ইউরোপের দেশ ফ্রান্সে সরকারবিরোধী বিক্ষোভ নতুন মাত্রা পেয়েছে। জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি, শিক্ষা খাতে অর্থসংকট, শিক্ষকস্বল্পতা এবং সরকারি জনসেবার অবনতির প্রতিবাদে রাজধানী প্যারিসসহ দেশটির বিভিন্ন শহরে রাজপথে নেমেছেন লাখো মানুষ। শনিবার (২৪ অক্টোবর) অনুষ্ঠিত দেশব্যাপী বিক্ষোভের একপর্যায়ে কয়েকটি শহরে বিক্ষোভকারীদের সঙ্গে পুলিশের সংঘর্ষ হয়। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে কাঁদানে গ্যাস, জলকামান ও সাউন্ড গ্রেনেড ব্যবহার করেছে নিরাপত্তা বাহিনী।
ফ্রান্সের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সর্বশেষ হিসাব অনুযায়ী, বিক্ষোভের ঘটনায় দেশজুড়ে ১ হাজার ৩১৪ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। একই দিনে দেশব্যাপী বিক্ষোভে অংশ নিয়েছেন প্রায় ৪ লাখ ১০ হাজার মানুষ। তবে শ্রমিক সংগঠনগুলোর দাবি, বিক্ষোভকারীর সংখ্যা প্রায় ৮ লাখ। পরিস্থিতি মোকাবিলায় দেশজুড়ে প্রায় ৭০ হাজার পুলিশ ও জেন্ডারমেরি সদস্য মোতায়েন করা হয়েছিল।
এর আগে ১৭ অক্টোবরের বিক্ষোভে ব্যাপক ভাঙচুর ও লুটপাটের ঘটনা ঘটেছিল। সেই পরিস্থিতির পুনরাবৃত্তি ঠেকাতে এবার আগেভাগেই কঠোর নিরাপত্তাব্যবস্থা নেয় সরকার। তবু দিনের শেষ দিকে প্যারিসসহ কয়েকটি শহরে সংঘর্ষ ছড়িয়ে পড়ে।
বিক্ষোভের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে ফ্রান্সের রাজধানী প্যারিস। শনিবার শহরটির দক্ষিণ-পূর্ব প্রান্তে অনুষ্ঠিত প্রধান মিছিলে বিপুলসংখ্যক মানুষ অংশ নেন। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের হিসাবে, প্যারিসের মিছিলে অংশ নেন প্রায় ১ লাখ ১০ হাজার মানুষ। অন্যদিকে আয়োজক শ্রমিক সংগঠনগুলোর দাবি, অংশগ্রহণকারীর সংখ্যা ছিল প্রায় আড়াই লাখ।
মিছিলের বড় অংশ শান্তিপূর্ণভাবে অনুষ্ঠিত হলেও শেষ পর্যায়ে পরিস্থিতির অবনতি ঘটে। মুখোশধারী একদল বিক্ষোভকারী পুলিশের দিকে বিভিন্ন বস্তু ও আতশবাজি নিক্ষেপ করলে নিরাপত্তা বাহিনী কাঁদানে গ্যাস ও জলকামান ব্যবহার করে। একপর্যায়ে বিক্ষোভকারীদের ছত্রভঙ্গ করতে অভিযান চালায় পুলিশ।
নিরাপত্তাজনিত উদ্বেগে শহরের বিভিন্ন এলাকায় দোকানপাট বন্ধ রাখা হয়। কিছু সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান ও জাদুঘরও সতর্কতামূলক ব্যবস্থা হিসেবে বন্ধ ছিল। কেন্দ্রীয় এলাকার একাধিক মেট্রো স্টেশন বন্ধ থাকায় যাত্রী চলাচল ব্যাহত হয়। ফলে প্যারিসের স্বাভাবিক জনজীবন ও ব্যবসায়িক কার্যক্রমে চাপ তৈরি হয়।
তবে পুরো প্যারিস শহর সম্পূর্ণ অচল হয়ে পড়েছিল—এমন তথ্য নিশ্চিত নয়। বরং গুরুত্বপূর্ণ কিছু এলাকায় চলাচল সীমিত হওয়া, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ রাখা এবং পরিবহন ব্যবস্থায় বিঘ্নের কারণে পরিস্থিতি অনেকটা অচলাবস্থার রূপ নেয়।
ফ্রান্সে চলমান আন্দোলনের সূত্রপাত হয়েছিল শিক্ষা খাতের সংকট নিয়ে শিক্ষার্থীদের প্রতিবাদ থেকে। গত মাসে প্যারিসের উপকণ্ঠের একটি বিদ্যালয়ে শিক্ষক ও কর্মীস্বল্পতার প্রতিবাদে শুরু হওয়া আন্দোলন ধীরে ধীরে দেশব্যাপী কর্মসূচিতে রূপ নেয়।
পরবর্তী সময়ে এর সঙ্গে যুক্ত হয় জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি, জ্বালানি ও নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের উচ্চমূল্য, কর্মসংস্থানের অনিশ্চয়তা, মজুরি এবং জনসেবার মান নিয়ে অসন্তোষ।
শিক্ষার্থীরা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পর্যাপ্ত শিক্ষক নিয়োগ, শিক্ষা খাতে বরাদ্দ বৃদ্ধি, উন্নত অবকাঠামো এবং উচ্চশিক্ষায় আর্থিক সহায়তা বাড়ানোর দাবি জানাচ্ছেন। অন্যদিকে শ্রমিক সংগঠনগুলো মজুরি বৃদ্ধি, জীবনযাত্রার ব্যয় কমানো এবং সাধারণ মানুষের জন্য সরকারি সেবা নিশ্চিত করার আহ্বান জানিয়েছে।
আন্দোলনে বিভিন্ন পেশার মানুষ, শিক্ষক, শ্রমিক এবং অন্যান্য সামাজিক গোষ্ঠীর অংশগ্রহণের ফলে বিক্ষোভের পরিধি আরও বিস্তৃত হয়েছে।
প্যারিসের বাইরে ফ্রান্সের দ্বিতীয় বৃহত্তম শহর মার্সেইতেও উত্তেজনাকর পরিস্থিতি তৈরি হয়। সেখানে একদল তরুণ রাস্তায় ময়লার পাত্রে আগুন ধরিয়ে যান চলাচলে বাধা সৃষ্টি করেন এবং নিরাপত্তা বাহিনীর দিকে পাথর ও বোতল নিক্ষেপ করেন। কয়েকটি দোকানেও ভাঙচুর ও লুটপাটের খবর পাওয়া গেছে।
লিয়ঁ, বোর্দো, গ্রেনোবল, ক্লেরমঁ-ফেরঁ, লিল, রেন, নঁত এবং তুলুজসহ বিভিন্ন শহরেও সংঘর্ষ বা উত্তেজনার খবর পাওয়া যায়। কয়েকটি স্থানে পুলিশ বিক্ষোভকারীদের ছত্রভঙ্গ করতে কাঁদানে গ্যাস ব্যবহার করে। নঁত ও নিসে জলকামান ব্যবহারের খবরও প্রকাশিত হয়েছে।
নিস শহরে বিক্ষোভকারীদের সঙ্গে উগ্র ডানপন্থী কর্মীদের সংঘর্ষের ঘটনাও সামনে এসেছে। স্থানীয় কর্তৃপক্ষের তথ্যমতে, সেখানে ১১ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
তবে দেশজুড়ে সব বিক্ষোভ সহিংস ছিল না। বিভিন্ন শহরে অধিকাংশ মিছিল শান্তিপূর্ণভাবে অনুষ্ঠিত হয়; সংঘর্ষ মূলত কিছু নির্দিষ্ট স্থানে ও কর্মসূচির শেষ দিকে দেখা দেয়।
গত সপ্তাহের সহিংসতার অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়ে এবার ব্যাপক নিরাপত্তাব্যবস্থা গ্রহণ করে ফরাসি সরকার। দেশজুড়ে প্রায় ৭০ হাজার পুলিশ ও জেন্ডারমেরি সদস্য মোতায়েন করা হয়। নিরাপত্তা অভিযানে হেলিকপ্টার, সাঁজোয়া যান এবং অন্যান্য বিশেষ সরঞ্জামও প্রস্তুত রাখা হয়েছিল।
কর্তৃপক্ষের লক্ষ্য ছিল গুরুত্বপূর্ণ সরকারি ভবন, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ও জনসমাগমস্থল সুরক্ষিত রাখা এবং অননুমোদিত মিছিলের মাধ্যমে সহিংসতা ছড়িয়ে পড়া ঠেকানো।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী লরাঁ নুনেজের ভাষ্য অনুযায়ী, আগাম তল্লাশি, বাড়তি পুলিশ মোতায়েন এবং ঝুঁকিপূর্ণ এলাকাগুলোতে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়ার কারণে আগের সপ্তাহের তুলনায় বড় ধরনের লুটপাট ও ভাঙচুর অনেকাংশে নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব হয়েছে।
তবে পুলিশের কঠোর অবস্থান নিয়ে সমালোচনাও রয়েছে। বিক্ষোভকারীদের একাংশের অভিযোগ, মিছিলের নির্ধারিত পথ পরিবর্তন এবং শহরের কেন্দ্রস্থলে প্রবেশে বিধিনিষেধ আরোপের ফলে শান্তিপূর্ণভাবে প্রতিবাদ জানানোর সুযোগ সীমিত হয়েছে।
ফ্রান্সের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ২৫ অক্টোবরের হিসাবে, শনিবারের বিক্ষোভে দেশজুড়ে ১ হাজার ৩১৪ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। এর মধ্যে প্যারিসে গ্রেপ্তারের সংখ্যা ছিল ১৪২ বলে পুলিশ জানিয়েছে। দেশজুড়ে সংঘর্ষে প্রায় ৫০ জন পুলিশ সদস্য আহত হওয়ার খবরও প্রকাশিত হয়েছে।
কর্তৃপক্ষ বলছে, সহিংসতায় জড়িত ব্যক্তিদের শনাক্ত করা এবং সরকারি সম্পত্তি ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে অভিযান অব্যাহত রয়েছে।
অন্যদিকে আন্দোলনকারীদের বিভিন্ন অংশের বক্তব্য, সহিংসতার বিচ্ছিন্ন ঘটনাকে কেন্দ্র করে পুরো আন্দোলনকে অপরাধমূলক হিসেবে বিবেচনা করা উচিত নয়। শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভের অধিকার নিশ্চিত করার পাশাপাশি ভাঙচুর ও হামলার ঘটনায় জড়িত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি উঠেছে।
আরও পড়ুন:







