জাপানের সাবেক প্রধানমন্ত্রী ইয়াসুও ফুকুদা মারা গেছেন। মৃত্যুকালে তাঁর বয়স হয়েছিল ৯০ বছর। দেশটির ক্ষমতাসীন লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টি (এলডিপি) সোমবার তাঁর মৃত্যুর খবর নিশ্চিত করেছে। জাপানের সংবাদমাধ্যমের বরাতে জানা গেছে, গত ২২ অক্টোবর টোকিওর একটি হাসপাতালে শেষ নিশ্বাস ত্যাগ করেন তিনি। সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে তাঁর মৃত্যুর কারণ হিসেবে হৃদ্যন্ত্রের ক্রিয়া বন্ধ হয়ে যাওয়ার কথা বলা হয়েছে। তবে দলটির প্রাথমিক ঘোষণায় মৃত্যুর বিস্তারিত কারণ জানানো হয়নি।
ইয়াসুও ফুকুদা ২০০৭ সালের সেপ্টেম্বরে জাপানের প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব গ্রহণ করেন। তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শিনজো আবে পদত্যাগ করার পর তিনি সরকারপ্রধান হন। তবে পার্লামেন্টে রাজনৈতিক বিভাজন, আইন প্রণয়নে অচলাবস্থা এবং বিরোধী দলগুলোর সঙ্গে মতবিরোধের কারণে তাঁর সরকার নানা চ্যালেঞ্জের মুখে পড়ে।
দায়িত্ব গ্রহণের প্রায় এক বছরের মাথায়, ২০০৮ সালের সেপ্টেম্বরে প্রধানমন্ত্রীর পদ থেকে সরে দাঁড়ান ফুকুদা। তাঁর পদত্যাগের মধ্য দিয়ে জাপানের রাজনীতিতে স্বল্প সময়ের ব্যবধানে সরকারপ্রধান পরিবর্তনের ধারাবাহিকতা আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে।
১৯৩৬ সালের ১৬ জুলাই জাপানের গুনমা প্রিফেকচারের তাকাসাকি শহরে জন্মগ্রহণ করেন ইয়াসুও ফুকুদা। তিনি ছিলেন দেশটির সাবেক প্রধানমন্ত্রী তাকেও ফুকুদার জ্যেষ্ঠ পুত্র। বাবা ও ছেলে—দুজনেরই জাপানের প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব পালনের ঘটনা দেশটির রাজনৈতিক ইতিহাসে বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য।
টোকিওর ওয়াসেদা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অর্থনীতিতে পড়াশোনা শেষ করার পর তিনি প্রায় ১৭ বছর একটি তেল কোম্পানিতে কাজ করেন। পরে রাজনীতিতে প্রবেশের আগে বাবার রাজনৈতিক সচিব হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন।
১৯৯০ সালে প্রথমবারের মতো জাপানের পার্লামেন্টের নিম্নকক্ষে নির্বাচিত হন তিনি। পরবর্তী সময়ে প্রশাসনিক ও রাজনৈতিক অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে দেশটির গুরুত্বপূর্ণ নেতৃত্বের পর্যায়ে পৌঁছান।
প্রধানমন্ত্রী হওয়ার আগে ফুকুদা জাপানের চিফ ক্যাবিনেট সেক্রেটারি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। ২০০০ থেকে ২০০৪ সাল পর্যন্ত ইয়োশিরো মোরি ও জুনিচিরো কোইজুমির সরকারের সময় তিনি এ পদে ছিলেন।
এই দায়িত্বে সরকারের মুখপাত্র হিসেবে কাজ করার পাশাপাশি প্রশাসনিক সমন্বয় ও নীতিনির্ধারণী কর্মকাণ্ডেও ভূমিকা রাখেন তিনি। দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে পররাষ্ট্রনীতি ও এশীয় দেশগুলোর সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়নে তাঁর আগ্রহ বিশেষভাবে পরিচিত ছিল।
ইয়াসুও ফুকুদার রাজনৈতিক জীবনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দিক ছিল জাপান ও চীনের সম্পর্ক উন্নয়নের প্রচেষ্টা। তাঁর প্রধানমন্ত্রীত্বের সময় চীনের তৎকালীন প্রেসিডেন্ট হু চিনতাওয়ের সঙ্গে জাপানের সম্পর্ক জোরদারে উদ্যোগ নেওয়া হয়।
২০০৮ সালে হু চিনতাও জাপান সফর করেন। দুই দেশের মধ্যে কৌশলগত পারস্পরিক সহযোগিতা ও সম্পর্ক উন্নয়নের বিষয়ে যৌথ বিবৃতিও প্রকাশিত হয়।
প্রধানমন্ত্রীর পদ ছাড়ার পরও চীনের সঙ্গে জাপানের যোগাযোগ ও সহযোগিতা বাড়াতে কাজ চালিয়ে যান ফুকুদা। ২০১৪ সালে চীন সফরে প্রেসিডেন্ট শি চিনপিংয়ের সঙ্গে তাঁর বৈঠক দুই দেশের মধ্যে কূটনৈতিক যোগাযোগ পুনরুজ্জীবিত করার প্রচেষ্টায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
২০১২ সালে সক্রিয় রাজনীতি থেকে অবসর নেওয়ার পরও আঞ্চলিক কূটনীতি ও আন্তর্জাতিক যোগাযোগের ক্ষেত্রে যুক্ত ছিলেন ফুকুদা। বিশেষ করে জাপান, চীন এবং অন্যান্য এশীয় দেশের মধ্যে সংলাপ বজায় রাখার পক্ষে কথা বলতেন তিনি।
তাঁর মতে, নিয়মিত আলোচনা ও যোগাযোগ বজায় থাকলে ভুল বোঝাবুঝির ঝুঁকি কমানো সম্ভব। আঞ্চলিক বিরোধ ও কূটনৈতিক উত্তেজনার সময়ও আলোচনার মাধ্যমে সমাধানের পথ খোঁজার ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন তিনি।
ইয়াসুও ফুকুদার প্রধানমন্ত্রীত্ব দীর্ঘস্থায়ী না হলেও জাপানের প্রশাসন ও কূটনীতিতে তাঁর ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ ছিল। বিশেষ করে চীনের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়নের ক্ষেত্রে তাঁর উদ্যোগ পরবর্তী সময়েও আলোচনায় এসেছে।
তাঁর মৃত্যুর মধ্য দিয়ে জাপান এমন একজন সাবেক সরকারপ্রধানকে হারাল, যিনি রাজনৈতিক জীবনের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক সম্পর্ক উন্নয়নেও দীর্ঘদিন কাজ করেছেন।
আরও পড়ুন:







