পৃথিবীর অন্যতম বৃহৎ ও জীববৈচিত্র্যে সমৃদ্ধ বনাঞ্চল আমাজন ক্রমেই হারাচ্ছে তার আদি রূপ। নতুন এক গবেষণায় দেখা গেছে, আমাজন অববাহিকার মূল বনভূমির প্রায় ২৪ কোটি একর ইতিমধ্যে হারিয়ে গেছে। বন উজাড়, দাবানল এবং অন্যান্য প্রাকৃতিক কারণে সৃষ্ট বনভূমির ক্ষয় এই পরিস্থিতিকে আরও উদ্বেগজনক করে তুলেছে। বিশেষজ্ঞদের আশঙ্কা, এভাবে বন ধ্বংস অব্যাহত থাকলে আমাজনের বৃষ্টিপাতের স্বাভাবিক চক্র ব্যাহত হতে পারে, যার প্রভাব পড়বে পুরো অঞ্চলের পরিবেশ ও জলবায়ুতে।
যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক সংস্থা অ্যামাজন কনজারভেশনের (Amazon Conservation) অধীন মনিটরিং অব দ্য আন্দিজ অ্যামাজন প্রোগ্রাম (MAAP) ২০২৬ সালের ২০ অক্টোবর প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে এসব তথ্য জানিয়েছে। ‘এমএএপি #২৫০: অ্যামাজন টিপিং পয়েন্ট—হোয়্যার আর উই? (২০২৬ আপডেট)’ শীর্ষক প্রতিবেদনে ২০২৫ সালের শেষ পর্যন্ত আমাজনের বনভূমি হারানোর হিসাব তুলে ধরা হয়েছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, আমাজনের আদি প্রাথমিক বনভূমির প্রায় ৯ কোটি ৭১ লাখ হেক্টর বা ২৪ কোটি একর হারিয়ে গেছে। এটি বনাঞ্চলটির মূল আয়তনের প্রায় ১৫ শতাংশ। ২০২২ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত মাত্র চার বছরে অতিরিক্ত ১ কোটি ৩০ লাখ ৪০ হাজার হেক্টর বনভূমি হারিয়েছে, যা প্রায় ৩ কোটি ২২ লাখ একরের সমান।
গবেষণায় দেখা গেছে, আমাজনের বনভূমি হারানোর পেছনে প্রধান কারণগুলোর মধ্যে রয়েছে বন উজাড় ও দাবানল। ২০২৫ সালের শেষ পর্যন্ত হিসাব করা মোট বনক্ষয়ের মধ্যে প্রায় ৮ কোটি ৪২ লাখ ৮০ হাজার হেক্টর বনভূমি বন উজাড়সহ আগুন ছাড়া অন্যান্য কারণে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। অন্যদিকে, প্রায় ১ কোটি ২৭ লাখ ৮০ হাজার হেক্টর বনভূমি হারানোর সঙ্গে আগুনের সরাসরি সম্পর্ক রয়েছে।
২০২২ থেকে ২০২৫ সালের মধ্যে নতুন করে যে বনভূমি হারিয়েছে, তার মধ্যে প্রায় ৫৪ লাখ ৩০ হাজার হেক্টর আগুনের কারণে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ২০২৪ সালে আমাজনে ভয়াবহ দাবানল পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তোলে। এর পেছনে ২০২৩ সালের শক্তিশালী এল নিনোর পর তৈরি হওয়া তীব্র খরা ও শুষ্ক আবহাওয়ার ভূমিকা ছিল।
গবেষকদের বিশ্লেষণে দেখা গেছে, বনভূমি হারানোর সবচেয়ে বড় অংশ ঘটেছে ব্রাজিলে। মোট ক্ষতির প্রায় ৭৯ দশমিক ৪ শতাংশ ব্রাজিলের আমাজন অঞ্চলে। এরপর রয়েছে বলিভিয়া, পেরু ও কলম্বিয়া।
