News Ticker
221.png

শীতে তীব্র জ্বালানি সংকটের মুখোমুখি ইউরোপ

অনলাইন ডেস্ক

প্রকাশিত: ২৪ অক্টোবর, ২০২৬ ১৮:০১

শেয়ার

শেয়ার

শীতে তীব্র জ্বালানি সংকটের মুখোমুখি ইউরোপ
ছবি: সংগৃহীত

আসন্ন শীতে তীব্র জ্বালানি সংকটের ঝুঁকিতে পড়েছে ইউরোপ। প্রাকৃতিক গ্যাসের মজুত কমে যাওয়া, মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতে বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহ ব্যাহত হওয়া এবং আন্তর্জাতিক বাজারে গ্যাসের দাম বেড়ে যাওয়ায় নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। পরিস্থিতি দীর্ঘায়িত হলে ইউরোপের বিভিন্ন দেশে বিদ্যুৎ উৎপাদন, শিল্পকারখানার কার্যক্রম এবং ঘরবাড়ি গরম রাখার ব্যয় আরও বাড়তে পারে।

আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংস্থার (আইইএ) প্রধান ফাতিহ বিরোল সতর্ক করে বলেছেন, ইউরোপ ঐতিহাসিকভাবে কম গ্যাসের মজুত নিয়ে শীত মৌসুমে প্রবেশ করছে। মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতের কারণে জ্বালানি সরবরাহে নতুন ধাক্কা এলে পরিস্থিতি সামাল দেওয়া কঠিন হতে পারে। 

ইউরোপীয় ইউনিয়নের গ্যাস অবকাঠামো পরিচালনাকারী সংস্থা গ্যাস ইনফ্রাস্ট্রাকচার ইউরোপের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের ১ অক্টোবর পর্যন্ত ইইউর ভূগর্ভস্থ গ্যাস সংরক্ষণাগারগুলোর ধারণক্ষমতার প্রায় ৭২ শতাংশ পূর্ণ ছিল। গত বছরের একই সময়ে এ হার ছিল প্রায় ৮৩ শতাংশ। ফলে শীতকালে চাহিদা বাড়লে সরবরাহের ভারসাম্য বজায় রাখা বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠতে পারে।

ইউরোপের জ্বালানি নিরাপত্তা নিয়ে প্রকাশিত সর্বশেষ পূর্বাভাসে বলা হয়েছে, শীতকালে তীব্র ঠান্ডা দেখা দিলে গ্যাসের চাহিদার তুলনায় সরবরাহ ১২ থেকে ১৫ শতাংশ পর্যন্ত কম হতে পারে। তবে এটি একটি সম্ভাব্য ঝুঁকির হিসাব; নিশ্চিত ঘাটতির পূর্বাভাস নয়।

ইউরোপীয় গ্যাস নেটওয়ার্ক পরিচালনাকারীদের সংগঠন ENTSOG-এর ২০২৬-২৭ সালের শীতকালীন সরবরাহ পূর্বাভাসে বলা হয়েছে, গ্যাসের মজুত কম থাকলেও ইউরোপের বিদ্যমান অবকাঠামো বিভিন্ন পরিস্থিতিতে সরবরাহ সামাল দেওয়ার সক্ষমতা রাখে। তবে তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের (এলএনজি) সরবরাহ কমে গেলে এবং শীতের তীব্রতা বেড়ে গেলে পরিস্থিতি দ্রুত জটিল হতে পারে।

বিশেষজ্ঞদের আশঙ্কা, গ্যাসের মজুত দ্রুত কমতে থাকলে শীতের শেষ দিকে ইউরোপের কয়েকটি অঞ্চলে সরবরাহের ওপর বাড়তি চাপ তৈরি হতে পারে। বিশেষ করে যেসব দেশ আমদানিনির্ভর এবং যাদের বিকল্প পাইপলাইন সরবরাহ সীমিত, তারা বেশি ঝুঁকিতে থাকবে।

ইউরোপের বর্তমান সংকটের অন্যতম কারণ মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ এবং হরমুজ প্রণালি দিয়ে জ্বালানি পরিবহনে বিঘ্ন। বিশ্বের গুরুত্বপূর্ণ এই নৌপথ দিয়ে বিপুল পরিমাণ অপরিশোধিত তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস পরিবহন করা হয়। ফলে এখানে দীর্ঘস্থায়ী অচলাবস্থা তৈরি হলে শুধু ইউরোপ নয়, এশিয়ার জ্বালানি আমদানিকারক দেশগুলোকেও বাড়তি দামে জ্বালানি কিনতে হতে পারে।

আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে ইরানের যুদ্ধ এবং এর জেরে হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল ব্যাহত হওয়ায় মধ্যপ্রাচ্য থেকে জ্বালানি সরবরাহে বড় ধরনের অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে কাতার ও সংযুক্ত আরব আমিরাত থেকে এলএনজি সরবরাহ বাধাগ্রস্ত হওয়ায় আন্তর্জাতিক বাজারে ক্রেতাদের মধ্যে প্রতিযোগিতা বেড়েছে।

ইউরোপ এখন রাশিয়ার পাইপলাইন গ্যাসের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে যুক্তরাষ্ট্রসহ বিভিন্ন দেশ থেকে এলএনজি আমদানি বাড়িয়েছে। কিন্তু বৈশ্বিক বাজারে সরবরাহ সংকুচিত হলে বিকল্প উৎস থেকে গ্যাস কেনাও ব্যয়বহুল হয়ে উঠছে।

এ অবস্থায় ইউরোপীয় দেশগুলোকে একই সঙ্গে পর্যাপ্ত গ্যাস সংগ্রহ, সংরক্ষণাগার পূর্ণ রাখা এবং ভোক্তাদের ব্যয় নিয়ন্ত্রণের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে হচ্ছে।

ইউরোপের বহু দেশে শীতকালে ঘরবাড়ি গরম রাখতে প্রাকৃতিক গ্যাস গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। পাশাপাশি বিদ্যুৎ উৎপাদন ও বিভিন্ন শিল্পকারখানাতেও গ্যাস ব্যবহৃত হয়। ফলে গ্যাসের দাম বাড়লে বিদ্যুৎ, পরিবহন এবং উৎপাদন খরচেও তার প্রভাব পড়ে।

বার্তা সংস্থা রয়টার্সের ১২ অক্টোবরের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতের কারণে ইউরোপে গ্যাসের দাম দীর্ঘ সময় উঁচু থাকতে পারে। এমনকি সংঘাত শেষ হলেও সরবরাহব্যবস্থা স্বাভাবিক হতে সময় লাগতে পারে।

জ্বালানির ব্যয় বাড়লে পরিবারগুলোর মাসিক বিল বৃদ্ধি পেতে পারে। একই সঙ্গে রাসায়নিক, সার, ধাতু ও অন্যান্য জ্বালানিনির্ভর শিল্পের উৎপাদন ব্যয়ও বাড়বে। ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলো বাড়তি খরচ পণ্যের দামে যুক্ত করলে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয়ের ওপরও চাপ তৈরি হতে পারে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, গ্যাসের দাম বাড়ার পাশাপাশি সরবরাহের ঘাটতি দেখা দিলে কিছু শিল্পকারখানাকে উৎপাদন কমাতে হতে পারে। তবে বর্তমানে ইউরোপের সব দেশে তাৎক্ষণিক জ্বালানি সরবরাহ বন্ধ হয়ে যাওয়ার মতো পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে—এমন কোনো নিশ্চিত তথ্য নেই।

সংকট মোকাবিলায় ইউরোপীয় ইউনিয়নভুক্ত দেশগুলোকে জ্বালানির ব্যবহার কমানো এবং গ্যাসের মজুত বাড়ানোর বিষয়ে সতর্ক করেছে ইউরোপীয় কমিশন। প্রয়োজন অনুযায়ী সরকারি ভবনে তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণ, অপ্রয়োজনীয় আলোকসজ্জা বন্ধ রাখা এবং বিদ্যুতের সর্বোচ্চ চাহিদার সময়ে ব্যবহার কমানোর মতো পদক্ষেপ বিবেচনায় রয়েছে।

২১ অক্টোবর প্রকাশিত ইউরোনিউজের এক প্রতিবেদনে বলা হয়, হরমুজ প্রণালিতে বিঘ্ন কয়েক মাস ধরে চলতে থাকলে জ্বালানির চাহিদা কমানোর বিষয়ে ইইউর জ্বালানিমন্ত্রীরা আলোচনা করতে পারেন। ২৯ অক্টোবরের বৈঠকে এ বিষয়ে সম্ভাব্য পদক্ষেপ নিয়ে আলোচনা হওয়ার কথা রয়েছে।

তবে এসব ব্যবস্থা নিয়ে আলোচনা হওয়া মানেই সব দেশে বাধ্যতামূলক জ্বালানি রেশনিং চালু হচ্ছে—এমন নয়। ইউরোপীয় কর্তৃপক্ষের লক্ষ্য হলো সরবরাহের ঝুঁকি কমানো এবং প্রয়োজন হলে জরুরি পরিস্থিতি মোকাবিলার প্রস্তুতি রাখা।

এ ছাড়া সদস্যদেশগুলোকে গ্যাস আমদানির উৎস বৈচিত্র্যময় করা, সংরক্ষণাগারে গ্যাসের প্রবাহ অব্যাহত রাখা এবং বিদ্যুৎ উৎপাদনে বিকল্প জ্বালানির সক্ষমতা বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দিতে বলা হচ্ছে।

রাশিয়ার ওপর জ্বালানি নির্ভরতা কমানোর নীতি ইউরোপের বর্তমান সংকটকে আরও জটিল করে তুলেছে। রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের পর ইউরোপীয় দেশগুলো রুশ গ্যাস আমদানি কমানোর উদ্যোগ নেয়। এখন বিকল্প উৎস থেকে সরবরাহ নিশ্চিত করতে গিয়ে নতুন ব্যয় ও ভূরাজনৈতিক ঝুঁকির মুখে পড়তে হচ্ছে তাদের।

সাম্প্রতিক পরিস্থিতিতে ইউরোপে রাশিয়ার গ্যাস পুনরায় আমদানির সম্ভাবনা নিয়ে রাজনৈতিক আলোচনা শুরু হয়েছে। তবে রুশ জ্বালানি ফিরিয়ে আনলেই দ্রুত সংকট কেটে যাবে, এমন নিশ্চয়তা নেই। পাইপলাইন অবকাঠামো, চুক্তি, নিষেধাজ্ঞা এবং সরবরাহ পুনরুদ্ধারের সময়সীমা—সবই এ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ।

এ ছাড়া দীর্ঘমেয়াদে আমদানিনির্ভরতা কমাতে নবায়নযোগ্য জ্বালানি, বিদ্যুৎ সাশ্রয়ী প্রযুক্তি এবং বিকল্প তাপব্যবস্থায় বিনিয়োগের প্রয়োজনীয়তাও নতুন করে সামনে এসেছে।

ইউরোপের সামনে এখন সবচেয়ে বড় অনিশ্চয়তা হলো শীতের তীব্রতা এবং আন্তর্জাতিক জ্বালানি সরবরাহের ভবিষ্যৎ। আবহাওয়া তুলনামূলক উষ্ণ থাকলে গ্যাসের চাহিদা নিয়ন্ত্রণে রাখা সহজ হতে পারে। বিপরীতে দীর্ঘস্থায়ী শৈত্যপ্রবাহ এবং মধ্যপ্রাচ্যের সরবরাহ সংকট একসঙ্গে দেখা দিলে মজুত দ্রুত কমে যাওয়ার ঝুঁকি থাকবে।

এ অবস্থায় ইউরোপীয় দেশগুলোকে জ্বালানি সাশ্রয়, বিকল্প আমদানি, আন্তদেশীয় সরবরাহ সমন্বয় এবং সাধারণ মানুষের ব্যয় নিয়ন্ত্রণের মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখতে হবে।

বর্তমান পরিস্থিতি ইউরোপের জ্বালানি ব্যবস্থার দুর্বলতা আবারও সামনে এনেছে। শীতের শেষ পর্যন্ত সরবরাহ স্বাভাবিক রাখা সম্ভব হবে কি না, তা নির্ভর করবে আবহাওয়া, আন্তর্জাতিক সংঘাত এবং বিকল্প উৎস থেকে জ্বালানি আমদানির ওপর।

ChannelNRB Footer