ভারতের আখখেতে কাজ চালিয়ে যেতে গিয়ে গুরুতর স্বাস্থ্যঝুঁকির মুখে পড়ছেন নারী শ্রমিকদের একটি অংশ। মাসিকের ব্যথা, শারীরিক অসুস্থতা কিংবা গর্ভধারণের কারণে কয়েক দিন কাজ বন্ধ থাকলেই হারাতে হয় মজুরি; কোনো কোনো ক্ষেত্রে গুনতে হয় জরিমানাও। এই চাপ থেকে মুক্তি পেতে মহারাষ্ট্রের বিড জেলার বেশ কিছু নারী শ্রমিক জরায়ু অপসারণের অস্ত্রোপচার করিয়েছেন বলে বিভিন্ন সংবাদ প্রতিবেদন ও গবেষণায় উঠে এসেছে।
জরায়ু অপসারণের চিকিৎসাবিজ্ঞানের নাম হিস্টেরেকটমি। নির্দিষ্ট কিছু রোগের চিকিৎসায় এ অস্ত্রোপচার প্রয়োজন হতে পারে। তবে কর্মক্ষেত্রে ছুটি না পাওয়া, দারিদ্র্য, ঋণের বোঝা কিংবা মাসিকের কারণে কাজে অনুপস্থিত থাকার ভয় থেকে কোনো নারী এমন অস্ত্রোপচারের সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য হলে তা শ্রমিকের স্বাস্থ্য ও অধিকার নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন তৈরি করে। বিষয়টি নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই উদ্বেগ জানিয়ে আসছেন নারী অধিকারকর্মী ও জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা।
মহারাষ্ট্রের বিড জেলা থেকে বহু পরিবার আখ কাটার মৌসুমে কাজের সন্ধানে রাজ্যের বিভিন্ন অঞ্চলসহ ভারতের অন্য আখ উৎপাদনকারী এলাকায় পাড়ি জমায়। এসব শ্রমিকের অনেকেই মৌসুমি কাজের ওপর নির্ভরশীল। কাজের ব্যবস্থা করে দেন স্থানীয় ঠিকাদার, যাঁদের অনেক জায়গায় ‘মুক্কাদাম’ বলা হয়।
শ্রমিকদের একটি অংশ স্বামী-স্ত্রী মিলে দলগতভাবে কাজ করেন। তাঁদের আয় অনেক ক্ষেত্রে কাটা আখের পরিমাণ এবং নির্ধারিত উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা পূরণের ওপর নির্ভর করে। ফলে পরিবারের কোনো সদস্য অসুস্থ হলে কিংবা নারী শ্রমিক মাসিকের ব্যথায় কাজ করতে না পারলে পুরো দলের আয় ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
আন্তর্জাতিক গবেষণা সংস্থা ইন্টারন্যাশনাল ইনস্টিটিউট ফর এনভায়রনমেন্ট অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের (আইআইইডি) ২০২৪ সালের এক গবেষণাভিত্তিক প্রতিবেদনে বলা হয়, আখ কাটার মৌসুমে শ্রমিকদের দিনে ১২ থেকে ১৬ ঘণ্টা পর্যন্ত কাজ করতে হতে পারে। অনানুষ্ঠানিক শ্রমচুক্তির কারণে কাজে অনুপস্থিত থাকলে আর্থিক ক্ষতির আশঙ্কাও থাকে।
এমন পরিস্থিতিতে কিছু নারী মাসিকের সমস্যা এড়াতে জরায়ু অপসারণকে কাজ চালিয়ে যাওয়ার উপায় হিসেবে বিবেচনা করছেন বলে গবেষণায় উঠে এসেছে। তবে সব অস্ত্রোপচারের কারণ একই নয়; কারও ক্ষেত্রে প্রকৃত চিকিৎসাগত প্রয়োজনও থাকতে পারে।
২০২৬ সালের ২৬ জানুয়ারি প্রকাশিত হিন্দুস্তান টাইমসের এক প্রতিবেদনে মহারাষ্ট্রের স্বাস্থ্য বিভাগের তথ্যের বরাতে জানানো হয়, ২০২৫ সালে বিড জেলায় মোট ১ হাজার ৩১০ জন নারীর জরায়ু অপসারণের অস্ত্রোপচার হয়েছিল। তাঁদের মধ্যে ১১৩ জন ছিলেন আখ কাটার কাজে নিয়োজিত নারী শ্রমিক। ওই শ্রমিকদের মধ্যে ৩৫ বছর বা তার কম বয়সী ছিলেন আটজন।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০১৯ সাল থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত জেলায় অন্তত ৩৬২ জন আখশ্রমিক নারীর জরায়ু অপসারণের তথ্য পাওয়া গেছে। তবে অস্ত্রোপচারের সংখ্যা বেশি হওয়া মানেই প্রতিটি অস্ত্রোপচার অপ্রয়োজনীয় ছিল, এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যায় না। প্রতিটি ক্ষেত্রে চিকিৎসাগত কারণ ও পরিস্থিতি আলাদাভাবে যাচাই করা জরুরি।
এর আগে ২০১৯ সালে মহারাষ্ট্র সরকারের একটি তদন্তে বিড জেলার ৮২ হাজার ৩০৯ জন নারী আখশ্রমিকের ওপর পরিচালিত জরিপে ১৩ হাজার ৮৬১ জনের জরায়ু অপসারণের তথ্য উঠে এসেছিল। বিষয়টি তখন দেশজুড়ে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দেয়।
নারী অধিকারকর্মীদের অভিযোগ, সমস্যাটির পেছনে কেবল স্বাস্থ্যগত কারণ নয়, বরং দারিদ্র্য ও শ্রমব্যবস্থার কাঠামোগত দুর্বলতাও কাজ করছে। মৌসুমি কাজের জন্য অনেক পরিবারকে আগাম অর্থ নিতে হয়। পরে সেই অর্থ পরিশোধ করতে গিয়ে দীর্ঘ সময় কাজ চালিয়ে যাওয়ার চাপ তৈরি হয়।
এ অবস্থায় অসুস্থতার জন্য ছুটি নেওয়া, মাসিকের সময় বিশ্রাম করা কিংবা চিকিৎসার জন্য কাজ বন্ধ রাখা অনেক নারীর কাছে আর্থিকভাবে কঠিন হয়ে পড়ে। কিছু ক্ষেত্রে ঠিকাদারদের চাপ এবং বেসরকারি চিকিৎসকদের অপ্রয়োজনীয় অস্ত্রোপচারের পরামর্শ দেওয়ার অভিযোগও উঠেছে। তবে এসব অভিযোগের সব ক্ষেত্রে জবরদস্তি বা চিকিৎসাগত অনিয়ম প্রমাণিত হয়েছে—এমন দাবি করা যায় না।
আইআইইডির গবেষণায় খরার কারণে কৃষিকাজের ক্ষতি এবং জীবিকার সন্ধানে অন্য এলাকায় শ্রমিকদের অভিবাসনের বিষয়টিও উঠে এসেছে। অর্থাৎ জলবায়ুগত চাপ, গ্রামীণ দারিদ্র্য ও অনিরাপদ শ্রমপরিবেশ পরস্পরের সঙ্গে যুক্ত হয়ে নারীদের সংকট আরও বাড়িয়ে তুলতে পারে।
চিকিৎসকেরা বলছেন, জরায়ু অপসারণ একটি বড় অস্ত্রোপচার। চিকিৎসাগত প্রয়োজন ছাড়া এ সিদ্ধান্ত নেওয়া উচিত নয়। অস্ত্রোপচারের পর সংক্রমণ, ব্যথা, প্রস্রাবসংক্রান্ত সমস্যা এবং পেলভিক অঞ্চলের জটিলতা দেখা দিতে পারে। অস্ত্রোপচারের সময় ডিম্বাশয়ও অপসারণ করা হলে অকাল মেনোপজের ঝুঁকি তৈরি হতে পারে।
জরায়ু অপসারণের পর মাসিক বন্ধ হয়ে যায় এবং গর্ভধারণ সম্ভব থাকে না। তাই অস্ত্রোপচারের আগে রোগের প্রকৃতি, বিকল্প চিকিৎসা, সম্ভাব্য জটিলতা এবং ভবিষ্যৎ প্রজননস্বাস্থ্য সম্পর্কে রোগীকে স্পষ্টভাবে জানানো জরুরি।
বিশেষ করে কম বয়সী নারীদের ক্ষেত্রে যথাযথ পরীক্ষা-নিরীক্ষা ও চিকিৎসাগত কারণ নিশ্চিত না করে এমন অস্ত্রোপচার করা হলে তার দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব গুরুতর হতে পারে।
সমস্যাটি মোকাবিলায় মহারাষ্ট্র সরকার ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে জরায়ু অপসারণের অস্ত্রোপচারসংক্রান্ত অভিযোগ তদন্তে রাজ্য পর্যায়ের একটি কমিটি পুনর্গঠন করে। ২ মার্চ প্রকাশিত হিন্দুস্তান টাইমসের প্রতিবেদন অনুযায়ী, বেসরকারি হাসপাতালে গত তিন বছরে হওয়া অস্ত্রোপচারগুলো পর্যালোচনা এবং অনাকাঙ্ক্ষিত অস্ত্রোপচারের অভিযোগ খতিয়ে দেখতে রাজ্য ও জেলা পর্যায়ে কমিটি গঠনের নির্দেশ দেওয়া হয়।
কমিটিগুলোর কাজের মধ্যে রয়েছে চিকিৎসার নথি যাচাই, সংশ্লিষ্ট হাসপাতালের কার্যক্রম পর্যালোচনা এবং অস্ত্রোপচার করানো নারীদের অভিজ্ঞতা সম্পর্কে তথ্য সংগ্রহ। নারী আখশ্রমিকদের স্বাস্থ্যগত সমস্যা চিহ্নিত করে প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা সুপারিশ করাও এই উদ্যোগের লক্ষ্য।
এদিকে, বিড জেলায় নারী শ্রমিকদের প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা পৌঁছে দিতে ‘আরোগ্য সাথী’ উদ্যোগের কথাও জানিয়েছে স্থানীয় স্বাস্থ্য বিভাগ। এর আওতায় শ্রমিকদের দল থেকে একজন নারীকে প্রাথমিক চিকিৎসা ও জরুরি স্বাস্থ্যসহায়তার বিষয়ে প্রশিক্ষণ দেওয়ার ব্যবস্থা করা হয়েছে বলে হিন্দুস্তান টাইমসের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়।
তবে শুধু অস্ত্রোপচারের ওপর নজরদারি বাড়ালেই সমস্যার সমাধান হবে না। নারী শ্রমিকদের নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা, নিরাপদ মাসিক ব্যবস্থাপনা, বিশ্রামের সুযোগ, উপযুক্ত শৌচাগার, বিশুদ্ধ পানি এবং চিকিৎসার সহজলভ্যতা নিশ্চিত করাও জরুরি।
ভারতের আখশিল্পে কর্মরত নারী শ্রমিকদের এই পরিস্থিতি দেখিয়ে দেয়, জীবিকার অনিশ্চয়তা কীভাবে নারীর স্বাস্থ্যসংক্রান্ত সিদ্ধান্তকে প্রভাবিত করতে পারে। অসুস্থ হলে যাতে কোনো নারীকে মজুরি হারানোর ভয়ে চিকিৎসা এড়িয়ে যেতে না হয়, সে জন্য নিরাপদ কর্মপরিবেশ ও সামাজিক সুরক্ষা প্রয়োজন।
একই সঙ্গে চিকিৎসার সিদ্ধান্ত হতে হবে রোগীর স্বার্থ, পর্যাপ্ত তথ্য এবং যথাযথ চিকিৎসাগত মূল্যায়নের ভিত্তিতে। অপ্রয়োজনীয় অস্ত্রোপচারের অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত, শ্রমিকদের অধিকার রক্ষা এবং স্বাস্থ্যসেবা সম্প্রসারণের মাধ্যমে এ সংকট মোকাবিলা করা সম্ভব।
আখ কাটার কাজ চালিয়ে যাওয়ার জন্য কোনো নারী যেন নিজের দীর্ঘমেয়াদি স্বাস্থ্য ও প্রজননস্বাস্থ্যের ঝুঁকি নিতে বাধ্য বোধ না করেন—সেটিই এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন।
আরও পড়ুন:







