News Ticker
221.png

ক্যানসার ভ্যাকসিনের বড় সাফল্য, ফিরে আসার ঝুঁকি কমাল ৪২ শতাংশ

অনলাইন ডেস্ক

প্রকাশিত: ২৪ অক্টোবর, ২০২৬ ২০:২২

শেয়ার

শেয়ার

ক্যানসার ভ্যাকসিনের বড় সাফল্য, ফিরে আসার ঝুঁকি কমাল ৪২ শতাংশ
ছবি: সংগৃহীত

ক্যানসার চিকিৎসায় নতুন আশার আলো দেখাচ্ছেন বিজ্ঞানীরা। রোগীর নিজের টিউমারের জিনগত বৈশিষ্ট্য বিশ্লেষণ করে তৈরি একটি ব্যক্তিভিত্তিক ক্যানসার ভ্যাকসিন প্রচলিত ইমিউনোথেরাপির সঙ্গে প্রয়োগ করে ক্যানসার ফিরে আসা বা মৃত্যুর সম্মিলিত ঝুঁকি ৪২ শতাংশ কমানো সম্ভব হয়েছে। উচ্চ ঝুঁকির মেলানোমা বা ত্বকের এক ধরনের ক্যানসারে আক্রান্ত রোগীদের নিয়ে পরিচালিত তৃতীয় ধাপের (ফেজ-৩) আন্তর্জাতিক ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালে এ ফল পাওয়া গেছে।

ভ্যাকসিনটির নাম ইনটিসমেরান অটোজিন (Intismeran autogene)। এটি তৈরি করছে যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক ওষুধ প্রস্তুতকারক প্রতিষ্ঠান মডার্না ও মার্ক (Merck & Co.)। ভ্যাকসিনটি এককভাবে নয়, মার্কের তৈরি ক্যানসার প্রতিরোধী ইমিউনোথেরাপির ওষুধ পেমব্রোলিজুমাবের (Pembrolizumab), বাণিজ্যিক নাম কিট্রুডা (Keytruda), সঙ্গে প্রয়োগ করা হয়েছে।

গবেষণার ফলাফল ২০২৬ সালের অক্টোবরে প্রকাশ্যে আসে। চিকিৎসাবিজ্ঞানে ব্যক্তিভিত্তিক ক্যানসার চিকিৎসার সম্ভাবনা নিয়ে নতুন করে আশাবাদ তৈরি হয়েছে এই সাফল্যে।

গবেষণায় মোট ১ হাজার ১৩৭ জন উচ্চ ঝুঁকির মেলানোমা রোগী অংশ নেন। অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে তাঁদের টিউমার অপসারণ করা হয়েছিল। তবে চিকিৎসকদের আশঙ্কা ছিল, ভবিষ্যতে তাঁদের ক্যানসার আবার ফিরে আসতে পারে।

অংশগ্রহণকারীদের দুই ভাগে ভাগ করা হয়। একদলকে পেমব্রোলিজুমাবের সঙ্গে ব্যক্তিভিত্তিক ভ্যাকসিন দেওয়া হয়। অন্যদলকে দেওয়া হয় পেমব্রোলিজুমাবের সঙ্গে প্লাসিবো বা কার্যকর ওষুধবিহীন বিকল্প।

প্রায় দুই বছরের পর্যবেক্ষণে দেখা যায়, ভ্যাকসিন ও ইমিউনোথেরাপির সমন্বয় পাওয়া রোগীদের ক্যানসার ফিরে আসা বা মৃত্যুর সম্মিলিত ঝুঁকি শুধু ইমিউনোথেরাপি পাওয়া রোগীদের তুলনায় ৪২ শতাংশ কম ছিল। পাশাপাশি ক্যানসার শরীরের অন্য অংশে ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকিও কমেছে ৩৮ শতাংশ।

প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, প্রায় দুই বছর পর ভ্যাকসিন ও ইমিউনোথেরাপির সমন্বয় পাওয়া রোগীদের ৮২ শতাংশের বেশি ক্যানসারমুক্ত ছিলেন। অন্যদিকে, শুধু ইমিউনোথেরাপি পাওয়া রোগীদের ক্ষেত্রে এ হার ছিল প্রায় ৭০ শতাংশ।

এখানে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, ৪২ শতাংশ কমার হিসাবটি আপেক্ষিক ঝুঁকি হ্রাসের পরিমাপ। এর অর্থ এই নয় যে ভ্যাকসিন নেওয়া প্রতি ১০০ জনের মধ্যে নিশ্চিতভাবে ৪২ জনের ক্যানসার সেরে যাবে। বরং পরীক্ষায় তুলনামূলক চিকিৎসা পাওয়া দলের চেয়ে ক্যানসার ফিরে আসা বা মৃত্যুর সম্মিলিত ঝুঁকি কম পাওয়া গেছে।

সাধারণ টিকা মূলত সংক্রামক রোগ প্রতিরোধে শরীরের রোগপ্রতিরোধব্যবস্থাকে প্রস্তুত করে। কিন্তু এই ক্যানসার ভ্যাকসিনের কাজ ভিন্ন। এটি ক্যানসার শনাক্ত হওয়ার পর, বিশেষ করে অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে টিউমার অপসারণের পর, শরীরে থেকে যাওয়া ক্যানসার কোষ শনাক্ত ও ধ্বংস করতে রোগপ্রতিরোধব্যবস্থাকে প্রশিক্ষণ দেওয়ার উদ্দেশ্যে তৈরি।

প্রথমে রোগীর টিউমারের নমুনা সংগ্রহ করা হয়। এরপর জিনগত বিশ্লেষণের মাধ্যমে ক্যানসার কোষের বিশেষ মিউটেশন বা পরিবর্তন শনাক্ত করা হয়। এসব পরিবর্তনের ভিত্তিতে তৈরি করা হয় রোগীর জন্য নির্দিষ্ট এমআরএনএ-ভিত্তিক ভ্যাকসিন।

ভ্যাকসিনটি শরীরের রোগপ্রতিরোধী কোষকে ক্যানসারের বিশেষ বৈশিষ্ট্য চিনতে শেখাতে সাহায্য করে। ফলে ভবিষ্যতে একই ধরনের ক্যানসার কোষ দেখা দিলে সেগুলোকে শনাক্ত করে আক্রমণ করার সক্ষমতা বাড়তে পারে।

এখানে এমআরএনএ প্রযুক্তি ব্যবহার করা হয়েছে, যে প্রযুক্তি কোভিড-১৯-এর কিছু টিকা তৈরিতেও ব্যবহৃত হয়েছিল। তবে ক্যানসার ভ্যাকসিনটির লক্ষ্য ও প্রয়োগপদ্ধতি সম্পূর্ণ আলাদা।

ভ্যাকসিনটি পেমব্রোলিজুমাব নামের ইমিউনোথেরাপির সঙ্গে ব্যবহার করা হয়েছে। পেমব্রোলিজুমাব শরীরের রোগপ্রতিরোধব্যবস্থার ওপর ক্যানসারের তৈরি কিছু বাধা দূর করতে সাহায্য করে। এর ফলে রোগপ্রতিরোধী কোষ ক্যানসার কোষকে শনাক্ত ও আক্রমণ করার সুযোগ পায়।

অন্যদিকে, ব্যক্তিভিত্তিক ভ্যাকসিন রোগীর নিজস্ব টিউমারের বৈশিষ্ট্য অনুযায়ী রোগপ্রতিরোধব্যবস্থাকে লক্ষ্য নির্ধারণে সহায়তা করে।

গবেষকদের ধারণা, এই দুই পদ্ধতি একসঙ্গে কাজ করায় ক্যানসারের বিরুদ্ধে প্রতিরোধী প্রতিক্রিয়া আরও কার্যকর হতে পারে। তবে কোন রোগী কতটা উপকৃত হবেন এবং দীর্ঘমেয়াদে কতটা সুফল পাওয়া যাবে, তা বুঝতে আরও পর্যবেক্ষণ প্রয়োজন।

পরীক্ষায় আশাব্যঞ্জক ফল পাওয়া গেছে উচ্চ ঝুঁকির মেলানোমা রোগীদের ক্ষেত্রে। অন্য ধরনের ক্যানসারেও একই পদ্ধতি কার্যকর হবে কি না, তা পৃথক গবেষণার মাধ্যমে প্রমাণ করতে হবে।

ফুসফুস, কিডনি, মূত্রথলি ও অগ্ন্যাশয়ের ক্যানসারসহ বিভিন্ন রোগে ব্যক্তিভিত্তিক ক্যানসার ভ্যাকসিন নিয়ে গবেষণা চলছে। তবে একটি ক্যানসারে সাফল্য পাওয়া মানেই অন্য সব ক্যানসারের ক্ষেত্রেও একই ফল পাওয়া যাবে—এমন নিশ্চয়তা নেই।

প্রতিটি রোগীর টিউমারের জিনগত বৈশিষ্ট্য আলাদা হওয়ায় এই ধরনের চিকিৎসা তৈরি করাও জটিল। টিউমারের নমুনা সংগ্রহ, জিনগত বিশ্লেষণ, ভ্যাকসিন তৈরি ও রোগীর কাছে পৌঁছে দেওয়ার জন্য উন্নত প্রযুক্তি এবং বিশেষায়িত চিকিৎসাব্যবস্থা প্রয়োজন।

গবেষণায় ভ্যাকসিনের কারণে ইনজেকশন দেওয়ার স্থানে ব্যথা, ক্লান্তি, মাথাব্যথা, কাঁপুনি বা স্বল্পমাত্রার অন্যান্য পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ার কথা জানানো হয়েছে। প্রকাশিত ফলাফলে ভ্যাকসিন যুক্ত করার কারণে পেমব্রোলিজুমাবের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে যাওয়ার প্রমাণ পাওয়া যায়নি।

তবে দীর্ঘমেয়াদি নিরাপত্তা, বিরল পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া এবং বিভিন্ন ধরনের রোগীর ক্ষেত্রে চিকিৎসার ফলাফল সম্পর্কে আরও তথ্য প্রয়োজন। তাই চিকিৎসাবিজ্ঞানের প্রচলিত মূল্যায়ন ও নিয়ন্ত্রক সংস্থার অনুমোদন গুরুত্বপূর্ণ।

এখনো ভ্যাকসিনটি সর্বসাধারণের জন্য নিয়মিত চিকিৎসা হিসেবে অনুমোদিত ও সহজলভ্য নয়। গবেষণার ফলাফলের ভিত্তিতে নিয়ন্ত্রক অনুমোদনের প্রক্রিয়া এগিয়ে নেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। তবে দেশভেদে অনুমোদনের সময়সীমা আলাদা হতে পারে।

ব্যক্তিভিত্তিক ভ্যাকসিন তৈরির খরচ, চিকিৎসার প্রাপ্যতা এবং দীর্ঘমেয়াদি কার্যকারিতা নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে। বিশেষ করে বাংলাদেশের মতো দেশে উন্নত জিনগত পরীক্ষার সুবিধা, চিকিৎসার ব্যয় এবং বিশেষায়িত চিকিৎসাকেন্দ্রে প্রবেশাধিকার এ ধরনের চিকিৎসা চালুর ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে উঠতে পারে।

দীর্ঘদিন ধরেই ক্যানসার কোষকে লক্ষ্য করে রোগপ্রতিরোধব্যবস্থাকে সক্রিয় করার চেষ্টা করছেন বিজ্ঞানীরা। তবে রোগীর নিজস্ব টিউমারের জিনগত বৈশিষ্ট্য অনুযায়ী তৈরি ভ্যাকসিনের মাধ্যমে বড় পরিসরের তৃতীয় ধাপের পরীক্ষায় ইতিবাচক ফল পাওয়া এ ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি।

এই গবেষণা ভবিষ্যতে ক্যানসার চিকিৎসাকে আরও ব্যক্তিভিত্তিক করার পথ খুলে দিতে পারে। অস্ত্রোপচারের পর ক্যানসার ফিরে আসার ঝুঁকিতে থাকা রোগীদের জন্য এটি বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে।

ChannelNRB Footer