ১৯ থেকে ৪৬ বছরের মধ্যে। আটক ব্যক্তিদের বৈধ কাগজপত্র ও অভিবাসনসংক্রান্ত নথি যাচাইয়ের জন্য জোহর বাহরুর সেটিয়া ত্রোপিকা অভিবাসন ডিপোতে নেওয়া হয়।

মালয়েশীয় কর্তৃপক্ষের ভাষ্য অনুযায়ী, কয়েক সপ্তাহ ধরে গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহ ও জনসাধারণের অভিযোগ পর্যালোচনার পর অভিযানটি পরিচালনা করা হয়। কারখানাটিতে প্রয়োজনীয় অনুমোদন ছাড়া বিদেশি কর্মী নিয়োগের অভিযোগও খতিয়ে দেখা হচ্ছে।

এর আগে ৫ অক্টোবর গেলাং পাতাহ এলাকার দুটি কারখানায় অভিযান চালিয়ে ১৭৭ জন অনিয়মিত অভিবাসী কর্মীকে আটক করা হয়েছিল। তাঁদের মধ্যে ২৪ জন ছিলেন বাংলাদেশি পুরুষ।

পরপর এসব অভিযানে বাংলাদেশিদের আটকের ঘটনা প্রবাসী কর্মীদের মধ্যে উদ্বেগ বাড়িয়েছে।

মালয়েশিয়ার অভিবাসন বিভাগ জানিয়েছে, দেশটিতে বৈধ কাগজপত্র ছাড়া অবস্থান, ভিসার মেয়াদ শেষ হওয়ার পরও অবস্থান এবং অনুমোদিত শর্তের বাইরে কাজ করার মতো অভিযোগের বিরুদ্ধে অভিযান চালানো হচ্ছে।

১৭ অক্টোবর প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে বলা হয়, চলতি বছরের ১ জানুয়ারি থেকে ১৫ অক্টোবর পর্যন্ত ১১ হাজারের বেশি অভিযানে ৬৫ হাজারেরও বেশি বিদেশি নাগরিককে আটক করা হয়েছিল। নির্মাণ, উৎপাদন, কৃষি ও সেবাসহ বিভিন্ন খাতে এসব অভিযান পরিচালিত হয়েছে।

৮ অক্টোবর সেলাঙ্গর রাজ্যের সেরি কেম্বাঙ্গান ও বান্দার বারু ক্লাং এলাকায় অভিযান চালিয়ে ১৭৪ জন বিদেশিকে আটক করা হয়। ওই অভিযানে পাঁচজন বাংলাদেশিও ছিলেন। পাশাপাশি ছয়জন স্থানীয় নিয়োগকর্তাকে আটক করা হয়।

এ ছাড়া ২১ অক্টোবর পাহাং রাজ্যের জানদা বাইক এলাকায় ১৯টি স্থানে অভিযান চালিয়ে ৬৫ জন বিদেশি নাগরিককে আটক করে অভিবাসন বিভাগ। এসব অভিযান থেকে বোঝা যায়, শুধু বড় কারখানা নয়, পর্যটনকেন্দ্র, খামার, নির্মাণস্থল ও বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানও নজরদারির আওতায় রয়েছে।

মালয়েশিয়ায় কাজ করতে যাওয়া বহু বাংলাদেশি কর্মী বিদেশে যাওয়ার জন্য বড় অঙ্কের অর্থ ব্যয় করেন। কেউ সঞ্চয় ভাঙেন, কেউ জমি বন্ধক রাখেন, আবার অনেকে ঋণ নিয়ে বিদেশে পাড়ি জমান। তাঁদের পাঠানো রেমিট্যান্সের ওপর নির্ভর করে দেশে থাকা পরিবারের খাবার, চিকিৎসা, শিক্ষা ও দৈনন্দিন ব্যয়।

এমন পরিস্থিতিতে আটক হওয়া, চাকরি হারানো কিংবা দেশে ফেরত পাঠানোর আশঙ্কা তাঁদের জন্য বড় ধরনের আর্থিক অনিশ্চয়তা তৈরি করতে পারে।

বিশেষ করে যাঁদের ভিসা বা ওয়ার্ক পারমিটের মেয়াদ শেষ হয়ে গেছে, যাঁরা অনুমোদিত নিয়োগকর্তার বাইরে কাজ করছেন অথবা যাঁদের নিয়োগসংক্রান্ত নথিতে সমস্যা রয়েছে, তাঁরা বেশি উদ্বেগে থাকতে পারেন।

তবে বৈধ কাগজপত্র নিয়ে নিয়ম মেনে কাজ করা প্রত্যেক বাংলাদেশি কর্মীকে একই ঝুঁকিতে রয়েছেন বলে ধরে নেওয়া ঠিক হবে না। তাঁদের ক্ষেত্রে মূল বিষয় হলো, ভিসা ও কাজের অনুমতি বৈধ আছে কি না এবং বাস্তবে যে প্রতিষ্ঠানে কাজ করছেন, সেই চাকরি অনুমোদিত শর্তের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ কি না।

বিদেশে কর্মরত শ্রমিকদের অভিবাসনসংক্রান্ত জটিলতার পেছনে সব সময় তাঁদের নিজস্ব সিদ্ধান্ত দায়ী থাকে না। কোনো কোনো ক্ষেত্রে নিয়োগকর্তা সময়মতো ওয়ার্ক পারমিট নবায়ন না করলে বা নিয়োগসংক্রান্ত প্রয়োজনীয় কাগজপত্র সম্পন্ন না করলে কর্মীরা সমস্যায় পড়তে পারেন।

আবার প্রতিশ্রুত চাকরি না পাওয়া, বেতন নিয়ে বিরোধ, নিয়োগকর্তা পরিবর্তন কিংবা মধ্যস্বত্বভোগীর প্রতারণার কারণেও কারও অভিবাসন পরিস্থিতি জটিল হয়ে উঠতে পারে।

তবে এসব পরিস্থিতি প্রতিটি আটক ব্যক্তির ক্ষেত্রে ঘটেছে, এমন দাবি করার সুযোগ নেই। কারও নথি বৈধ কি না, তিনি কোন নিয়ম ভঙ্গ করেছেন বলে অভিযোগ রয়েছে এবং নিয়োগকর্তার কোনো দায় আছে কি না—এসব বিষয় পৃথকভাবে যাচাই করা প্রয়োজন।

মালয়েশিয়ার সাম্প্রতিক অভিযানগুলোতে নিয়োগকর্তাদেরও আটক করার ঘটনা ঘটেছে। এতে স্পষ্ট হয়, কর্তৃপক্ষ শুধু বিদেশি কর্মীদের নয়, তাঁদের নিয়োগের সঙ্গে যুক্ত প্রতিষ্ঠানগুলোকেও তদন্তের আওতায় আনছে।

বাংলাদেশের অর্থনীতিতে প্রবাসী কর্মীদের অবদান অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তাঁদের পাঠানো অর্থ দেশের বৈদেশিক মুদ্রার প্রবাহ বাড়ানোর পাশাপাশি লাখো পরিবারের জীবনযাত্রার ব্যয় মেটাতে সহায়তা করে।

কিন্তু বিদেশে কর্মসংস্থানের জন্য বিপুল অর্থ ব্যয় করার পর কোনো কর্মী যদি নিয়োগসংক্রান্ত অনিয়ম বা নথিপত্রের জটিলতায় পড়েন, তাহলে তার প্রভাব শুধু ওই ব্যক্তির ওপর নয়, তাঁর পুরো পরিবারের ওপর পড়ে।

এ কারণে বিদেশে কর্মী পাঠানোর আগে চাকরির প্রস্তাব, নিয়োগকর্তা, ভিসা ও প্রয়োজনীয় অনুমোদন যাচাইয়ের ব্যবস্থা আরও শক্তিশালী করা জরুরি। একই সঙ্গে প্রতারণামূলক নিয়োগের সঙ্গে জড়িত ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়াও প্রয়োজন।

মালয়েশিয়ার অভিবাসন বিভাগ জানিয়েছে, দেশটিতে অভিবাসন আইন প্রয়োগে অভিযান অব্যাহত থাকবে। অন্যদিকে বাংলাদেশি কর্মীদের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, তাঁদের আইনি অবস্থান সম্পর্কে নিশ্চিত থাকা এবং কোনো সমস্যা দেখা দিলে দ্রুত নির্ভরযোগ্য সহায়তা নেওয়া।

ChannelNRB Footer