জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি, আবাসনসংকট, যুদ্ধবিরোধী দাবি ও সরকারের নীতির প্রতিবাদে বিক্ষোভে উত্তাল হয়ে উঠেছে ইউরোপের দেশ ইতালি। শনিবার (২৪ অক্টোবর) রাজধানী রোমসহ মিলান, তুরিন, বোলোনিয়া ও ফ্লোরেন্সে হাজারো মানুষ রাস্তায় নেমে বিক্ষোভ করেন। কয়েকটি শহরে বিক্ষোভকারীদের সঙ্গে পুলিশের সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রোম, তুরিন ও বোলোনিয়ায় কাঁদানে গ্যাস ও জলকামান ব্যবহার করে পুলিশ।
বিক্ষোভকারীদের অন্যতম প্রধান দাবি দ্রব্যমূল্য ও জীবনযাত্রার ব্যয় কমানো। বাড়িভাড়া বৃদ্ধি, তরুণদের কর্মসংস্থানের অনিশ্চয়তা এবং আবাসনসংকট নিয়েও ক্ষোভ প্রকাশ করেন তাঁরা।
এ ছাড়া প্রধানমন্ত্রী জর্জিয়া মেলোনির সরকারের নীতি, সামরিক ব্যয় এবং মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধের বিরুদ্ধেও প্রতিবাদ জানান বিভিন্ন সংগঠনের সদস্য ও শিক্ষার্থীরা।
বিক্ষোভকারীদের মতে, ক্রমবর্ধমান ব্যয়ের চাপে সাধারণ মানুষ ও তরুণদের জীবন কঠিন হয়ে উঠছে। তাঁদের দাবি, শিক্ষা, আবাসন ও সামাজিক সুরক্ষায় সরকারি বিনিয়োগ বাড়াতে হবে।
রাজধানী রোমে বিক্ষোভকারীরা প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের দিকে অগ্রসর হওয়ার চেষ্টা করলে পুলিশের বাধার মুখে পড়েন। একপর্যায়ে কয়েকজন বিক্ষোভকারী পুলিশকে লক্ষ্য করে বোতল, আতশবাজি ও অন্যান্য বস্তু নিক্ষেপ করেন বলে সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে।
পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পুলিশ জলকামান ও লাঠি ব্যবহার করে। এর আগে রোমের ঐতিহাসিক কলোসিয়াম এলাকায়ও উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। বিক্ষোভকারীদের একটি দল সেখানে প্রবেশ করে স্লোগান দেন। পরে কর্তৃপক্ষ তাঁদের সেখান থেকে বের করে দেয়।
তুরিন ও বোলোনিয়াতেও বিক্ষোভকারীদের সঙ্গে পুলিশের সংঘর্ষ হয়। কয়েকটি স্থানে কাঁদানে গ্যাস ও জলকামান ব্যবহার করা হয়। এসব ঘটনায় কয়েকজন আহত হওয়ার খবর পাওয়া গেছে।
বিক্ষোভ ও সহিংসতা মোকাবিলায় ইতালির গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যিক শহর মিলানে অতিরিক্ত ৫০০ সেনা মোতায়েন করেছে সরকার। এর আগে গত সপ্তাহে সেখানে বিক্ষোভ চলাকালে পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষ, দোকানপাটে লুটপাট ও ভাঙচুরের ঘটনা ঘটেছিল।
নতুন করে সহিংসতা এড়াতে শহরের গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় বাড়তি নিরাপত্তা জোরদার করা হয়। কয়েকটি বিলাসবহুল দোকানের জানালাও কাঠের বোর্ড দিয়ে ঢেকে রাখা হয়। রেলস্টেশন ও শহরের কেন্দ্রীয় এলাকায় নজরদারি বাড়ানো হয়।
তবে শনিবারের বিক্ষোভে মিলানের পরিস্থিতি তুলনামূলক শান্ত ছিল। সেখানে হাজারো মানুষ মিছিল করেন। কিছু স্থানে বিক্ষোভকারী ও ডানপন্থী কর্মীদের মধ্যে বাক্বিতণ্ডা হলেও বড় ধরনের লুটপাট বা ভাঙচুরের খবর পাওয়া যায়নি।
ইতালির নিরাপত্তা কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, শনিবারের বিক্ষোভের ঘটনায় দেশজুড়ে নয়জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। এ ছাড়া ৩৭১ জনকে পরিচয় যাচাই ও জিজ্ঞাসাবাদের জন্য পুলিশ স্টেশনে নেওয়া হয়েছিল। তাঁদের মধ্যে ১১০ জন অপ্রাপ্তবয়স্ক।
গত সপ্তাহের সহিংসতার সঙ্গে সংশ্লিষ্টতার অভিযোগে মিলান ও আশপাশের এলাকায় তদন্তও জোরদার করা হয়েছে। বিক্ষোভের সঙ্গে যুক্ত একটি আন্দোলনের সংগঠক বলে সন্দেহ করা এক ব্যক্তিকেও আটক করে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়েছে।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মাত্তেও পিয়ান্তেদোসি জানিয়েছেন, সংবেদনশীল এলাকাগুলোতে নিরাপত্তাব্যবস্থা জোরদার করা হয়েছে। সহিংসতা ও জনসম্পদের ক্ষতিসাধনের ঘটনায় কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলেও সতর্ক করেছে সরকার।
প্রধানমন্ত্রী জর্জিয়া মেলোনি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের ধন্যবাদ জানিয়েছেন। তাঁর বক্তব্য, শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভের অধিকার নিশ্চিত করার পাশাপাশি সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা রক্ষা করাও জরুরি।
অন্যদিকে, শিক্ষার্থী ও বিভিন্ন সামাজিক সংগঠন বলছে, শুধু নিরাপত্তা জোরদার করে জনঅসন্তোষ দূর করা সম্ভব নয়। জীবনযাত্রার ব্যয়, আবাসন, শিক্ষা ও কর্মসংস্থানের মতো সমস্যার কার্যকর সমাধান প্রয়োজন।
ইতালির পাশাপাশি ইউরোপের আরও কয়েকটি দেশে বিভিন্ন দাবিতে বিক্ষোভ হয়েছে। কোথাও আবাসন ব্যয় ও পেনশন নিয়ে, আবার কোথাও শিক্ষা খাতে বিনিয়োগ, দুর্নীতি ও যুদ্ধবিরোধী দাবিতে মানুষ রাস্তায় নেমেছেন।
ইতালিতে সাম্প্রতিক বিক্ষোভের বিস্তার দেশটির অর্থনৈতিক চাপ ও সামাজিক অসন্তোষ নিয়ে নতুন করে আলোচনা তৈরি করেছে। তবে বিক্ষোভের ভবিষ্যৎ গতিপথ নির্ভর করবে সরকারের পদক্ষেপ, আন্দোলনকারীদের দাবি এবং আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির ওপর।
আরও পড়ুন:







