News Ticker
221.png

টাইফুন ‘চাম্পির’ তাণ্ডবে লণ্ডভণ্ড তাইওয়ান

অনলাইন ডেস্ক

প্রকাশিত: ২৪ অক্টোবর, ২০২৬ ১৯:৩৭

শেয়ার

শেয়ার

টাইফুন ‘চাম্পির’ তাণ্ডবে লণ্ডভণ্ড তাইওয়ান
ছবি: সংগৃহীত

প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে সৃষ্ট শক্তিশালী টাইফুন ‘চাম্পি’র তাণ্ডবে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির মুখে পড়েছে পূর্ব এশিয়ার দ্বীপরাষ্ট্র তাইওয়ান। প্রবল ঝোড়ো হাওয়া, মুষলধারে বৃষ্টি ও উত্তাল ঢেউয়ের আঘাতে দেশটির বিভিন্ন এলাকায় গাছপালা উপড়ে পড়েছে, সড়ক যোগাযোগ ব্যাহত হয়েছে এবং বিদ্যুৎ সরবরাহে বড় ধরনের বিপর্যয় দেখা দিয়েছে। এ ঘটনায় এখন পর্যন্ত একজনের মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে। আহত হয়েছেন ৬১৬ জন। দুর্যোগ মোকাবিলায় কয়েক হাজার মানুষকে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে।

তাইওয়ানের কেন্দ্রীয় জরুরি কার্যক্রম কেন্দ্রের (সিইওসি) সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, শনিবার বিকেল ৫টা পর্যন্ত টাইফুনের প্রভাবে দেশজুড়ে ৯ হাজার ২৭টি ক্ষয়ক্ষতির প্রতিবেদন পাওয়া গেছে। এর মধ্যে ৩ হাজার ২৮৭টি ঘটনায় গাছ উপড়ে পড়ার তথ্য রয়েছে। রাজধানী তাইপে ও মধ্যাঞ্চলের বিভিন্ন এলাকায় ঝড়ের প্রভাব বিশেষভাবে অনুভূত হয়েছে।

টাইফুন চাম্পির প্রভাবে তাইওয়ানের উপকূলীয় এলাকাগুলোতে সাগর উত্তাল হয়ে ওঠে। দক্ষিণাঞ্চলের পিংতুং কাউন্টির লিউচিউ এলাকায় ঝড়ের প্রভাবে সৃষ্ট ঢেউয়ে ভেসে গিয়ে এক ব্যক্তির মৃত্যু হয়েছে বলে জানিয়েছে কর্তৃপক্ষ।

পূর্ব উপকূলের বিভিন্ন এলাকায় বিশাল ঢেউ আছড়ে পড়ে। তাইতুং কাউন্টির ফুগাং মৎস্যবন্দরে শুক্রবার উত্তাল ঢেউয়ের ধাক্কায় একটি বড় ক্রেন সাগরে পড়ে যায়। একই কাউন্টির চাংবিন বন্দরে প্রায় আট মিটার উঁচু ঢেউ আঘাত হানে। এতে সাগরের পানি সড়কে উঠে আসে এবং কয়েকটি বাঁশের ভেলা উল্টে যায়।

প্রবল বাতাস ও ভারী বৃষ্টির কারণে বিভিন্ন এলাকায় গাছ, বৈদ্যুতিক তার, বিজ্ঞাপনী বোর্ড এবং অন্যান্য স্থাপনা ক্ষতিগ্রস্ত হয়। অধিকাংশ আহত ব্যক্তির আঘাত গুরুতর নয় বলে জানিয়েছে জরুরি কর্তৃপক্ষ।

চাম্পির আঘাতে তাইওয়ানের বিদ্যুৎব্যবস্থায় বড় ধরনের বিঘ্ন ঘটে। দেশটিতে একপর্যায়ে ৩ লাখ ৪০ হাজারের বেশি পরিবার বিদ্যুৎবিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। শনিবার সন্ধ্যা পর্যন্ত প্রায় ২২ হাজার পরিবার বিদ্যুৎহীন ছিল। ক্ষতিগ্রস্ত এলাকায় বিদ্যুৎ সরবরাহ পুনরায় চালু করতে জরুরি কর্মীরা কাজ চালিয়ে যাচ্ছেন।

ঝড়ের কারণে রাজধানী তাইপেসহ উত্তর ও মধ্য তাইওয়ানের বিভিন্ন এলাকায় দোকানপাট, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও অফিসের কার্যক্রম বন্ধ রাখা হয়। পরিস্থিতি বিবেচনায় জনসাধারণকে ঘরে অবস্থান করার এবং ঝুঁকিপূর্ণ উপকূলীয় অঞ্চল এড়িয়ে চলার পরামর্শ দেওয়া হয়।

টাইফুনের প্রভাবে তাইওয়ানের বিভিন্ন এলাকায় অস্বাভাবিক ভারী বৃষ্টিপাত হয়েছে। ইয়িলান কাউন্টিতে বৃহস্পতিবার থেকে শনিবার বিকেল ৪টা পর্যন্ত মোট ৬৫০ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে। তাoyুয়ান ও সিনচু কাউন্টির কয়েকটি এলাকায় বৃষ্টিপাত ৫০০ মিলিমিটার ছাড়িয়েছে। রাজধানী তাইপেতেও প্রায় ৪৭০ মিলিমিটার বৃষ্টি হয়েছে।

অবিরাম বর্ষণে পাহাড়ি এলাকায় ভূমিধস এবং নিচু এলাকায় আকস্মিক বন্যার আশঙ্কা তৈরি হয়। ঝুঁকিপূর্ণ বসতিতে বসবাসকারী প্রায় ৪ হাজার ৯৬০ জনকে সতর্কতামূলকভাবে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে।

তাইওয়ানের বিভিন্ন এলাকায় সড়কের অংশবিশেষ ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় যান চলাচলে বিঘ্ন ঘটে। পূর্বাঞ্চলের কিছু সড়কে ভূমিক্ষয় দেখা দেয়। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে ক্ষতিগ্রস্ত সড়ক মেরামত ও ঝুঁকিপূর্ণ অংশে যান চলাচল নিয়ন্ত্রণের উদ্যোগ নিয়েছে কর্তৃপক্ষ।

টাইফুনের কারণে আকাশপথেও ব্যাপক বিঘ্ন সৃষ্টি হয়েছে। পরিবহন মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, শনিবার ২৪২টি ফ্লাইট বাতিল করা হয়। এর আগের দিন বাতিল হয়েছিল প্রায় এক হাজার ফ্লাইট। ঝড়ের প্রভাবে সমুদ্রপথেও সতর্কতা জারি করা হয় এবং বিভিন্ন এলাকায় চলাচল সীমিত রাখা হয়।

উত্তর ও মধ্য তাইওয়ানের বিভিন্ন শহর ও কাউন্টিতে দ্বিতীয় দিনের মতো অফিস ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ রাখা হয়। ঝড়ের গতিপথ পরিবর্তন এবং আবহাওয়ার পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করে ধাপে ধাপে স্বাভাবিক কার্যক্রম চালুর প্রস্তুতি নিচ্ছে প্রশাসন।

তাইওয়ানের আবহাওয়া প্রশাসনের তথ্য অনুযায়ী, চাম্পি একপর্যায়ে সুপার টাইফুনে পরিণত হয়েছিল। তবে দ্বীপটির উত্তর-পূর্ব উপকূলের পাশ দিয়ে অগ্রসর হওয়ার পর ঝড়টির শক্তি কমতে শুরু করে। শনিবার বিকেল ৫টার দিকে ঝড়টির কেন্দ্র তাইপের প্রায় ৩২০ কিলোমিটার উত্তর-পূর্বে অবস্থান করছিল। তখন এর বাতাসের সর্বোচ্চ স্থায়ী গতি ছিল ঘণ্টায় প্রায় ১০১ কিলোমিটার এবং দমকা হাওয়ার গতি ছিল ঘণ্টায় ১২৬ কিলোমিটার পর্যন্ত।

শনিবার দুপুরে স্থলভাগের জন্য জারি করা টাইফুন সতর্কতা প্রত্যাহার করা হলেও সমুদ্রের জন্য সতর্কতা বহাল ছিল। আবহাওয়াবিদেরা জানিয়েছেন, ঝড়ের বাইরের অংশের প্রভাবে উত্তরাঞ্চল ও পাহাড়ি এলাকায় বৃষ্টি অব্যাহত থাকতে পারে। ফলে পরিস্থিতি স্বাভাবিক হতে আরও কিছুটা সময় লাগতে পারে।

তাইওয়ান অতিক্রম করার পর টাইফুন চাম্পি উত্তর দিকে অগ্রসর হয়ে দক্ষিণ জাপানের দিকে এগোচ্ছে। একই সঙ্গে চীনের পূর্ব উপকূলীয় অঞ্চলগুলোতেও ঝড়টির সম্ভাব্য প্রভাব নিয়ে সতর্কতা জারি করা হয়েছে।

চীনের ঝুঁকিপূর্ণ উপকূলীয় এলাকায় উদ্ধারকর্মী ও জরুরি সরঞ্জাম প্রস্তুত রাখা হয়েছে। কিছু এলাকায় মৎস্য নৌযানগুলোকে বন্দরে ফিরে আসার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে এবং ফেরি চলাচল সীমিত করা হয়েছে। সাংহাইসহ কয়েকটি অঞ্চলে ভারী থেকে অতি ভারী বৃষ্টিপাতের আশঙ্কা করা হচ্ছে।

ChannelNRB Footer