দেশভিত্তিক হিসাবে বলিভিয়ায় মোট ক্ষতির ৬ দশমিক ২ শতাংশ, পেরুতে ৫ দশমিক ৮ শতাংশ এবং কলম্বিয়ায় ৪ দশমিক ৫ শতাংশ বনভূমি হারিয়েছে। আমাজনের বিস্তৃত এই বনাঞ্চল দক্ষিণ আমেরিকার নয়টি দেশের ভূখণ্ডজুড়ে বিস্তৃত হওয়ায় এর ক্ষতির প্রভাবও একাধিক দেশে ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।
আমাজনের বন শুধু অসংখ্য প্রাণী ও উদ্ভিদের আবাসস্থল নয়, এটি দক্ষিণ আমেরিকার বৃষ্টিপাতের স্বাভাবিক ব্যবস্থারও গুরুত্বপূর্ণ অংশ। গাছ মাটি থেকে পানি শোষণ করে পাতার মাধ্যমে জলীয় বাষ্প বাতাসে ছেড়ে দেয়। বায়ুমণ্ডলে এই আর্দ্রতা বায়ুপ্রবাহের সঙ্গে এক অঞ্চল থেকে অন্য অঞ্চলে যায় এবং বৃষ্টিপাত সৃষ্টিতে ভূমিকা রাখে।
বিজ্ঞানীরা এই আর্দ্রতা পরিবহনের ব্যবস্থাকে অনেক সময় ‘ফ্লাইং রিভারস’ বা ‘আকাশের নদী’ বলে থাকেন। আমাজনের বিস্তীর্ণ বনভূমি এই ব্যবস্থাকে সচল রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
কিন্তু ব্যাপক বন উজাড়ের ফলে বাতাসে আর্দ্রতা সরবরাহের প্রক্রিয়া দুর্বল হয়ে পড়তে পারে। এর ফলে আমাজনের পশ্চিমাঞ্চল, বিশেষ করে পেরু ও বলিভিয়ার কিছু এলাকায় বৃষ্টিপাতের স্বাভাবিক ধারা বিঘ্নিত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
MAAP-এর সর্বশেষ বিশ্লেষণে দেখা গেছে, শুষ্ক মৌসুম ও মৌসুম পরিবর্তনের সময় সক্রিয় আর্দ্রতা পরিবহনপথগুলো তুলনামূলক বেশি ক্ষতিগ্রস্ত। এসব পথে বনভূমি হারানোর হার যথাক্রমে ৮ দশমিক ৬ ও ৯ দশমিক ১ শতাংশ। বিপরীতে, বর্ষাকালে সক্রিয় আর্দ্রতা পরিবহনপথে বনক্ষয়ের হার প্রায় ৩ দশমিক ২ শতাংশ।
গবেষকদের মতে, এই পার্থক্য গুরুত্বপূর্ণ। কারণ শুষ্ক মৌসুমে আমাজনের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের বন ও বাস্তুতন্ত্র টিকে থাকার জন্য বন থেকে পুনরায় বায়ুমণ্ডলে ফিরে যাওয়া আর্দ্রতার ওপর উল্লেখযোগ্যভাবে নির্ভরশীল।
আমাজনের ভবিষ্যৎ নিয়ে বিজ্ঞানীদের বড় উদ্বেগ হলো সম্ভাব্য ‘টিপিং পয়েন্ট’। এই ধারণা অনুযায়ী, বন উজাড় ও জলবায়ু পরিবর্তনের সম্মিলিত প্রভাবে আমাজনের কিছু অংশ ধীরে ধীরে আর্দ্র গ্রীষ্মমণ্ডলীয় বন থেকে অপেক্ষাকৃত শুষ্ক, সাভানাসদৃশ বাস্তুতন্ত্রে রূপ নিতে পারে।
বৈজ্ঞানিক গবেষণায় কিছু পরিস্থিতিতে মূল বনভূমির প্রায় ২৫ শতাংশ হারানোকে সম্ভাব্য ঝুঁকির একটি সীমা হিসেবে বিবেচনা করা হয়। তবে এটি কোনো নিশ্চিত বা সর্বজনীন সীমারেখা নয়। পরিবর্তনের গতি ও তীব্রতা অঞ্চলভেদে ভিন্ন হতে পারে এবং জলবায়ু পরিবর্তন, বৃষ্টিপাতের ধরন ও অন্যান্য পরিবেশগত বিষয়ও এতে ভূমিকা রাখে।
সর্বশেষ গবেষণায় আমাজনের আদি বনভূমির ১৫ শতাংশ হারানোর হিসাব পাওয়া গেছে। অর্থাৎ পুরো আমাজন অববাহিকার জন্য ব্যবহৃত এই সামগ্রিক হিসাব সম্ভাব্য ২৫ শতাংশ সীমার নিচে থাকলেও, এর অর্থ এই নয় যে সব অঞ্চল সমানভাবে নিরাপদ। কিছু এলাকায় বন উজাড় ও আর্দ্রতা পরিবহনের পথের ক্ষতি তুলনামূলক বেশি।
গবেষকদের মতে, আমাজনের ভবিষ্যৎ ঝুঁকি বুঝতে শুধু মোট বনক্ষয়ের পরিমাণ গণনা করলেই হবে না; কোথায় বন হারাচ্ছে এবং সেই বন আঞ্চলিক বৃষ্টিপাতের ব্যবস্থার সঙ্গে কীভাবে যুক্ত, সেটিও বিবেচনায় নিতে হবে।
বনভূমি কমে যাওয়ার সঙ্গে তাপমাত্রা বৃদ্ধি ও দীর্ঘস্থায়ী শুষ্ক আবহাওয়ার সম্পর্ক আমাজনের জন্য নতুন উদ্বেগ তৈরি করছে। গাছপালা কমে গেলে মাটির আর্দ্রতা ও স্থানীয় জলচক্রের ওপর প্রভাব পড়তে পারে। আবার শুষ্ক পরিস্থিতিতে আগুন ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকিও বাড়ে।
এভাবে একটি চক্র তৈরি হতে পারে—বন উজাড়ের ফলে পরিবেশ আরও শুষ্ক হয়ে ওঠে, শুষ্কতা দাবানলের ঝুঁকি বাড়ায়, আর দাবানলে ক্ষতিগ্রস্ত বন আবার আগের মতো আর্দ্রতা ধরে রাখতে পারে না। তবে এই প্রক্রিয়ার প্রভাব সব অঞ্চলে একই রকম নয় এবং দীর্ঘমেয়াদি পরিবর্তনের মাত্রা নির্ভর করে বিভিন্ন জলবায়ুগত ও পরিবেশগত উপাদানের ওপর।
২০২৬ সালের বাকি সময় ও ২০২৭ সালে এল নিনোর প্রভাব জোরালো হলে আমাজনের কিছু অঞ্চলে তাপমাত্রা, খরা ও দাবানলের ঝুঁকি বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা রয়েছে। তবে এর প্রকৃত প্রভাব নির্ভর করবে আবহাওয়ার বাস্তব পরিস্থিতি এবং বন সংরক্ষণে নেওয়া পদক্ষেপের ওপর।
আমাজনের বনক্ষয়ের চিত্র উদ্বেগজনক হলেও পরিস্থিতি পরিবর্তনের সুযোগ রয়েছে। বন উজাড় নিয়ন্ত্রণ, অবৈধভাবে গাছ কাটা বন্ধ, দাবানল প্রতিরোধ, ক্ষতিগ্রস্ত বন পুনরুদ্ধার এবং স্থানীয় জনগোষ্ঠীর অংশগ্রহণে সংরক্ষণ কার্যক্রম জোরদার করা জরুরি।
এ ক্ষেত্রে শুধু একটি দেশের উদ্যোগ যথেষ্ট নয়। কারণ আমাজনের বন, নদী ও বায়ুমণ্ডলীয় আর্দ্রতার প্রবাহ জাতীয় সীমানা মেনে চলে না। একটি অঞ্চলে বন ধ্বংস হলে তার প্রভাব অন্য দেশের বৃষ্টিপাত ও বাস্তুতন্ত্রেও পড়তে পারে।
গবেষকদের মতে, আমাজনকে বিচ্ছিন্ন কিছু বনাঞ্চলের সমষ্টি হিসেবে না দেখে একটি আন্তসংযুক্ত পরিবেশব্যবস্থা হিসেবে বিবেচনা করতে হবে। বন সংরক্ষণের পাশাপাশি আর্দ্রতা পরিবহনের গুরুত্বপূর্ণ পথগুলো রক্ষা করা এবং ক্ষতিগ্রস্ত অঞ্চলের ওপর নিয়মিত নজরদারি বাড়ানো প্রয়োজন।
আরও পড়ুন:







