ভারতের পূর্ব উপকূলে আছড়ে পড়েছে শক্তিশালী ঘূর্ণিঝড় অর্ণব। প্রবল ঝোড়ো হাওয়া ও মুষলধারে বৃষ্টিতে বিপর্যস্ত অন্ধ্রপ্রদেশ ও ওডিশার উপকূলীয় এলাকা। পরিস্থিতি মোকাবিলায় আগাম সতর্কতামূলক ব্যবস্থা হিসেবে দুই রাজ্যে ১ লাখ ৮০ হাজারেরও বেশি মানুষকে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। উপড়ে পড়েছে গাছপালা ও বিদ্যুতের খুঁটি, ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে ঘরবাড়ি এবং ব্যাহত হয়েছে বিদ্যুৎ ও পরিবহন ব্যবস্থা।
ভারতের আবহাওয়া দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, বুধবার (২৮ অক্টোবর) ভোরে অন্ধ্রপ্রদেশের উপকূল দিয়ে স্থলভাগে প্রবেশ করে ঘূর্ণিঝড় অর্ণব। স্থলভাগে আছড়ে পড়ার সময় ঝড়টি ‘অতি প্রবল ঘূর্ণিঝড়’ হিসেবে শ্রেণিবদ্ধ ছিল। ঝড়ের প্রভাবে উপকূলীয় জেলাগুলোতে ব্যাপক বৃষ্টিপাত ও শক্তিশালী বাতাস বয়ে যায়। স্থলভাগে প্রবেশের পর ঘূর্ণিঝড়টি ধীরে ধীরে দুর্বল হতে শুরু করলেও ভারী বৃষ্টি ও দমকা হাওয়ার আশঙ্কা অব্যাহত রয়েছে।
ঘূর্ণিঝড়ের সম্ভাব্য ক্ষয়ক্ষতি কমাতে আগেই ব্যাপক সরিয়ে নেওয়ার অভিযান শুরু করে প্রশাসন। অন্ধ্রপ্রদেশ ও প্রতিবেশী ওডিশা রাজ্যের ঝুঁকিপূর্ণ উপকূলীয় এলাকা থেকে ১ লাখ ৮০ হাজারেরও বেশি মানুষকে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে।
অন্ধ্রপ্রদেশে বহু আশ্রয়কেন্দ্র খোলা হয়েছে। স্থানীয় প্রশাসন, জাতীয় দুর্যোগ মোকাবিলা বাহিনী (এনডিআরএফ), রাজ্য দুর্যোগ মোকাবিলা বাহিনী (এসডিআরএফ), নৌবাহিনী ও উপকূলরক্ষী বাহিনীকে জরুরি পরিস্থিতি মোকাবিলায় প্রস্তুত রাখা হয়েছে।
উপকূলীয় এলাকার বাসিন্দাদের ঘরের ভেতরে অবস্থান করতে এবং প্রশাসনের নির্দেশনা মেনে চলতে বলা হয়েছে। ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় উদ্ধার ও ত্রাণ কার্যক্রম পরিচালনার জন্যও প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে।
ঘূর্ণিঝড়ের তাণ্ডবে অন্ধ্রপ্রদেশের বিভিন্ন এলাকায় গাছ উপড়ে পড়েছে। কোথাও কোথাও বিদ্যুতের খুঁটি ভেঙে পড়ায় বিদ্যুৎ সরবরাহ ব্যাহত হয়েছে। ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে ঘরবাড়ি, সড়ক ও অন্যান্য অবকাঠামো। কয়েকটি এলাকায় সড়কের ওপর গাছ পড়ে যান চলাচলে বাধা সৃষ্টি হয়েছে।
কাকিনাডাসহ উপকূলীয় অঞ্চলে ঝড় ও বৃষ্টির কারণে স্বাভাবিক জীবনযাত্রা ব্যাহত হয়েছে। ক্ষতিগ্রস্ত এলাকাগুলোতে সড়ক থেকে গাছপালা ও ধ্বংসাবশেষ সরিয়ে যোগাযোগব্যবস্থা স্বাভাবিক করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
ঝড়ের প্রভাবে কৃষি ও উদ্যান ফসলের ক্ষয়ক্ষতির আশঙ্কাও রয়েছে। বিশেষ করে নিচু এলাকা, দুর্বল ঘরবাড়ি এবং উপকূলসংলগ্ন বসতিগুলোকে বেশি ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে।
ভারতের আবহাওয়া দপ্তরের পূর্বাভাস অনুযায়ী, ঘূর্ণিঝড় অর্ণবের স্থলভাগে প্রবেশের সময় বাতাসের স্থায়ী গতিবেগ ছিল ঘণ্টায় প্রায় ১২৫ থেকে ১৩৫ কিলোমিটার। দমকা হাওয়ার গতিবেগ ঘণ্টায় ১৫০ কিলোমিটার পর্যন্ত পৌঁছাতে পারে বলে পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছিল।
এ ছাড়া স্বাভাবিক জোয়ারের উচ্চতার চেয়ে প্রায় ১ থেকে ১ দশমিক ৫ মিটার বেশি উচ্চতার সামুদ্রিক জলোচ্ছ্বাসের আশঙ্কা জানানো হয়েছিল। এর ফলে অন্ধ্রপ্রদেশের নিচু উপকূলীয় এলাকায় পানি ঢুকে পড়ার ঝুঁকি তৈরি হয়।
প্রশাসনের পক্ষ থেকে জেলেদের সমুদ্রে না যাওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। সাগরে থাকা নৌযানগুলোকে নিরাপদে তীরে ফিরে আসার জন্য সতর্ক করা হয়।
ঘূর্ণিঝড়ের প্রভাবে ক্ষতিগ্রস্ত এলাকাগুলোতে উদ্ধারকাজ, বিদ্যুৎ পুনঃস্থাপন এবং জরুরি সহায়তা নিশ্চিত করতে প্রশাসন কাজ করছে। আশ্রয়কেন্দ্রগুলোতে নিরাপদ পানীয় জল, খাবার ও চিকিৎসাসেবা পৌঁছে দেওয়ার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
আবহাওয়া পরিস্থিতি পুরোপুরি স্বাভাবিক না হওয়া পর্যন্ত উপকূলীয় এলাকার বাসিন্দাদের নিরাপদ আশ্রয়ে থাকার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি নদী, খাল ও নিচু এলাকার পানির স্তর পর্যবেক্ষণ এবং সম্ভাব্য বন্যা পরিস্থিতি মোকাবিলায় প্রস্তুতি জোরদার করা হয়েছে।
ঘূর্ণিঝড় অর্ণব স্থলভাগে প্রবেশের পর দুর্বল হতে শুরু করলেও এর প্রভাবে ভারী বৃষ্টি, জলাবদ্ধতা ও অবকাঠামোগত ক্ষয়ক্ষতির ঝুঁকি পুরোপুরি কাটেনি। ফলে আগামী কয়েক ঘণ্টায় আবহাওয়ার পরিবর্তন এবং প্রশাসনের পরবর্তী সতর্কবার্তার দিকে নজর রাখছেন উপকূলীয় অঞ্চলের বাসিন্দারা।
আরও পড়ুন:







