News Ticker
221.png

চীনের শেয়ারবাজারে ৩.৫ ট্রিলিয়ন ডলারের ধস

অনলাইন ডেস্ক

প্রকাশিত: ২৭ অক্টোবর, ২০২৬ ২৩:২৬

শেয়ার

শেয়ার

চীনের শেয়ারবাজারে ৩.৫ ট্রিলিয়ন ডলারের ধস
ছবি: সংগৃহীত

চীনের শেয়ারবাজারে বড় ধরনের দরপতনে বিনিয়োগকারীদের সম্পদের বাজারমূল্য কমেছে প্রায় ৩ দশমিক ৫ ট্রিলিয়ন মার্কিন ডলার। গত মে মাসে বাজারের সর্বোচ্চ অবস্থান থেকে এই পতন শুরু হয়। সাম্প্রতিক সপ্তাহে বিক্রির চাপ আরও বেড়ে যাওয়ায় বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম শেয়ারবাজারে বিনিয়োগকারীদের মধ্যে উদ্বেগ ছড়িয়ে পড়েছে।

ব্লুমবার্গের সংকলিত তথ্যের বরাতে প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, চীনের প্রধান শেয়ারবাজার সূচক সিএসআই ৩০০ (CSI 300) জুনের সর্বোচ্চ অবস্থান থেকে প্রায় ২০ শতাংশ নেমে এসেছে। সাধারণভাবে কোনো সূচক সর্বোচ্চ অবস্থান থেকে ২০ শতাংশ বা তার বেশি কমলে তাকে ‘বিয়ার মার্কেট’ বা নিম্নমুখী বাজার হিসেবে বিবেচনা করা হয়।

বাজারের এই পতনের পেছনে রয়েছে ভোক্তা ব্যয়ের দুর্বলতা, বিভিন্ন শিল্পে তীব্র প্রতিযোগিতা, কোম্পানির মুনাফা কমে যাওয়ার আশঙ্কা এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) খাতের শেয়ার নিয়ে বিনিয়োগকারীদের নতুন করে সংশয়। খবর ব্লুমবার্গ ও রয়টার্সের।

বিশ্লেষকদের মতে, চীনের অর্থনীতিতে উৎপাদন ও রপ্তানি কার্যক্রম চলমান থাকলেও অভ্যন্তরীণ ভোক্তা চাহিদা প্রত্যাশা অনুযায়ী বাড়ছে না। ফলে অনেক কোম্পানি পণ্য বিক্রি বাড়াতে দাম কমাতে বাধ্য হচ্ছে। এতে বিক্রির পরিমাণ বাড়লেও মুনাফার মার্জিন সংকুচিত হচ্ছে।

ব্যাংক, বৈদ্যুতিক গাড়ি নির্মাতা, ব্যাটারি উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান এবং প্রযুক্তি কোম্পানিগুলোও এই চাপের মুখে রয়েছে। একই সঙ্গে বাজারে নতুন প্রণোদনা আসার সম্ভাবনা নিয়ে অনিশ্চয়তা বিনিয়োগকারীদের আস্থায় প্রভাব ফেলছে।

অর্থনীতির প্রবৃদ্ধি বজায় থাকলেও তা কোম্পানিগুলোর মুনাফা ও শেয়ারদরে প্রত্যাশিত ইতিবাচক প্রভাব ফেলছে না। এ কারণে বিনিয়োগকারীদের একটি অংশ ঝুঁকিপূর্ণ সম্পদ থেকে সরে আসছেন।

চীনের প্রযুক্তি খাতের শেয়ারদর কমে যাওয়াও সামগ্রিক বাজারের পতনে বড় ভূমিকা রেখেছে। বিশেষ করে এআই ও সেমিকন্ডাক্টর খাতে দ্রুত দরবৃদ্ধির পর কোম্পানিগুলোর প্রকৃত আয় ও ভবিষ্যৎ ব্যবসায়িক সম্ভাবনা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।

রয়টার্সের ২৬ অক্টোবর প্রকাশিত এক বিশ্লেষণ অনুযায়ী, চীনের প্রযুক্তি ও সেমিকন্ডাক্টর কোম্পানিগুলোর গুরুত্বপূর্ণ সূচক স্টার৫০ (STAR50) চার মাসেরও কম সময়ে প্রায় ৪০ শতাংশ কমেছে। এতে ওই খাতের বাজারমূল্য থেকে প্রায় ৪৮০ বিলিয়ন ডলার কমে গেছে।

এআই প্রযুক্তিতে বিনিয়োগের সম্ভাবনা নিয়ে অতিরিক্ত আশাবাদ, কোম্পানিগুলোর উচ্চ মূল্যায়ন এবং ভবিষ্যতে এআই অবকাঠামোর চাহিদা নিয়ে সংশয় এই পতনের অন্যতম কারণ।

এ ছাড়া চীনা প্রযুক্তিপণ্য ও ডেটা সেন্টারের সরঞ্জাম রপ্তানিতে যুক্তরাষ্ট্রসহ অন্যান্য দেশের সম্ভাব্য বিধিনিষেধ নিয়েও বিনিয়োগকারীদের উদ্বেগ রয়েছে।

শেয়ারবাজারে পতনের আরেকটি বড় কারণ করপোরেট মুনাফা নিয়ে হতাশা। ব্লুমবার্গের তথ্য অনুযায়ী, এমএসসিআই চায়না সূচকের অন্তর্ভুক্ত কোম্পানিগুলোর ২০২৬ সালের মুনাফার সম্মিলিত পূর্বাভাস মার্চের শেষ দিকের তুলনায় ৪ শতাংশের বেশি কমেছে।

অন্যদিকে, হংকংয়ের হ্যাং সেং টেক সূচকের অন্তর্ভুক্ত প্রযুক্তি কোম্পানিগুলোর মুনাফার পূর্বাভাসও উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে।

চীনের ব্যাটারি নির্মাতা সিএটিএলসহ কয়েকটি বড় প্রতিষ্ঠানের আর্থিক ফলাফল প্রত্যাশা পূরণ করতে না পারায় বিনিয়োগকারীদের উদ্বেগ বেড়েছে। অনেক প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে দুর্বল চাহিদা, উৎপাদন ব্যয় এবং মূল্য প্রতিযোগিতা মুনাফার ওপর চাপ তৈরি করছে।

শেয়ারবাজারে অস্থিরতা কমাতে চীনের কর্তৃপক্ষ বিভিন্ন সময়ে রাষ্ট্রীয় বিনিয়োগ তহবিলের মাধ্যমে বাজারে সহায়তা দিয়েছে। তবে বিনিয়োগকারীদের একটি অংশ মনে করছেন, সাময়িক সহায়তা দিয়ে দীর্ঘমেয়াদি সমস্যার সমাধান করা কঠিন।

অর্থনীতিতে ভোক্তা ব্যয় বাড়ানো, কোম্পানিগুলোর মুনাফা স্থিতিশীল করা এবং বিনিয়োগকারীদের আস্থা ফিরিয়ে আনার জন্য আরও কার্যকর পদক্ষেপ প্রয়োজন বলে মনে করছেন কয়েকজন বাজার বিশ্লেষক।

তবে সব বিনিয়োগকারী যে চীনের শেয়ারবাজারের ভবিষ্যৎ নিয়ে নেতিবাচক, তা নয়। কিছু বিনিয়োগ প্রতিষ্ঠানের মতে, সাম্প্রতিক পতনের ফলে নির্দিষ্ট কিছু কোম্পানির শেয়ার তুলনামূলক আকর্ষণীয় মূল্যায়নে কেনার সুযোগ তৈরি হতে পারে। কিন্তু বাজারের স্থিতিশীলতা ফিরবে কি না, তা নির্ভর করবে কোম্পানির আয়, অর্থনৈতিক চাহিদা এবং সরকারের নীতিগত পদক্ষেপের ওপর।

চীন বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ অর্থনীতি এবং বৈশ্বিক উৎপাদন ও প্রযুক্তি সরবরাহব্যবস্থার গুরুত্বপূর্ণ অংশ। দেশটির শেয়ারবাজারে দীর্ঘস্থায়ী পতন হলে আন্তর্জাতিক বিনিয়োগকারীদের ঝুঁকি নেওয়ার প্রবণতা, প্রযুক্তি খাতে অর্থায়ন এবং এশিয়ার অন্যান্য বাজারেও প্রভাব পড়তে পারে।

বিশেষ করে এআই ও সেমিকন্ডাক্টর খাতে বিনিয়োগ কমে গেলে নতুন প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানের শেয়ারবাজারে প্রবেশ এবং মূলধন সংগ্রহের প্রক্রিয়া ধীর হতে পারে।

তবে চীনের শেয়ারবাজারের বর্তমান পতন থেকে বিশ্ব অর্থনীতিতে কতটা প্রভাব পড়বে, তা এখনই নিশ্চিত করে বলা যাচ্ছে না।

ChannelNRB Footer