ভারতের উত্তর প্রদেশে গরু পাচারের অভিযোগে অভিযুক্ত ব্যক্তিদের পায়ে গুলি করে আহত করার ধারাবাহিক ঘটনায় পুলিশের ভূমিকা নিয়ে নতুন করে বিতর্ক তৈরি হয়েছে। ‘অপারেশন ল্যাংড়া’ নামে পরিচিত এ ধরনের পুলিশি অভিযানে মুসলিমদের অসমভাবে লক্ষ্যবস্তু করা হচ্ছে বলে অভিযোগ তুলেছেন মানবাধিকারকর্মী, আইনজীবী ও বিভিন্ন অধিকার সংগঠনের প্রতিনিধিরা।
যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক সংবাদমাধ্যম অ্যাসোসিয়েটেড প্রেসের (এপি) এক অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২০ সাল থেকে উত্তর প্রদেশে গরু পাচারের অভিযোগে অভিযুক্ত ব্যক্তিদের গুলি করে আহত করার প্রায় ৬৫০টি ঘটনার তথ্য সংগ্রহ করেছে সেন্টার ফর দ্য স্টাডি অব অর্গানাইজড হেট (সিএসওএইচ)। এসব ঘটনার মধ্যে যাঁদের পরিচয় শনাক্ত করা গেছে, তাঁদের বড় অংশ মুসলিম।
তবে উত্তর প্রদেশ পুলিশ দাবি করেছে, অভিযুক্ত ব্যক্তিরা পালানোর চেষ্টা করলে কিংবা পুলিশের ওপর হামলা চালালে আত্মরক্ষার্থে গুলি চালানো হয়। পায়ে গুলি করার কোনো নির্দেশনা নেই বলেও জানিয়েছেন রাজ্য পুলিশের এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা।
ভারতের উত্তর প্রদেশে অপরাধ দমনে পুলিশের অভিযানের সঙ্গে ‘অপারেশন ল্যাংড়া’ বা ‘অপারেশন লেম’ নামটি যুক্ত হয়েছে। ‘ল্যাংড়া’ শব্দের অর্থ খোঁড়া। এ নামে পরিচিত অভিযানের ক্ষেত্রে পুলিশের গুলিতে সন্দেহভাজন ব্যক্তিদের পায়ে, বিশেষ করে হাঁটুর নিচে আঘাত পাওয়ার ঘটনা বারবার সামনে এসেছে।
পুলিশের বক্তব্য অনুযায়ী, এসব ঘটনায় অভিযুক্ত ব্যক্তিরা পালানোর চেষ্টা করেন কিংবা পুলিশের দিকে গুলি ছোড়েন। জবাবে পুলিশ গুলি চালিয়ে তাঁদের আহত করে গ্রেপ্তার করে।
তবে মানবাধিকারকর্মী ও আইন বিশেষজ্ঞদের একাংশের প্রশ্ন, একই ধরনের ঘটনায় বারবার পায়ে গুলি লাগার বিষয়টি নিছক আত্মরক্ষার ফল কি না, নাকি সন্দেহভাজনদের শাস্তি দেওয়ার উদ্দেশ্যে অতিরিক্ত বলপ্রয়োগ করা হচ্ছে।
এ ধরনের অভিযোগের সত্যতা নির্ধারণে প্রতিটি ঘটনার পৃথক তদন্ত, ফরেনসিক প্রমাণ এবং পুলিশের ব্যবহৃত বলপ্রয়োগের পরিস্থিতি যাচাই করা জরুরি।
এপির ২২ অক্টোবর ২০২৬-এ প্রকাশিত অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সিএসওএইচ ২০২০ সাল থেকে উত্তর প্রদেশে গরু পাচারের অভিযোগে অভিযুক্ত ব্যক্তিদের গুলি করে আহত করার প্রায় ৬৫০টি ঘটনার নথি সংগ্রহ করেছে। এপি নিজেও এর মধ্যে ২০০টির বেশি ঘটনা পর্যালোচনা করেছে।
প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, পরিচয়সংক্রান্ত তথ্য পাওয়া গেছে এমন ৬২৭ জন আহত সন্দেহভাজনের মধ্যে প্রায় ৯৩ শতাংশ মুসলিম।
এই পরিসংখ্যান নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে, কারণ উত্তর প্রদেশের মোট জনসংখ্যায় মুসলিমদের অনুপাতের তুলনায় সংশ্লিষ্ট ঘটনাগুলোতে তাঁদের অংশগ্রহণের হার অনেক বেশি। তবে এই তথ্য নির্দিষ্ট অভিযোগে গুলিবিদ্ধ ব্যক্তিদের নিয়ে করা বিশ্লেষণ; রাজ্যের সব ধরনের পুলিশি অভিযানের পরিসংখ্যান হিসেবে একে বিবেচনা করা যাবে না।
গবেষণা সংস্থাটির মতে, পুলিশের প্রকাশ করা ঘটনার ওপর ভিত্তি করে তথ্য সংগ্রহ করা হয়েছে। ফলে প্রকৃত ঘটনার সংখ্যা আরও বেশি হতে পারে।
প্রতিবেদনে ফরেনসিক চিকিৎসাবিশেষজ্ঞদের মতামতও তুলে ধরা হয়েছে। তাঁদের একাংশের মতে, বিভিন্ন ঘটনায় হাঁটুর নিচে গুলিবিদ্ধ হওয়ার একই ধরনের প্রবণতা প্রশ্ন তৈরি করে।
উত্তর প্রদেশের আলিগড় মুসলিম বিশ্ববিদ্যালয়ের জওহরলাল নেহরু মেডিকেল কলেজের ফরেনসিক মেডিসিনের অধ্যাপক মোহাম্মদ কলিম খান এপিকে বলেন, কোনো ব্যক্তি পালাচ্ছেন বা সংঘর্ষে জড়িত—এমন পরিস্থিতিতে তাঁর পায়ের পেশির মধ্য দিয়ে গুলি চলে যাওয়া, অথচ হাড়ে আঘাত না লাগার বিষয়টি নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে অস্বাভাবিক হতে পারে।
এ ধরনের পর্যবেক্ষণ থেকে সব ঘটনার বিষয়ে একই সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যায় না। তবে গুলি চালানোর দূরত্ব, আঘাতের ধরন, ঘটনাস্থলের আলামত ও পুলিশের বর্ণনা মিলিয়ে স্বাধীন তদন্তের প্রয়োজনীয়তা নিয়ে বিশেষজ্ঞরা প্রশ্ন তুলেছেন।
উত্তর প্রদেশ পুলিশের জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা অমিতাভ যশ এপিকে জানিয়েছেন, পুলিশ সদস্যদের কেবল আত্মরক্ষার প্রয়োজনে গুলি চালানোর নির্দেশনা রয়েছে। সন্দেহভাজনদের পায়ে গুলি করার কোনো সরকারি নির্দেশ নেই বলেও তিনি দাবি করেন।
তিনি আরও বলেন, পুলিশের প্রতিটি পদক্ষেপ তদন্ত ও জবাবদিহির আওতায় থাকা উচিত। পায়ে গুলিবিদ্ধ হওয়ার একই ধরনের ঘটনার বিষয়ে যথাযথ অভিযোগ পাওয়া গেলে তা তদন্ত করা যেতে পারে।
পুলিশের বক্তব্য, রাজ্যে অপরাধ দমনে কঠোর অবস্থান নেওয়ার ফলে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতি হয়েছে। তবে সমালোচকদের মতে, অপরাধের অভিযোগ থাকলেও কাউকে বিচারবহির্ভূতভাবে শাস্তি দেওয়ার সুযোগ নেই।
এপি রাজ্য পুলিশের কাছ থেকে পাওয়া তথ্যের বরাতে জানিয়েছে, ২০১৭ সালের মার্চে মুখ্যমন্ত্রী যোগী আদিত্যনাথ দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকে ২০২৬ সালের ১৩ অক্টোবর পর্যন্ত উত্তর প্রদেশে পুলিশি এনকাউন্টারে ৩১৬ জন সন্দেহভাজন নিহত হয়েছেন। তাঁদের মধ্যে ১১০ জন মুসলিম।
একই সময়ে পুলিশের অভিযানে ১২ হাজার ৮৯০ জন সন্দেহভাজন আহত হয়েছেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। তবে আহত ব্যক্তিদের ধর্মভিত্তিক পূর্ণাঙ্গ পরিসংখ্যান পাওয়া যায়নি।
মানবাধিকারকর্মীদের অভিযোগ, অপরাধ দমনের নামে অতিরিক্ত বলপ্রয়োগ এবং পর্যাপ্ত জবাবদিহির অভাব আইনের শাসনকে দুর্বল করতে পারে। তাঁদের মতে, সন্দেহভাজন ব্যক্তির বিরুদ্ধে অভিযোগ থাকলে তদন্ত, গ্রেপ্তার, বিচার এবং আদালতের রায়ের মাধ্যমেই ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা উচিত।
ভারতে গরু জবাই ও গবাদিপশু পরিবহন নিয়ে বিভিন্ন রাজ্যে পৃথক আইন রয়েছে। এসব আইনকে কেন্দ্র করে গরু পাচারের অভিযোগে মুসলিমদের বিরুদ্ধে হামলা, হয়রানি ও পুলিশের পদক্ষেপ নিয়ে বিভিন্ন সময়ে বিতর্ক তৈরি হয়েছে।
উত্তর প্রদেশের সাম্প্রতিক ঘটনাগুলো আবারও প্রশ্ন তুলেছে—অপরাধ দমনের নামে পুলিশের বলপ্রয়োগ কতটা প্রয়োজনীয়, তা কীভাবে যাচাই করা হচ্ছে এবং অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ার আগে অভিযুক্ত ব্যক্তিদের অধিকার কীভাবে সুরক্ষিত রাখা হচ্ছে।
‘অপারেশন ল্যাংড়া’ নিয়ে বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে দুটি বিষয়: পুলিশের দাবি অনুযায়ী আত্মরক্ষার প্রয়োজনীয়তা এবং একই ধরনের গুলিবিদ্ধ হওয়ার ঘটনায় সম্ভাব্য বৈষম্য ও জবাবদিহির প্রশ্ন।
আরও পড়ুন:







